তোমার কাছে আসতে হবে বারবার

বন্ধুরা মিলে হিসাব করলাম প্রায় ৩০০ দিন হয়ে যাচ্ছে আমাদের একসঙ্গে কোথাও যাওয়া হয়নি। আড্ডায় সিদ্ধান্ত নিলাম সবাই ভ্রমণ করতে যাব। আলোচনা করে তারিখটাও ঠিক করে ফেললাম। কিন্তু কোথায় যাব সেটা ঠিক করা হয়নি। নানা আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের পর অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো শ্রীমঙ্গলে যাব। বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক আর নুরজাহান চা বাগানের সৌন্দর্যের কথা অনেক শুনেছি।

নির্ধারিত দিনে ছয় বন্ধু হাজির হলাম চট্টগ্রামের একে খান বাস স্টপেজে। রাত ১১টার বাসে উঠলাম শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশে। সারা রাত বাসে গল্প, আড্ডা আর ঘুমিয়ে ভোরে পৌঁছালাম শ্রীমঙ্গলে। বাসস্ট্যান্ড থেকে বের হয়ে প্রথমে একটা চাঁদের গাড়ি ঠিক করলাম। সারা দিনের জন্য ভাড়া ১০ হাজার। শ্রীমঙ্গলের সব জায়গা ঘুরিয়ে দেখাবে।

গাড়িতে ব্যাগ রেখে সবাই পাশের এক রেস্তোরাঁয় ফ্রেশ হয়ে সকালের নাশতা করে নিলাম। শ্রীমঙ্গলে এসে সাতরঙা চা পান না করলে তো হবে না। তাই সকালের নাশতার সঙ্গে বিখ্যাত সাতরঙা চা খেলাম। চা শেষ করেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশে। প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। উদ্যানের ভেতরে প্রবেশ করতেই মনে হলো যেন অন্য এক জগতে চলে এসেছি। চারপাশে বিশাল উঁচু উঁচু গাছ, পাখির ডাক আর ঠা-া বাতাস। জঙ্গলের ভেতরের সরু পথ ধরে হাঁটছিলাম আর চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। মাঝে মাঝে বানর দেখতে পাচ্ছিলাম। গাছের ডালে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। এখানে আমার প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের ‘আমার আছে জল’ সিনেমার শ্যুটিং হয়েছিল। সেই রেললাইনের পাশে জায়গাটা নিজ চোখে দেখলাম।

অনেকটা সময় জঙ্গলের ভেতরে ঘুরলাম। কোথাও সূর্যের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে মাটিতে পড়ছে, কোথাও আবার ঘন অন্ধকার। পুরো জায়গাটা যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য স্বর্গ। ছবি তুলতে তুলতেই সময় কেটে যাচ্ছিল। লাউয়াছড়া ঘুরে দুপুরের দিকে আমরা চলে গেলাম মাধবপুর লেকের উদ্দেশে। পাহাড়ি রাস্তা আর চা বাগানের মাঝ দিয়ে যেতে যেতে মনে হলো এই পথ যদি না শেষ হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর পৌঁছে গেলাম মাধবপুর লেকে।

দূর থেকে লেকটা দেখেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। চারপাশে সবুজ পাহাড় আর মাঝখানে নীলচে পানির বিশাল লেক। হালকা বাতাস বইছিল। লেকের পাশে বসে মনে হলো সময় যেন থেমে গেছে। আমরা কিছুক্ষণ নীরবে বসে শুধু প্রকৃতিটা উপভোগ করছিলাম। বিকেলের দিকে গেলাম নুরজাহান চা বাগানে। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। সারি সারি চা গাছ যেন সবুজ কার্পেটের মতো বিছিয়ে আছে। দূরে চা শ্রমিকরা ঝুড়ি পিঠে চা পাতা তুলছিলেন। পুরো দৃশ্যটা এত সুন্দর লাগছিল মনে হলো ভ্রমণের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছি। চা বাগানের মাঝের সরু রাস্তা ধরে আমরা হাঁটছিলাম। সূর্য যখন ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল তখন পুরো চা বাগানটা যেন সোনালি রঙে রঙিন হয়ে উঠেছিল। এমন সুন্দর বিকেল জীবনে খুব কমই দেখেছি।

সন্ধ্যার দিকে আমরা রিসোর্টে ফিরে এলাম। রাতে স্থানীয় খাবার দিয়ে জমিয়ে খাওয়া হলো। গরম ভাত, দেশি মুরগি আর পাহাড়ি সবজি দিয়ে রাতের খাবারের স্বাদ যেন অন্যরকম ছিল। খাওয়া শেষে সবাই মিলে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিলাম। পরদিন সকালে আবার একটু ঘুরে শপিং করলাম। শ্রীমঙ্গলের বিখ্যাত চা কিনলাম। এরপর দুপুরের বাসে আবার চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ফেরার সময় বাসের জানালা দিয়ে শেষবারের মতো সবুজ চা বাগানগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল শ্রীমঙ্গল তোমার কাছে আবার আসতে হবে।