নজর নেই উৎসে, অঙ্গীকার প্রতিবিধানের 

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’ আর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই ছিলেন তারুণ্যের প্রতীক। তিনি বলেছেন, ‘আমরা শক্তি আমরা বল আমরা ছাত্রদল/মোদের পায়ের তলায় মূর্ছা তুফান/ঊর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল।’ জাপানি বৌদ্ধ দার্শনিক, শান্তির দূত হিসেবে পরিচিত শিক্ষাবিদ, লেখক ও কবি দাইসাকু ইকেদা বলেছেন, ‘ইতিহাস সব সময়ই তারুণ্যের শক্তির জোরেই রূপ নিয়েছে।’ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের সমাজ বাস্তবতায় তারুণ্যের ক্ষয়ে যে মর্মস্পশী বেদনা-উপাখ্যানের সৃষ্টি হচ্ছে তা মহতীদের উপলব্ধি থেকে কত দূরে?

একটি বেসরকারি সংস্থা জরিপ চালিয়েছিল প্রায় দেড় হাজার তরুণের মধ্যে। দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৮২ শতাংশ তরুণই উদ্বিগ্ন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ওই জরিপে অংশ গ্রহণকারী  তরুণদের ৬৩ শতাংশই বলেছিল, তারা জানে না তাদের জীবনের লক্ষ্য কী! ৫৬ শতাংশ তরুণ উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছিল নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে। দেশের রাজনীতি নিয়ে অধিকাংশ তরুণ তাদের  অনাগ্রহের কথাও জানিয়েছিল। এই উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠিত করে এ কারণে, যারা দেশের ভবিষ্যৎ তাদের মধ্যে হতাশার ছায়া ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে বহুমাত্রিক অপরাধের ঘটনা প্রায় নিত্য উঠে আসছে। এর বাইরে থেকে যাচ্ছে আরও অনেক অপরাধ, যেগুলো সংবাদমাধ্যমের আয়নায় দেখা যাচ্ছে না। অধিকাংশ অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা দেখা যায়  তরুণদের!  তরুণরা অনুসরণ ও দৃষ্টান্তযোগ্য কাজ করছে তা সত্য এবং এর ব্যাপ্তিও কম নয়। কিন্তু এই আলোর বিচ্ছুরণ কাক্সিক্ষত মাত্রায় দৃশ্যমান নয় যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে। আরেকটি জরিপে জানা গিয়েছিল, ৪৭ শতাংশ তরুণ মনে করে, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের অসমতা তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের নীতিধারকরা এসব জরিপের ফলাফল কতটা  আমলে নেন? বৈষম্যের গাঢ় ছায়া সরানোর এ পর্যন্ত কত অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছেন আমাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রকরা, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর অনুকূলে কাজ হয়েছে কতটা? সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি এবং এর সঙ্গে তরুণদের একাংশের সম্পৃক্ততার পেছনের যে কারণগুলো রয়েছে এর গভীরে কেন নজর পড়ে না?

তরুণদের ক্ষয়ের উৎসে নজর নেই, অথচ দায়িত্বশীলরা অহরহ অঙ্গীকার করছেন প্রতিবিধানের! অন্যদিকে তরুণরা দেখেছে লুটপাট আর ক্ষমতাধরদের ক্ষমতার প্রদর্শনী, দুর্নীতি, সুবিধাবাদী আদর্শের অনুসারী রাজনীতির চর্চা, সামাজিক অবক্ষয়, সম্পদের অসম বণ্টন, বৈষম্যের প্রকট রূপসহ নানা অরাজকতা। তাতে অনেকেই সংক্রমিত হয়েছে এবং হচ্ছে অনিরামযোগ্য সামাজিক ব্যাধিতে। অর্থ লোভে আগ্রাসী হয়ে ওঠা, সাধ্য-সামর্থ্যরে  বাইরে ভোগবাদী হয়ে উঠার প্রবণতা, রাতারাতি টাকাওয়ালা বনে যাওয়ার নেশা তাদের মধ্যে হতাশার আগুন ছড়াচ্ছে আর এই হতাশা বিপথগামীদের সংখ্যা আরও স্ফীত করছে। কিশোর গ্যাং আরেক ভয়াবহ উপসর্গ আধিপত্য বিস্তারে। আমাদের সামনে এমন বেদনাদায়ক নজিরও আছে, বিপথগামীদের কেউ কেউ সমাজের জন্য তো বটেই, পরিবারেও ত্রাসের সৃষ্টি করছে এবং আপনজনকেও হত্যার মতো নৃশংসতায় উন্মত্ত করে তুলছে! শুধু কৌতূহল, সঙ্গদোষ, হতাশা কিংবা মানসিক বৈকল্যের কারণেই কি তারুণ্যের ওপর অপছায়া পড়েছে? একটা সমাজে ক্ষয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় বহুবিধ কারণে ।

