ব্রাজিলে আগ্রহী বাংলাদেশ

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় পরাশক্তি ব্রাজিল ফুটবল দলের বাংলাদেশে এসে খেলার সম্ভাবনা ঘিরে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অভূতপূর্ব উৎসাহ ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) পাঁচ সদস্যের এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল গত রবিবার সফর করে জাতীয় স্টেডিয়াম, বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা ও কয়েকটি তারকা হোটেল পর্যবেক্ষণ করেছেন। ভেন্যুর সার্বিক পরিবেশ ও খেলার মূল পিচ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিনিধিদলটি কিছু প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে। এরপর বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের সঙ্গেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

তবে অনলাইন ও সামাজিক মাধ্যমে আগামী ৬ অক্টোবর ব্রাজিল-বাংলাদেশ ম্যাচটি চূড়ান্ত বলে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, তা নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। গতকাল সোমবার বাফুফে ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাহী কমিটির সদস্য সাখাওয়াত হোসেন ভূঁইয়া শাহীন জানান, প্রীতি ম্যাচের প্রস্তাব থাকলেও কোনো তারিখ এখনো নিশ্চিত হয়নি।

বাফুফে কর্মকর্তা শাহীন জানান, ব্রাজিল তাদের নির্ধারিত এশিয়া সফরের অংশ হিসেবে ৩ অক্টোবর ভারতের কলকাতায় স্বাগতিকদের বিপক্ষে একটি ম্যাচ খেলবে। এরপর ৫ বা ৬ অক্টোবর বাংলাদেশে এসে আরেকটি প্রীতি ম্যাচ খেলার ইচ্ছার কথা বাফুফেকে জানিয়েছে সিবিএফ।

তবে মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের পূর্বনির্ধারিত টুর্নামেন্টের সূচি নিয়ে। ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ইন্দোনেশিয়ায় শুরু হচ্ছে ফিফা আসিয়ান কাপ, যেখানে অংশ নেবে বাংলাদেশ জাতীয় দল। এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ৩ অক্টোবর। ইন্দোনেশিয়ায় ব্যস্ত সূচি শেষ করে মাত্র দুই দিনের মধ্যে ঢাকায় এসে ব্রাজিলের বিপক্ষে মাঠে নামা অবাস্তব।

বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল সরাসরি আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। উদ্দেশ্য বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সূচির এমন একটি সুষম সমাধান বের করা, যাতে আসিয়ান কাপে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলার বিরল সুযোগটিও হাতছাড়া না হয়।

ব্রাজিল প্রতিনিধিদল প্রস্তাব করেছে, কলকাতা থেকে ঢাকায় ২৫ খেলোয়াড় ও ৯০ জনের আরও একটি বহরকে নিয়ে আসা, তাদের রাখা এবং দুবাইয়ে পৌঁছে দেওয়ার খরচ বহন করতে হবে বাংলাদেশকে। এর জন্য ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে শাহীন বলেন, এমন বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন হলে খরচের অঙ্কটা স্বাভাবিকভাবেই বড় হবে। তবে এটি একটি জাতীয় পর্যায়ের বড় আয়োজন। বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল শিগগিরই যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বাফুফে মনে করে, এটি কেবল তাদের একক ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং দেশের ভাবমূর্তির বিষয়। ফলে সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় এই অর্থসংস্থানের বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব হবে।

ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন বাংলাদেশে খেলার আগ্রহ দেখানোর মূল কারণ হিসেবে এ দেশের ফুটবল-ভক্তদের আবেগ ও সমর্থনের কথা উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের যেখানেই ব্রাজিল ম্যাচ খেলেছে, সেখানেই গ্যালারিতে বিপুল বাংলাদেশি সমর্থক তাদের নজরে এসেছে। সেই বিশাল সমর্থকগোষ্ঠীকে সম্মানিত করতেই সিবিএফ ঢাকায় খেলার ব্যাপারে আগ্রহী।

ব্রাজিলের প্রতিনিধিদল শুধু ম্যাচ আয়োজন নিয়েই আগ্রহ দেখায়নি। ভবিষ্যতে মাঠ নির্মাণ, সংস্কার ও ফুটবলের কারিগরি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাফুফের সঙ্গে সহযোগিতা করার আগ্রহও জানিয়েছে তারা। ফলে একটি প্রীতি ম্যাচের বাইরেও দুই দেশের ফুটবল সম্পর্ক আরও গভীর করার সম্ভাবনা দেখছে বাফুফে।

ম্যাচটি হলে বাংলাদেশের ফুটবলে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন বাফুফের কর্মকর্তারা। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ফুটবলে দর্শকদের আগ্রহ বেড়েছে। জাতীয় দলের ম্যাচের টিকিটও দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ব্রাজিলের মতো বিশ্বসেরা দলের বিপক্ষে ম্যাচ হলে সেই আগ্রহ আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা বাফুফের।

তবে মাঠের দিক থেকে এটি হবে অসম লড়াই। ব্রাজিল বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ দলগুলোর একটি, আর বাংলাদেশের অবস্থান র‌্যাংকিংয়ে অনেক নিচে। তারপরও ব্রাজিলের আগ্রহকে বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে বাফুফে। এখন অপেক্ষা দুই ফেডারেশনের চূড়ান্ত সম্মতি, ফিফার অনুমোদন এবং সূচি সমন্বয়ের।

২০১১ সালে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা জাতীয় দল ঢাকায় আসার পর দেশের ফুটবলে যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল, ব্রাজিলের এই সফর বাস্তবে রূপ নিলে তা তৃণমূল পর্যায়ে শিশু-কিশোরদের ফুটবলে আরও বেশি আকৃষ্ট করবে বলে বিশ্বাস করে বাফুফে। বর্তমানে সব নজর সিবিএফের চূড়ান্ত প্রতিবেদন, ফিফার অনুমতি এবং দুই দেশের ফুটবল বোর্ডের সম্মতিসূচক সিদ্ধান্তের দিকে।