জাকসু ভিপি ও এক নেতার কর্মকান্ডে বিব্রত ছাত্রদল

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) ভিপি আবদুর রশিদ জিতু ও শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ মোহাম্মদ ফয়সাল হোসেনের বিতর্কিত কর্মকা-ে ক্যাম্পাসে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নানা বিষয়ে তাদের ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার, প্রটোকল না মানাসহ একের পর এক কর্মকা-ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। এতে ক্যাম্পাসে বিএনপি ও ছাত্রদলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন ছাত্রদলের অন্য নেতা-কর্মীরা।

সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে গত ৬ আগস্ট পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে অভ্যর্থনা জানানোর সময় প্রটোকল না মেনে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনিককে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ফয়সালের বিরুদ্ধে। সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। একই দিন রাতে ভিপি জিতুকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে শোডাউন দিয়ে মুক্তমঞ্চের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন ফয়সাল। সেখানে আমন্ত্রিত অতিথিদের নাম ঘোষণা নিয়ে হট্টগোলের সৃষ্টি হয় এবং অন্য নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতে জড়ান ফয়সাল। এ ঘটনায় অপমানিত বোধ করায় রাতে অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও জাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক শেখ জিসান আহমেদ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এসব ঘটনার জেরে পরদিন ৭ আগস্ট ফয়সালকে কারণ দর্শানোর নোটিস (শোকজ) দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল।

ফয়সালের মাই ম্যান রাজনীতি : ফয়সালের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের রাজনীতিতে নিজের অনুসারী নেতা-কর্মীদের বেশি সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের আগস্টে ছাত্রদলের বিভিন্ন হল কমিটি ঘোষণা করা হয়। অন্যান্য হল কমিটিতে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব দেওয়া হলেও মওলানা ভাসানী হলের সভাপতি দেওয়া হয় ফেরদৌস রহমানকে। ছাত্রত্ব না থাকার পরও ফয়সালের সঙ্গে রাজনীতি করায় তাকে হলের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া কমিটিতে ছাত্রলীগের কয়েকজন পদ পান যাদের অনেকেই ফয়সাল গ্রুপের রাজনীতি করেন বলে অভিযোগ। এতে শাখার অন্য নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং তারা বিক্ষোভও করেন। ৯ আগস্ট বটতলা এলাকায় ফয়সালের রাজনীতি করা যুগ্ম আহ্বায়ক মেহেদি মজুমদারকে ধাওয়া দেন অন্য নেতা-কর্মীরা।

এ ছাড়া গত বছর জাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেলের ভিপি প্রার্থী শেখ সাদী হাসান বিপুল ভোটে হেরে যান। ওই সময়ই নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেন, ফয়সাল গ্রুপের রাজনীতি করার কারণেই অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীদের বাদ দিয়ে ক্যাম্পাসে অপরিচিত মুখ শেখ সাদী হাসানকে ভিপি প্রার্থী করা হয়। যার খেসারত দিতে হয় পুরো ছাত্রদলের প্যানেলকে।

গত বছরের এপ্রিলে শাখা ছাত্রদল আয়োজিত ফ্রি হেপাটাইটিস-বি টিকাদান কর্মসূচি ঘিরে আর্থিক অসচ্ছতা এবং সংবাদিকদের হুমকি ধমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ফয়সালের বিরুদ্ধে।

অভিযোগের বিষয়ে শাহ মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিকল্পনায় ও ড্যাবের সহযোগিতায় আমরা ভ্যাকসিন কর্মসূচি পরিচালনা করেছি। আমরা এখানে শুধু ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছি। এখানে অর্থের কোনো বিষয়ই ছিল না। আমার বিষয়ে আনা এই অভিযোগ মনগড়া। তাছাড়া ৬ আগস্টের অনুষ্ঠানে কোনো ধরনের শোডাউন হয়নি। জিতু ছাত্রদলের একজন কর্মী। স্বাভাবিকভাবেই আমরা প্রায়ই একসঙ্গে চলাফেরা ও আড্ডা দিই।’

ভিপির বিরুদ্ধে যত অভিযোগ : জাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে নির্বাচন করেন সাবেক ছাত্রলীগের কার্যকরী সদস্য আব্দুর রশিদ জিতু। নির্বাচিত হওয়ার পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনি জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ফয়সালের হাত ধরে বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রদলের সঙ্গে ঘেঁষা শুরু করেছেন, ফলে ছাত্রদলের অন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ স্পষ্ট হচ্ছে।

জিতুর বিরুদ্ধে প্রশাসনকে নোটিস জারিতে চাপ দেওয়া, রিকশাচালকদের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন ফির নামে টাকা আদায় এবং দোকানে বাকি খাওয়ার মতো নানা অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রদলের অনেকেই ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরেও জিতুর অবৈধভাবে হলে অবস্থানকে ভালো চোখে দেখছেন না। গত ৫ আগস্ট আটক এক ছাত্রলীগ কর্মীকে ব্যক্তিগত প্রভাবে ছাড়িয়ে আনার ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থী ও অন্যান্য সংগঠনের তোপের মুখে পড়েন তিনি।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জিতু বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন কর্মী। ৬ আগস্ট ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের মোটরসাইকেল শোডাউন করা হয়নি। মুরাদ চত্বরে ফয়সাল হোসেনের সঙ্গে দেখা হলে আমরা একসঙ্গে প্রোগ্রামে যাই।’ হলে অবস্থান ও রিকশাচালকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি তো ঢাকা থেকে এসে এখানে অফিস করব না, সেখান থেকে এসে এসে তো কাজ করতে পারব না। সে জন্য তো হলেই অবস্থান করতে হচ্ছে। রিকশাচালকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগের কোনো রকম সত্যতা নেই।’

মন্ত্রীর উপস্থিতিতে ধাক্কাধাক্কির বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনিক বলেন, ‘সেখানে দাঁড়ানোর বিষয়টিতে ডেকোরাম না থাকায় ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে আমরা বিষয়টি সামলে নিই। তবে একজন সিনিয়র কর্মীর কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ আনএক্সপেক্টেড, যা সংগঠনের শৃঙ্খলা নষ্ট ও কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, ‘জিতু যখন মাদার পার্টিতে (বিএনপি) যোগ দেন, তখন স্পষ্ট জানান, ছাত্রদল নিয়ে তার আগ্রহ নেই। তিনি মূল দলের সদস্য ও জাকসু ভিপি। ছাত্রদলের সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক নেই, তবে ভিপি হিসেবে আমরা তাকে সম্মান করি।’ সংগঠনের শৃঙ্খলার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাগুলো ভুলে আমরা এখন ঐক্যবদ্ধ এবং ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সহাবস্থান বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে শান্তি চায়, তারা এসব কাদা ছোড়াছুড়ি পছন্দ করে না। আমরা চাই এসব নোংরামি বন্ধ হোক।’