২৫ আগস্ট একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, পুলিশ হেডকোয়ার্টারের তথ্য অনুযায়ী গত মে থেকে জুলাই পর্যন্ত ওই তিন মাসে সারাদেশে ৯৩৪টি খুনের  মামলা হয়েছে। অর্থাৎ তিন মাসে গড়ে তিনশর  বেশি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। সেই হিসেবে দৈনিক খুনের ঘটনা ঘটেছে ১০টিরও বেশি। পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, চুরি ডাকাতি আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও খুন বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘প্রতি মাসে কমবেশি তিনশর মতো খুনের ঘটনা ঘটছে। গড়ে প্রতিদিন ১০টা করে খুন যেন আমাদের ভাগ্যে লেখা রয়েছে।’ পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজির ‘খুন যেন আমাদের ভাগ্যে লেখা রয়েছে’ এই বাক্যবন্ধটি কি দায়িত্ব পালনে তার বা তাদের ব্যর্থতা কিংবা অসহায়ত্বের সাক্ষ্য নয়?

সমাজ উর্বরের ক্ষেত্রে শিক্ষা-সংস্কৃতি-রাজনীতির ভূমিকা অগ্রগণ্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের সমাজে এই তিনটি ক্ষেত্রেই সৃজনের-সুনীতির-আদর্শের চর্চা কতটা উর্বর। যে তারুণ্য দেশের মেরুদণ্ড, যারা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানে, যাদের  সঠিক পথে চালিত করলে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যায়, সেই তারুণ্যের অপচয়ের পথ তো রাজনীতির নামে অপরাজনীতিই সুগম করে দিয়েছে। স্বার্থান্বেষী রাজনীতিকরা নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণে অর্থের প্রলোভনে, ক্ষমতার অপব্যবহারের স্রোতে কত তরুণকে গা ভাসিয়ে দেওয়ার পথ করে দিয়েছেন এই জিজ্ঞাসা উপেক্ষার অবকাশ কতটা আছে? প্রবীণরা যে নির্ভার রয়েছেন এমন দাবি হয়তো অনেকেই করবেন না, তবে তরুণরা যে সুখে নেই, এও তো সমভাবে  সত্য। নিকট অতীতে সংবাদমাধ্যমেই দেখেছি, ‘উঠতি বয়সী তরুণে ভরা কিশোরগঞ্জ কারাগার; মাদকের ছোবলে ১৪০০ থেকে ১৫০০ মাদক মামলার আসামি।’ এই যে আটকের খবর তা তো শুধু দেশের একটি জেলা কারাগারের চিত্র নয়, সব জেলা কারাগারেই এ রকম তরুণ আসামির দেখা পাওয়া যাবে। তাদের তো ওখানে থাকার কথা নয়। তারা হয় কর্মক্ষেত্রে কর্মনিযুক্ত থাকবে, নয়তো ব্যস্ত রইবে পড়াশোনায় এটাই প্রত্যাশিত ও স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিকই এখন অনেক বড় ক্ষেত্রজুড়ে স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

