সবাক সুর নির্বাক কবি

কবি কাজী নজরুল ইসলামের যৌবনের সবচেয়ে সোনালি সময়ের একটি ছবি চোখের সামনে মেলে ধরে তার চৈতন্য ফিরিয়ে আনার টোটকা চেষ্টা করেছিলেন আলোকচিত্রশিল্পী আমানুল হক। বাঁশি বাদনরত কবির সেই তারুণ্যদীপ্ত ছবিটি তুলেছিলেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের প্রথম স্বাস্থ্যমন্ত্রী হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী। তিনি ছিলেন কবির অত্যন্ত স্নেহভাজন। ছবিটি তোলা হয়েছিল ১৯২৬ সালে, চট্টগ্রামের নন্দনকাননে বাহারের নানাবাড়িতে। এই ছবি যখন তোলা হয় তখন কবির বয়স ২৭, আর হবীবুল্লাহ বাহারের ২০। ৭৭ বছর আয়ু পাওয়া নজরুলের বর্ণাঢ্য জীবনের যত ছবি রয়েছে এর মধ্যে বাঁশি বাজানোর দৃশ্যটিই কবির স্বর্ণযুগের স্বাক্ষর বহন করে।

চল্লিশের দশকের শুরুতে কবি বাকরুদ্ধ হন। অন্যদিকে ১৯৫৩ সালে অসুস্থ হন হবীবুল্লাহ বাহার। ১৯৬২ সালের অক্টোবর মাসে তিনি স্বপরিবারে আজমীর শরীফ যান। সেখান থেকে কলকাতায় আসেন। কলকাতায় এসে তিনি কবির মন্মথ দত্ত রোডের বাড়িতে যান কবির সঙ্গে দেখা করতে। নজরুল ও বাহার দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে থাকার নির্বাক দৃশ্যটি তখনকার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে বাহার বুঝতে পারেন তার হাতে খুব বেশি সময় নেই। তিনি একদিন আমানুলকে বাসায় ডাকলেন। নজরুলের কয়েকটি পুরনো নেগেটিভ তার হাতে দিয়ে বললেন, যতটা সম্ভব এনলার্জ করতে। নেগেটিভগুলোর অবস্থা তখন খুবই সঙ্গীন। নেগেটিভের গায়ে ফাঙাসের দাগ। কয়েকটি আবার পোকায়কাটা। পোকাকাটা নেগেটিভ থেকে বহু চেষ্টায় নজরুলের বাঁশি বাজানোর ছবিটি প্রিন্ট করলেন আমানুল। ছবিটি প্রিন্ট করতে বেশ সময় লেগে গেল। ফলে বাহারকে আর এনলার্জ প্রিন্টটি দেওয়া হলো না। ছবিটি প্রিন্ট করার আগেই গত হন বাহার। আমানুল থাকতেন তার বড় ভাই আজমল হকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের বাসায়। ফলে নজরুলের বিশাল আকারের ছবিটি এই বাসায়ই সযতেœ রাখা ছিল।

দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবিকে স্বপরিবারে কলকাতা থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। তৎকালীন সরকার ঢাকার ধানম-ি ২৮ নম্বর সড়কে কবির নামে একটি বাড়ি বরাদ্দ দেয়। বাড়িটির নাম রাখা হয় ‘কবি ভবন’। কবিকে নিয়ে তখন মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। ওই সময় আমানুল সিদ্ধান্ত নিলেন, নজরুলের এই প্রতিকৃতিটি তিনি জাদুঘরে হস্তান্তর করবেন। তাতে মানুষ কবির এই প্রাণোচ্ছ্বল ছবিটি দেখার সুযোগ পাবে। তিনি জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। কিন্তু তাদের অমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তিনি বেশ বিরক্ত। এই সময় তার মাথায় একটা ধারণা আসে।

আমানুল শুনেছেন, কলকাতায় নজরুলকে একবার দেখতে আসেন তার এক ভক্ত। তখন সেই ভক্তের খাতায় আকস্মিকভাবে তিনি লিখেছিলেন ‘চিরকবি নজরুল’। এই ঘটনা নাকি তখন সবার মনে নজরুলের সম্বিত ফিরে আসার কিঞ্চিৎ আশা সঞ্চার করেছিল। এ রকম আরও ছোটখাটো কিছু প্রতিক্রিয়া নাকি কবির পরবর্তী জীবনেও লক্ষ্য করা গেছে। এসব ঘটনা আমানুলের মনেও কিছুটা আশার আলো দেখায়। তার মনে হয়, কবির সামনে তারুণ্যদীপ্ত ছবিটি ঠিকঠাকভাবে তুলে ধরতে পারলে হয়তো কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যেতে পারে। আর তাতে জন্ম হতে পারে আরও একটি দুর্লভ মুহূর্তের।

সবুজ গাছপালা ছাওয়া কবি ভবনে বার্ধক্যপীড়িত নজরুল তখন সম্পূর্ণ সম্বিতহীন। তা সত্ত্বেও বিশাল প্রতিকৃতিটি নিয়ে বেশ কয়েকজন বন্ধুবান্ধবসহ আমানুল এক সকালে কবি ভবনে গিয়ে হাজির হলেন। সঙ্গে নানা মডেলের ক্যামেরা, লেন্স আর যথেষ্ট পরিমাণ ফিল্ম। কবি ভবনের বারান্দার দেয়াল বরাবর প্রতিকৃতিটি রাখা হলো। কবিকে নিয়ে আসা হলো সেই প্রতিকৃতির সামনে। ছবি দেখিয়ে তার স্মৃতির পুকুরে ঢিল ছুড়ে মারা হলো। কিন্তু জরা ও বয়সের ভারে ন্যুজ কবি নির্বাক আত্মমগ্ন। তার দুই চোখে অন্তর্লীন বৈরাগ্যের রিক্ত দৃষ্টি যেন অসীমায় প্রসারিত। সারা দিন চেষ্টা করে সামান্য প্রতিক্রিয়াও পাওয়া গেল না। শেষে বিশাল আকারের ছবিটি পেছনে রেখে কবির আত্মমগ্নতা ক্যামেরায় ধরলেন আমানুল।

সাহিত্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত স্মৃতিচিত্র বইয়ের ১৬ নম্বর পৃষ্ঠায় আমানুল হক লিখেছেন ‘সম্পূর্ণ চৈতন্যহীন নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি আসলে নজরুল জীবনের পর্বতপ্রমাণ ট্র্যাজিডিকেই প্রকাশ করে।’