ভোরের নরম আলোয় গ্রামের উঠানজুড়ে শোনা যেত ছন্দময় শব্দ ঢেক... ঢেক... ধুপ... ধাপ। সেই শব্দে ঘুম ভাঙত শিশুদের, ব্যস্ত হয়ে উঠতেন বাড়ির নারীরা। কেউ পা দিয়ে ঢেঁকিতে পার দিতেন, কেউ ধান উল্টে দিতেন, আবার কেউ গুনগুন করে গাইতেন লোকগান। ধান ভানা, চাল তৈরি, চিড়া কোটানো কিংবা পিঠার চালের গুঁড়ো বানানোর সেই ব্যস্ততা ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন আর সেই শব্দ শোনা যায় না।
সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার অধিকাংশ গ্রামে ঢেঁকি এখন প্রায় বিলুপ্ত। কোনো কোনো বাড়ির এক কোণে হয়তো পড়ে আছে ভাঙা-চোরা ঢেঁকি, কিন্তু ব্যবহার হয় না বহু বছর। আধুনিক চালকল, বিদ্যুৎচালিত ও ইঞ্জিনচালিত মেশিন মানুষের জীবন সহজ করেছে। সেই সুবিধার ভিড়ে হারিয়ে গেছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম এই অনুষঙ্গ। একসময় কয়রার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই ছিল ঢেঁকি। নতুন ধান উঠলেই শুরু হতো ধান ভানার উৎসব। বাড়ির উঠানে কিংবা আলাদা ঢেঁকিঘরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলত ধান ভানার কাজ। ধান থেকে চাল তৈরি, চিড়া কোটানো, ছাতু বানানো, চালের গুঁড়ো প্রস্তুত সবই হতো ঢেঁকিতে।
শুধু খাদ্য প্রস্তুতের যন্ত্রই নয়, ঢেঁকি ছিল গ্রামীণ নারীদের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমও। গ্রামের সচ্ছল কৃষকদের বাড়িতে ধান ভানার কাজ করে অনেক দরিদ্র নারী সংসারের খরচ চালাতেন। পারিশ্রমিক হিসেবে পেতেন ধান, চাল কিংবা নগদ অর্থ। সেই আয়ে চলত পরিবারের নিত্যপ্রয়োজন। কয়রার গোবরা গ্রামের আকলিমা খাতুন বলেন, ‘আগে শীত এলেই প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো বাড়িতে ঢেঁকি চলত। পিঠার জন্য চাল কোটার আলাদা আনন্দ ছিল। এখন মেশিনে সব হয়।’ একই গ্রামের লতিকা রানি বলেন, ‘ঢেঁকিতে কোটানো চালের গুঁড়োর পিঠার স্বাদ আলাদা ছিল। এখন ইচ্ছা করলেও ঢেঁকি পাওয়া যায় না।’
কয়রা সদরের হাফিজুর রহমান মিস্ত্রি বলেন, ‘আশির দশক থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের বিস্তার শুরু হওয়ার পর কৃষির চিত্র বদলে যেতে থাকে। অনেক জমিতে ধান চাষ কমে গিয়ে শুরু হয় ঘের। ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে ঢেঁকির ব্যবহারও।’ তিনি জানান, ‘ঢেঁকি তৈরিতেও ছিল স্থানীয় কারিগরি দক্ষতার ছাপ। শক্ত কাঠ দিয়ে বানানো হতো লম্বা কাঠামো। এক প্রান্তে থাকত মুষল, অন্য প্রান্তে পা দিয়ে চাপ দিলে মুষলটি ধানের ওপর আঘাত করত। দুজন নারী মিলে ছন্দ মিলিয়ে কাজ করতেন। একজন পার দিতেন, অন্যজন ধান নাড়তেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলত সেই শ্রম।’
শীতকাল ছিল ঢেঁকির সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। নতুন চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি হতো ভাপা, পাটিসাপটা, চিতই, দুধপুলি, পাকানসহ নানা ধরনের পিঠা। গভীর রাত পর্যন্ত চলত প্রস্তুতি। নতুন ধানের ঘ্রাণ আর পিঠার সুবাস পাড়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত। কয়রার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা যায়, ধান ভাঙার জন্য মানুষ এখন ছোট চালকল কিংবা ভ্রাম্যমাণ মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। কয়েক মিনিটেই ধান থেকে চাল তৈরি হয়ে যায়। ফলে নতুন করে কেউ আর ঢেঁকি বানাচ্ছেন না।’
গবেষক ও সাহিত্যক অধ্যাপক আ. ব. ম আবদুল মালেকের মতে, ‘ঢেঁকি হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি কৃষিযন্ত্রের বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ নারীদের শ্রমের ইতিহাস, লোকগান, পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি আর বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।’
কয়রার গ্রামগুলো আজ বদলে গেছে। বদলেছে কৃষি, বদলেছে জীবনযাত্রা। কিন্তু অনেক প্রবীণের স্মৃতিতে এখনো ভেসে আসে সেই ভোরের ঢেক... ঢেক... ধুপ... ধাপ। যে শব্দ একসময় একটি গ্রামের জেগে ওঠার পরিচয় ছিল, আজ তা কেবলই স্মৃতির ভেতরে বেঁচে আছে।