সব জিনিসেরই দাম যখন বাড়ছে; তখন মাদকের ক্ষেত্রে উল্টো যাত্রা, দাম কমছে। এর অর্থ তো সোজা। সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। যে তরুণরা এখন মাদক সেবনে, ছিনতাইয়ে, নিজেদের ভেতর কলহে-সংঘাতে, পরস্পরকে খুন করায়, এমনকি দলবদ্ধ ধর্ষণেও তৎপর তারা  সমাজের  বোঝা নয় শুধু, রীতিমতো আপদে পরিণত হয়েছে। যে তারুণ্য বায়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তরে এমনকি রক্তস্নাত স্বাধীন দেশেও গর্বের খতিয়ান দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করেছে সেই তারুণ্যের উত্তরাধিকার আজকের তারুণ্যের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বিপথে পা রেখে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এ নিশ্চয় আমাদের নিয়তি নয়, এ হলো স্বার্থান্বেষী কতিপয় রাজনীতিক-সমাজপতির দুষ্কর্মের অভিঘাতের ভয়াবহ ফল। একাত্তরে যে তরুণ দেশের জন্য অকুতোভয়ে লড়াই করেছে, আজ সে দেশ ছেড়ে যাওয়ার জন্য সাগরের পানিতে প্রাণ পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত। প্রায় ১০০ বছর আগে ‘প্রশ্ন’ নামের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমি যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে/কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।’ তার কবিতা আজ আরও নির্মমভাবে সত্য। তরুণ চায় কাজ, চায় জীবনের কাজ। চায় জীবিকার নিশ্চয়তা, চায় প্রেরণা। একাত্তরে যে দেশপ্রেম তাকে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য ডাক দিয়েছিল, আজ কি দেশপ্রেম সেই মাপে আছে?

তারুণ্য বিপথগামী হওয়ার পেছনে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং পারিপার্শ্বিক একাধিক কারণ দায়ী। গ্যাং কালচারও অপরাধের পরিসর বাড়াচ্ছে। সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক মূল্যবোধের চর্চার অধোগতি, ভিনদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ এবং কারণ আছে আরও। ক্যাম্পাসে তারুণ্যের একাংশ সুযোগের সন্ধানে থাকে, রাজনীতির নামে চর দখলের মতো শিক্ষাঙ্গন তছনছ করে। মেধাভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির বলয় থেকে বের হয়ে আসার তাগিদ উপেক্ষিত থেকে গেছে। এসবের দায় দায়িত্বশীলদের এড়ানোর অবকাশ কি আছে? তরুণদের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে দেশ এই প্রত্যাশা সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে উচ্চারিত হয়। তরুণদের মধ্যে রয়েছে অদম্য প্রাণশক্তি। তরুণরা যেন ভালো ভালো কাজ করতে পারে, দেশের নীতিনির্ধারকদের সেই ক্ষেত্রগুলো তৈরি করে দিতে হবে এই কথাগুলোও উচ্চারিত হয় প্রত্যাশায়। রাষ্ট্র তরুণদের জন্য তেমন কোনো ‘জায়গা’ তৈরি করে দিচ্ছে না, এও অসত্য নয়। দায়িত্বশীলদের যতটা  বাগাড়ম্বর শুনি, সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার আয়োজন কি ততটা দেখি? যাদের বিত্ত আছে, ক্ষমতা আছে তারা তাদের সন্তানদের দেশের বাইরে নিরাপদ পরিবেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। কিন্তু সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাদের সন্তানদের নিয়ে কী করবে? পাচার হওয়া কিংবা মাদকের কাছে সমর্পিত হওয়া অথবা চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার পথ রুদ্ধ করার দায়দায়িত্ব যাদের তারা বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ অনুধাবনে কতটা সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছেন? রক্তস্নাত দেশের তারুণ্যের একটা অংশ কেন, কী কারণে আঁধারের যাত্রী হচ্ছে, এই আত্মজিজ্ঞাসা আগে জাগুক রাজনীতিকদের মধ্যে।

বৈষম্য, ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক বিদ্বেষের ছায়া সরানোর অঙ্গীকার কি সত্যিই জারি আছে? নজরুলের তারুণ্য আমাদের আন্দোলিত করুক, পরার্থপরতায় উদ্বুদ্ধ করুক। তরুণদের সামনের পথটা অসাধু  ও ক্ষমতাবানরা আর কণ্টকিত করবেন না। এই পথটা মসৃণ করতে পারলে নিশ্চয় আমরা পেরিয়ে যেতে পারব ‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার।’

লেখক : সাংবাদিক, বিশ্লেষক, কবি ও কলাম লেখক

deba_bishnu@yahoo.com