শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু

কোরআন শয়তানকে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে ঘোষণা করেছে। সে মানুষের ইমান, আমল ও আখেরাত ধ্বংস করতে চায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মনবজাতি! জমিনে যা রয়েছে, তা থেকে হালাল পবিত্র বস্তু আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ  কোরো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (সুরা বাকারা ১৬৮)

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো।’ (সুরা ফাতির ৬) আয়াতগুলো মানুষের জন্য গভীর বাস্তবতার ঘোষণা। শয়তান আমাদের শত্রু। তার শত্রুতা গোপন নয়। সে নিজেই তার উদ্দেশ্য প্রকাশ করেছে। এর শুরু আদম (আ.)-এর সময় থেকে। আল্লাহ যখন ফেরেশতাদের আদম (আ.)-কে সেজদা করার নির্দেশ দিলেন, সবাই সেজদা করল। কিন্তু ইবলিস অহংকার করল। সে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করল।

তারপর সে আদম (আ.)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করল। মানুষকে সম্মানিত করা তার ভালো লাগেনি। সে বুঝতে পারল, আদম (আ.) ও তার সন্তানরা আল্লাহর আনুগত্য করলে তারা সফল হবে। তাই তাদের বিপথে নেওয়াকেই সে নিজের লক্ষ্য বানাল।

সে আল্লাহর কাছে অবকাশ চাইল। আল্লাহ তাকে অবকাশ দিলেন। তখন ইবলিস বলল, ‘আমি অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরল পথে ওঁৎ পেতে থাকব। তারপর আমি তাদের কাছে আসব তাদের সামনে থেকে, তাদের পেছন থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাম দিক থেকে।’ (সুরা আরাফ ১৬)

এই ঘোষণা থেকেই শয়তানের শত্রুতা পরিষ্কার হয়ে যায়। সে মানুষের কল্যাণ চায় না। তার লক্ষ্য মানুষকে সরল পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া। কেউ যদি আপনার ক্ষতি করতে চায় এবং নিজেই তা ঘোষণা করে, তাহলে তার শত্রুতা নিয়ে সন্দেহ থাকে না। শয়তানও মানুষের বিরুদ্ধে তার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘সে বলল, দেখুন, এ ব্যক্তি, যাকে আপনি আমার ওপর সম্মান দিয়েছেন, যদি আপনি আমাকে কেয়ামত পর্যন্ত সময় দেন, তবে অতি সামান্য সংখ্যক ছাড়া তার বংশধরদের অবশ্যই পথভ্রষ্ট করে ছাড়ব।’ (সুরা ইসরা ৬২)

এখানে শয়তানের লক্ষ্য স্পষ্ট। সে সরাসরি মানুষকে বলে না, ‘আল্লাহকে ছেড়ে দাও।’ শয়তানের প্রতারণা অত্যন্ত সূক্ষ্ম। সে মানুষকে সরাসরি গুনাহের দিকে ডাকে না। বরং ধীরে ধীরে এগিয়ে নেয়। প্রথমে সে গুনাহকে ছোট করে দেখায়। তারপর গুনাহকে সুন্দর করে উপস্থাপন করে। এরপর মানুষকে তাতে অভ্যস্ত করে তোলে। একসময় সেই গুনাহই তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়। কখনো শয়তান কুমন্ত্রণা দেয়, ‘এটা তো সামান্য ব্যাপার।’ কখনো কুমন্ত্রণা দেয়, ‘আরেক দিন পর থেকে নামাজ পড়বে।’ কখনো কুমন্ত্রণা দেয়, ‘এখন বয়স কম, পরে তওবা করবে।’ আবার কখনো কুমন্ত্রণা দেয়, ‘তুমি অনেক গুনাহ করেছ। তোমার আর ক্ষমা নেই।’ এসবই তার প্রতারণা।

শয়তান গুনাহকে সুন্দর করে দেখায়। মানুষ অনেক সময় জানে যে একটি কাজ হারাম। তবু তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। এর একটি কারণ শয়তানের প্ররোচনা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা যা করত, শয়তান তাদের জন্য তা শোভিত করেছে।’ (সুরা আনআম ৪৩)

এটাই শয়তানের বড় কৌশল। সে গুনাহের চেহারা বদলে দেয়। হারামকে স্বাধীনতা হিসেবে দেখায়। অপচয়কে আধুনিকতা হিসেবে দেখায়। অহংকারকে আত্মবিশ্বাস হিসেবে দেখায়। অশ্লীলতাকে বিনোদন হিসেবে দেখায়। ফলে মানুষ গুনাহ করতে করতে একসময় গুনাহকে আর গুনাহ মনে করে না।

শয়তান শুধু ব্যক্তিকে গুনাহে ফেলতে চায় না। সে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কও নষ্ট করতে চায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইবলিস পানির ওপর তার সিংহাসন স্থাপন করে। এরপর সে তার বাহিনী পাঠায়। তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড় ফেতনা সৃষ্টি করতে পারে, ইবলিস তার প্রশংসা করে। একজন এসে বলে, সে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। তখন ইবলিস তাকে কাছে টেনে নেয়। (সহিহ মুসলিম)

এটি শয়তানের শত্রুতার আরেকটি বড় প্রমাণ। সে পরিবার ভাঙতে চায়। মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করতে চায়। আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করতে চায়। হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে চায়।

শয়তানের আরেকটি ভয়ংকর কৌশল হলো হতাশা। মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দেয়, ‘তোমার আর কোনো আশা নেই।’ কিন্তু এটি মিথ্যা। আল্লাহর রহমতের দরজা সবসময় খোলা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা জুমার ৫৩)

শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। কিন্তু সে সর্বশক্তিমান নয়। সে কাউকে জোর করে গুনাহ করাতে পারে না। কেয়ামতের দিন শয়তান বলবে, ‘তোমাদের ওপর আমার কোনো ক্ষমতা ছিল না। ...আমি তোমাদের ডেকেছিলাম, আর তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে।’ (সুরা ইবরাহিম ২২)

এ আয়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে শয়তানের সীমাবদ্ধতা পরিষ্কার হয়েছে। সে শুধু প্ররোচনা দিতে পারে। মানুষের ইচ্ছাশক্তি কেড়ে নিতে পারে না। তাই কেউ গুনাহ করে শুধু শয়তানকে দায়ী করতে পারবে না। মানুষকে নিজের সিদ্ধান্তের জবাব দিতে হবে।

শত্রুকে চেনা যেমন জরুরি, তার মোকাবিলার পথ জানাও জরুরি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো।’ (সুরা ফুসসিলাত ৩৬)

মুমিনের প্রথম আশ্রয় আল্লাহ। তাই শয়তানের কুমন্ত্রণা এলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে। নিয়মিত নামাজ পড়তে হবে। কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। জিকির করতে হবে। গুনাহের পরিবেশ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার