পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতাল পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (পিমস)। বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালেও হাসপাতালটির তৃতীয় তলায় থাকা ১৫৬ শয্যার মা ও শিশু স্বাস্থ্য (এমসিএইচ) ইউনিটের নবজাতক ওয়ার্ডে চলছিল স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম। সেখানে সদ্য জন্ম নেওয়া ১৬টি শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। কিন্তু সকাল আনুমানিক পৌনে ৭টার দিকে কয়েক মুহূর্তেই বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি।
ওয়ার্ডের একটি এয়ারকন্ডিশনারের (এসি) কম্প্রেসর বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। এরপর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আগুন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও পাকিস্তানের গণমাধ্যম জিও টিভি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং উদ্ধারকারী সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, এ ঘটনায় অন্তত ১৫ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। ১৬ শিশুর মধ্যে মাত্র একজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
তবে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদনে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং একজন শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্য শিশুদের দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
আগুন কীভাবে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন—একটি এসির কম্প্রেসর বিস্ফোরণ কীভাবে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি নবজাতক ওয়ার্ডকে প্রাণঘাতী আগুনের ফাঁদে পরিণত করল?
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এসির কম্প্রেসর বিস্ফোরণের পর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ওয়ার্ডে থাকা হাই-ফ্লো অক্সিজেন পাইপলাইনে। অক্সিজেন নিজে দাহ্য নয়, তবে এটি দাহ্য পদার্থের জ্বলার গতি ও তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
আর এই ওয়ার্ডে থাকা বেশিরভাগ নবজাতকই ছিল ইনকিউবেটর ও অক্সিজেন সাপোর্টে। ফলে অক্সিজেন লাইনের কাছে আগুন পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ আকার নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই কক্ষটি আগুন ও ঘন ধোঁয়ায় ভরে যায়।
যেসব শিশু নিজেরাই নড়াচড়া করতে সক্ষম নয়, তাদের অনেকেই তখন চিকিৎসা সরঞ্জামের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে আগুন লাগার পর তাদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া কতটা সম্ভব ছিল, সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কয়েক মিনিটের মধ্যে পালাতে বাধ্য স্বজনরা
ঘটনার ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়েছেন হিভসা ওয়ালিদ। ঘটনার সময় তিনি ওই নবজাতক ওয়ার্ডের বিপরীত পাশের একটি কক্ষে নিজের স্বজনের সদ্যোজাত শিশুর কাছে ছিলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার দিকে তারা বাইরে প্রচণ্ড চিৎকার শুনতে পান। প্রথমে বিষয়টিকে সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা মনে হলেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই করিডোর ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে তারা আর অপেক্ষা করেননি। কয়েক দিনের শিশুটিকে কোলে নিয়ে দ্রুত ভবন থেকে নিচে নেমে আসেন।
আগুনের মধ্যে এক নবজাতককে বাঁচালেন চিকিৎসক
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি গাড়ি ও চারটি অ্যাম্বুলেন্স। শুরু হয় উদ্ধার তৎপরতা।
জিও টিভি ও বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিমসের একজন চিকিৎসক নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে প্রবেশ করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি মাত্র একটি নবজাতককে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনতে সক্ষম হন।
১৬ শিশুর মধ্যে একজনকে জীবিত উদ্ধার হওয়ার এই ঘটনাই এখন ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতার পাশাপাশি একমাত্র স্বস্তির খবর।
শনাক্ত করা যাচ্ছে না মরদেহ, ভরসা ডিএনএ পরীক্ষা
অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতাল প্রাঙ্গণের চিত্র আরও ভারী করে তুলেছে স্বজনদের আহাজারি। সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা কাঁচের টুকরো ও রক্তভেজা সার্জিক্যাল মাস্ক। বাইরে অবস্থান করছে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর স্যাটেলাইট ভ্যান।
আর ওয়ার্ডের বাইরে অপেক্ষা করছেন সেই মা-বাবারা, যারা কয়েক ঘণ্টা আগেও সন্তানের মুখ দেখার অপেক্ষায় ছিলেন।
পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আগুনে শিশুদের মরদেহ এতটাই দগ্ধ ও বিকৃত হয়েছে যে শুধু দেখে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ কারণে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। এরপর শনাক্ত হওয়া মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর তদন্তের নির্দেশ, ২৪ ঘণ্টার সময়
ঘটনার পরপরই পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।
এরই মধ্যে তিন সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইসলামাবাদের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও এডিশনাল ডেপুটি কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
কমিটির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ বের করা এবং ঘটনার পেছনে কারও অবহেলা ছিল কি না, তা শনাক্ত করা।
বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা, নাকি পুরোনো অব্যবস্থার নতুন প্রমাণ
পিমসের মতো একটি শীর্ষ সরকারি হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড পাকিস্তানের ভবন নিরাপত্তা ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আবারও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
কারণ, দেশটিতে অগ্নিকাণ্ডে বিপুল প্রাণহানির ঘটনা নতুন নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে করাচির বহুতল গুল প্লাজা শপিং সেন্টারে আগুনে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০২১ সালে করাচির একটি আবাসিক এলাকায় ছোট একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ১৬ জন।
এরও আগে ২০১২ সালে করাচির একটি পোশাক কারখানায় ভয়াবহ আগুনে প্রায় ৩০০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। জরুরি বের হওয়ার পথ না থাকা এবং জানালায় লোহার গ্রিল থাকায় বহু শ্রমিক ভেতরে আটকা পড়েছিলেন।
এই ঘটনাগুলো সামনে রেখে পিমসের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে এখন শুধু একটি এসির কম্প্রেসর বিস্ফোরণের প্রশ্নই যথেষ্ট নয়। বরং তদন্তকারীদের সামনে বড় হয়ে উঠছে আরও কয়েকটি প্রশ্ন—নবজাতক ওয়ার্ডের এসিগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো কি না, অক্সিজেন পাইপলাইন কতটা নিরাপদ ছিল, আগুন লাগলে শিশুদের সরিয়ে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা ছিল কি না এবং জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তা প্রটোকল কতটা কার্যকর ছিল।
প্রাথমিক তদন্তে সময়মতো এসি সার্ভিসিং না করা এবং অক্সিজেন পয়েন্টগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। যদি তদন্তে এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে ১৫ নবজাতকের মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়—বরং একটি অতি-সংবেদনশীল চিকিৎসা ইউনিটে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্ভাব্য ব্যর্থতার ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবেও সামনে আসবে।
এখন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির ২৪ ঘণ্টার প্রতিবেদনের দিকেই নজর। সেই প্রতিবেদনে স্পষ্ট হতে পারে, কয়েক মিনিটের আগুন কীভাবে ১৬টি নবজাতকের জীবনকে বিপর্যস্ত করল এবং এই মর্মান্তিক ঘটনা ঠেকানোর মতো কোনো ব্যবস্থা আগে থেকেই নেওয়া হয়েছিল কি না।