জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত নিয়ে আলোচনা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভাঙতে থাকা নদীতীর, প্লাবিত জনপদ, লবণাক্ত জমি, প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত মানুষ। এই পরিচিত ছবির পাশে আরেকটি ছবি ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। উপকূলের স্কুলপড়ুয়া তরুণরা নিজেরাই ভাবছে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কেউ দুর্যোগ সহনশীল জনপদের মডেল বানাচ্ছে, কেউ নদী ও জলাভূমি রক্ষার পরিকল্পনা করছে, কেউ পথনাটকের মঞ্চে তুলে আনছে তাপপ্রবাহ ও দূষণের বিপদ। জলবায়ুর আঘাতের মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম এখন নিজেদের অভিজ্ঞতাকে চিন্তা ও উদ্যোগে রূপ দিতে শুরু করেছে। গত ২০ আগস্ট ঝালকাঠি জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত ‘যুব শান্তি মেলা’ সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ‘ইয়ুথ অ্যাকশনস ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড পিস’-এর উদ্যোগে যৌথভাবে এই মেলার আয়োজন করা হয়। পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৫০ জন ক্লাইমেট ক্লাব সদস্য মডেল, দেয়ালিকা, ভিডিও, পথনাটক ও সৃজনশীল প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের ভাবনা তুলে ধরে। পুরো আয়োজনে যুক্ত হয় ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তিন শতাধিক শিক্ষার্থীসহ শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও যুবনেতা।
মেলায় শিক্ষার্থীরা তাদের কাজের জন্য যেসব বিষয় বেছে নিয়েছে, সেগুলো বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নদীভাঙন, বন্যা, তাপপ্রবাহ, দূষণ, নদী ও জলাভূমির সুরক্ষা এবং দুর্যোগ সহনশীল জনপদ গড়ার চিন্তা তাদের উপস্থাপনায় এসেছে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন তাদের কাছে পাঠ্য বইয়ের দূরবর্তী কোনো অধ্যায় হয়ে থাকেনি। চারপাশের জীবন থেকে তারা সমস্যাকে চিনছে এবং সেই অভিজ্ঞতার মধ্য থেকেই সমাধানের পথ খুঁজছে। ঝালকাঠির বাস্তবতা বুঝলে এমন উদ্যোগের গুরুত্ব আরও পরিষ্কার হয়। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের এই জেলার মানুষ নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, জোয়ারের প্লাবন, লবণাক্ততা, তীব্র তাপপ্রবাহ ও পরিবেশের অবক্ষয়ের চাপ নিয়ে বসবাস করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে প্রকৃতির মধ্যে সীমিত থাকে না। একটি পরিবার জমি হারালে জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আয় কমলে সন্তানের শিক্ষা ব্যাহত হতে পারে। নিরাপদ পানি দুর্লভ হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। দুর্যোগে বসতভিটা হারালে শুরু হয় বাস্তুচ্যুতির অনিশ্চিত যাত্রা। এই পরিস্থিতির পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতাও কাজ করছে। নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ, দূষণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো, বৃক্ষ ও সবুজ এলাকা কমে যাওয়া এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিতে ঘাটতি মানুষের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে জলবায়ু অভিযোজনের পরিকল্পনায় বৈশি^ক কারণের পাশাপাশি স্থানীয় সমস্যাগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করে শিশু ও তরুণদের ভবিষ্যৎ। তাপ প্রবাহে বিদ্যালয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে, দুর্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে, পরিবারের জীবিকা হারালে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যুক্ত হওয়ার চাপ বাড়ে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অভাব স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাস্তুচ্যুতি একজন শিশুকে পরিচিত পরিবেশ, বিদ্যালয় ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতির বিষয়।
এখানেই রাষ্ট্র, স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাইমেট ক্লাবগুলো সক্রিয় ও শক্তিশালী করা গেলে জলবায়ু কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়বে। পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশগত সমস্যা নিয়ে তাদের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগও তৈরি হবে। তবে ক্লাইমেট ক্লাবকে শুধু দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠান, পোস্টার তৈরি কিংবা আলোচনা সভার মধ্যে আটকে রাখলে প্রত্যাশিত ফল মিলবে না। বিদ্যালয়ের আশপাশের জলাশয় পর্যবেক্ষণ, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা, বর্জ্য কমানো, তাপপ্রবাহে করণীয়, নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির মতো কাজে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করা যেতে পারে। জলবায়ু কর্মসূচিতে তরুণদের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে বিবেচনা করার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবেও স্থান দিতে হবে। তাদের চিন্তা শোনা, স্থানীয় পরিকল্পনায় মতামত নেওয়া এবং ছোট উদ্যোগ বাস্তবায়নে অর্থ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া দরকার। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রকল্পের জন্য ক্ষুদ্র জলবায়ু তহবিল চালু করা যেতে পারে। ক্লাইমেট ক্লাবের সঙ্গে স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিয়মিত যোগাযোগও গড়ে তোলা জরুরি।
ঝালকাঠির যুব শান্তি মেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জলবায়ু ও শান্তিকে একই আলোচনার পরিসরে নিয়ে আসা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কেবল প্রকৃতি ও পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অভিঘাত মানুষের জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পারস্পরিক সম্পর্কেও ছড়িয়ে পড়ে। চরম আবহাওয়া যখন কৃষি ও মৎস্যনির্ভর জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করে, পরিবারকে বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য করে এবং নিরাপদ পানি, আবাদি জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ায়, তখন সমাজে নতুন ধরনের টানাপড়েন তৈরি হতে পারে। সীমিত সম্পদ ব্যবহারের প্রতিযোগিতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের নতুন এলাকায় বসতি স্থাপনের ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দূরত্ব ও বিরোধের আশঙ্কাও বেড়ে যায়। তাই জলবায়ু অভিযোজনের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি, সহযোগিতা ও মানব নিরাপত্তাকে যুক্ত করে সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের প্রয়োজন।
উপকূলের তরুণরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। এখন বড়দের কাজ সেই কণ্ঠকে গুরুত্ব দেওয়া এবং উদ্যোগগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি সুযোগে পরিণত করা। ঝালকাঠির একটি মেলা যদি বিদ্যালয় থেকে জনপদে ছড়িয়ে পড়ে, যদি শিক্ষার্থীর ছোট মডেল স্থানীয় পরিকল্পনার অংশ হয়, তবে জলবায়ুর বিরুদ্ধে লড়াই নতুন শক্তি পাবে। যে প্রজন্ম আজ নদী, জলাভূমি ও নিজের জনপদ বাঁচানোর স্বপ্ন আঁকছে, আগামী দিনের উপকূল রক্ষার নেতৃত্বও তাদের হাতেই গড়ে উঠতে পারে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকার কর্মী
shahedkayes@gmail.com