রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা জরুরি

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৩ এএম

২০১৭ থেকে ২০২৬, সময়ের ব্যাবধান ৯ বছর। ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট প্রতিবেশী মিয়ানমারে নৃশংসতা-পৈশাচিকতার ছোবলে বিপন্ন-বিপর্যস্ত রোহিঙ্গাদের স্রোত বেগবান হয় বাংলাদেশমুখী। সভ্যতা-মানবতার ও প্রাণরক্ষা-মর্যাদার প্রতি মানবিক দৃষ্টি  দিয়ে বাংলাদেশ আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত-বাধা সরিয়ে আশ্রয়ের অনন্য নজির স্থাপন করে। সেই ধারাবাহিকতায় দশম বছরে পদার্পণ করেছে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয়ের। সেদিনের মানবতার তাগিদ আজ আমাদের অর্থনীতি, পরিবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৫ আগস্ট দেশ রূপান্তরের একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এর বহুমাত্রিক দিক। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, দেশে সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গাদের ঢল শুরুর বছর ২০১৭ সালেই তাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ।

সেই চুক্তি অনুসারে যেসব রোহিঙ্গা গত ১০ বছরে এসেছে, তাদের এবং তাদের উত্তরসূরি হিসেবে আশ্রয়শিবিরগুলোয় যাদের জন্ম হয়েছে, সবাইকে ফেরত নেবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। সব মিলিয়ে তাদের সংখ্যা এখন ১২ লাখের বেশি। চুক্তিগুলো সই হওয়ার ৯ বছর অতিক্রান্তেও এখনো মিয়ানমারে ফেরত যায়নি একজনও। এখনো প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে অবস্থান করছে। আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজার শরণার্থী ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ক্যাম্পের নির্দিষ্ট গণ্ডি পেরিয়ে এদের একটি বড় অংশ মিশে যাচ্ছে মূলধারার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। নির্মাণশ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক ও জেলে হিসেবে পরিচয়ে সহজেই স্থানীয় শ্রমবাজারে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করছে। অসাধু জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সহজেই তৈরি করে ফেলছে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট। আমরা জানি, আমাদের শ্রমবাজারে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাংলাদেশি পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে। শুধু কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরের আশপাশেই নয়, অন্যত্রও রোহিঙ্গা বিপথগামীরা অপরাধে জড়িয়ে সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করেছে এমন নজিরও আছে। পরিবেশ-প্রতিবেশে অভিঘাতের বাস্তবতাও প্রকট। সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপসহ রোহিঙ্গাদের কারণে বহুমাত্রিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা প্রতাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে বারবার বাংলাদেশ দেনদরবার করেও বিদ্যমান সংকটের কোনো সুরাহা না করার অন্তরালের কারণ মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের  ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক নানারকম স্বার্থ-সম্পৃক্ততা। এই প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশের তরফে চেষ্টার কোনো ত্রুটি না থাকা সত্ত্বেও  মিয়ানমারের অনাগ্রহ, অনিচ্ছা বা আন্তরিকতার অভাবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আলোর মুখ দেখেনি। এরপরও আমরা মনে করি, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করতে হবে আরও জোরালোভাবে  আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করেই। কেননা, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান যে করা যাবে না, এর আলামত অস্পষ্ট নয়। আমরা দেখছি, মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বারবার পরিচয় সংকট সৃষ্টি করার অপপ্রয়াস চলছে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে জন্মহারও ঊর্ধ্বমুখী। এও আরেক সংকট। কারণ সংখ্যানুপাতিক হার ক্রমাগত বাড়ছে।  নিরাপত্তা ঝুঁকি, সামাজিক-অর্থনীতি চাপসহ বিদ্যমান সংকট নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরালো করার বিকল্প নেই। আমরা জানি, গত কয়েক বছরে বিশ্বের নানা সংকট রোহিঙ্গা ইস্যুকে ছাপিয়ে গেছে, যার ফলে শরণার্থীদের জন্য তহবিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রোহিঙ্গা সমস্যা ভিন্ন, যা একটি একপক্ষীয় নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে সৃষ্ট। তারা কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে পলায়নপর কোনো উদ্বাস্তু নয়। মূল সমস্যা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারের ইচ্ছাকৃত ব্যর্থতা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমারকে সেই পরিবেশ সৃষ্টিতে বাধ্য করাই হতে হবে আমাদের লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে এবং তাদের নিরাপত্তা দিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করাতে হবে। তাই আমাদের বন্ধু দেশগুলোকে বুঝতে হবে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থের চেয়ে এক্ষেত্রে নৈতিক, মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনগত বিষয়গুলোর প্রতি যেন নজর গভীর করে। বছরের পর বছর বাংলাদেশের পক্ষে এই বোঝা বহন করা দুরূহ। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে, তাহলেই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হবে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণÑ এই বাস্তবতা অনস্বীকার্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত