ইরানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান, এবার কি থামবে যুদ্ধ?

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সোমবার (২৪ আগস্ট) ইরান সফর করেছেন। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান অচলাবস্থা কাটিয়ে আলোচনার পথ তৈরি করাই সফরের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছে পাকিস্তান। খবর আলজাজিরার।

সফরের আগে গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মুনিরের ফোনালাপের খবরও প্রকাশ হয়েছে। তিন পাকিস্তানি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প মুনিরকে ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পাকিস্তানের প্রভাব কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

এরপর সোমবার তেহরানে পৌঁছে মুনির ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির সঙ্গে বৈঠক করেন।

বৈঠকগুলোতে যুদ্ধের উত্তেজনা কমানো, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা, আঞ্চলিক শান্তি এবং বিরোধের একটি আলোচনাভিত্তিক সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইরানের নেতৃত্ব পাকিস্তানের ‘গঠনমূলক ভূমিকা’ ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার গালিবাফের সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জুনে সই হওয়া ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগও ওঠে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই সমঝোতার বাস্তবায়ন আটকে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গই দায়ী।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাইও যুক্তরাষ্ট্রকে আচরণ পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং সমঝোতা স্মারকের শর্ত বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রকে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।

এটি চলতি বছরে মুনিরের তৃতীয় ইরান সফর। এর আগে এপ্রিল ও মে মাসেও তিনি তেহরান গিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা এগিয়ে নিতে পাকিস্তান কয়েক মাস ধরে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে।

তবে জুনে হওয়া সমঝোতার পরও দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট কাটেনি। পাকিস্তানের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো বড় বাধা হয়ে আছে। মুনিরের এবারের প্রচেষ্টার অন্যতম উদ্দেশ্য সেই দূরত্ব কমানো।

পাকিস্তান এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী শান্তি কাঠামো তৈরিতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু পরে সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ফলে এবার ইসলামাবাদ নতুন করে আলোচনার পথ খুলতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহনপথে উত্তেজনা বাড়ায় তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মুনিরের সফরে তাই হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কমানো এবং নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তেহরানে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার উপায় খোঁজা।

এদিকে মঙ্গলবার ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আলবুসাইদি তেহরান সফর করছেন। হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের আলোচনার ধারাবাহিকতায় তাঁর এই সফরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশেরই সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ইসলামাবাদ নিজেকে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।

তবে পাকিস্তানের প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ মনে করছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের পথ তৈরি করতে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আবার কেউ মনে করেন, মধ্যস্থতায় কাতারের ভূমিকা এখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগে, বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলেছিলেন, পাকিস্তানের বিশেষ সুবিধা হলো দেশটি দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে এবং এই সংঘাত থেকে সরাসরি কোনো বড় ব্যক্তিগত লাভের প্রত্যাশা নেই। অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া নিজস্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

মুনিরের সফর থেকে এখনই বড় কোনো চুক্তি বা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসেনি। তবে তাঁর বৈঠকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অচলাবস্থা কাটানো, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কমানো এবং আঞ্চলিক সংঘাত আর না বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুনিরের তেহরান সফরের আগে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ফোনালাপের খবর এবং পরে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক। এতে বোঝা যাচ্ছে, পাকিস্তান শুধু ইরানের সঙ্গে কথা বলছে না, বরং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি নতুন যোগাযোগের পথ তৈরির চেষ্টা করছে।