প্যারিসে পাসপোর্ট সেবা নিয়ে প্রবাসীদের চরম দুর্ভোগ

ফ্রান্সে বাংলাদেশ দূতাবাসের পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবা নিতে গিয়ে প্রবাসীদের ভোগান্তি যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না পাওয়ায় অনেক সেবাপ্রত্যাশীকে রাত ১২টার পরই দূতাবাসের সামনে এসে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। শীত-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাতভর লাইনে দাঁড়ানোর পরও পরদিন সিরিয়াল মিলবে কি না, সেই নিশ্চয়তা থাকছে না। এতে ক্ষোভ, হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে ফ্রান্সপ্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে।

সেবাপ্রত্যাশীদের ভাষ্য, ভোর হওয়ার আগেই দূতাবাসের সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। সিরিয়াল পাওয়ার অনিশ্চয়তা, অতিরিক্ত ভিড় এবং হুড়োহুড়ির কারণে অনেক সময় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি সিরিয়াল নেওয়াকে কেন্দ্র করে ভিড়ের মধ্যে একটি শিশু আহত হয়েছে বলেও কয়েকজন সেবাগ্রহীতা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় নারী, শিশু ও প্রবীণদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরের বিভিন্ন শহর থেকেও পাসপোর্ট নবায়নের আশায় অনেক বাংলাদেশি রাতেই যাত্রা করেন। ভোর হওয়ার আগেই দূতাবাসে পৌঁছে তাদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। লিল শহরের বাসিন্দা ঝিনাইদহের আজিজুর রহমান জানান, অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না পেয়ে মধ্যরাতেই লিল থেকে প্যারিসের উদ্দেশে রওনা হতে হয়েছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা অত্যন্ত কষ্টকর। বিশেষ করে কর্মজীবী, প্রবীণ এবং পরিবারসহ আসা মানুষের দুর্ভোগ আরও বেশি।

শরীয়তপুরের ডামুডা উপজেলার নাইম জানান, পাসপোর্টের প্রয়োজন থাকায় স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে রাত জেগে দূতাবাসের সামনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তার অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার জন্য পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা নেই। নির্দিষ্ট ও নিশ্চিত সময়সূচি না থাকায় শিশু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সেবা নিতে আসা মানুষের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের ভ্রমণ, পরিচয় যাচাইসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সময়মতো নবায়ন করতে না পারায় অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। সিলেটের গফ্ফর এবং মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরকেওয়ার ইউনিয়নের এক সেবাপ্রত্যাশী জানান, পাসপোর্ট নবায়নে বিলম্ব হলে প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ দূতাবাস, প্যারিসের পাসপোর্ট উইংয়ের সরহাদ শাকিল বলেন, জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আলাদা ডেস্ক স্থাপন করে সেবা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা ও জনবল নেই। একই সঙ্গে দূতাবাসকে বিভিন্ন ধরনের কনস্যুলার সেবা পরিচালনা করতে হয়। তিনি বলেন, এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জরুরি পাসপোর্টসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে দূতাবাস আন্তরিকভাবে কাজ করছে।

দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি কমাতে ফ্রান্সপ্রবাসী বাংলাদেশিরা আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক কনস্যুলার ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের কনস্যুলার সেবা অনিশ্চিত সিরিয়াল কিংবা রাতভর অপেক্ষার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। এমন একটি আধুনিক ও ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে আগেই নির্দিষ্ট সময়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যাবে, সেবার নিশ্চয়তা থাকবে এবং নারী, শিশু ও প্রবীণদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।

প্রবাসীদের দাবি-স্বচ্ছ ও কার্যকর অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা চালু, ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিকভাবে কনস্যুলার সেবা সম্প্রসারণ, শিশু-নারী ও প্রবীণদের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবা নিশ্চিত, জরুরি পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সমস্যার জন্য পৃথক জরুরি সেবা ডেস্ক চালু, সিরিয়াল ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা-স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং দূরবর্তী শহর থেকে আসা প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত সময়ের সেবা নিশ্চিত করা।