ঢাকার কোনো ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়ালে মনে হয়, শহরটা যেন প্রতিদিন নতুন করে স্বপ্নের বাজার বসায়। কেউ ছুটছে প্রথম চাকরির সাক্ষাৎকারে, হাতে জীবনবৃত্তান্ত; কেউ অফিসের ব্যস্ততায় মুঠোফোনের পর্দায় খুঁজছে পরবর্তী সম্ভাবনা। এই শহরে পথের অভাব নেই, অভাব শুধু নিশ্চিত গন্তব্যের। কোন পথে হাঁটলে স্বপ্নের কাছে পৌঁছানো যাবে-সেই উত্তর খুঁজতেই শুরু হয় কর্মজীবনের দীর্ঘ যাত্রা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষার পর প্রথম জীবনবৃত্তান্ত পাঠানোর মুহূর্তে প্রশ্ন থাকে খুব সহজ-‘চাকরিটা পাব তো?’ প্রথম চাকরি পাওয়ার পর সেই প্রশ্ন বদলে যায়-‘কীভাবে ভালো করব?’ আর সময়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতা যখন একটু একটু করে জমতে থাকে, তখন প্রশ্নটি আরও গভীরে গিয়ে দাঁড়ায়-‘কীভাবে এমন একজন পেশাজীবী হয়ে উঠব, যার অনুপস্থিতি প্রতিষ্ঠান অনুভব করবে?’
ক্যারিয়ার নদীর মতো, স্রোতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়
১৪ বছরের কর্মজীবনে এফএমসিজি, টেলিকম, ডিভাইস, লাইফস্টাইল, কনজ্যুমার ইলেকট্রনিকস এবং ফিনটেক বিভিন্ন শিল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে শিখিয়েছে: ক্যারিয়ার কোনো সরল সিঁড়ি নয়; বরং এটি নদীর মতো। কখনো স্রোত দ্রুত, কখনো পথ বদলাতে হয়, কখনো অচেনা তীরে ভিড়তে হয়। যে তরুণ স্রোতের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে, সে-ই শেষ পর্যন্ত দূর যেতে পারে।
করপোরেট জীবনে অভিযোজনযোগ্যতা বা অ্যাডাপ্টেবিলিটি এখন আর অতিরিক্ত গুণ নয়, এটি টিকে থাকার মৌলিক দক্ষতা। একটি শিল্পে যে অভিজ্ঞতা মূল্যবান, অন্য শিল্পে সেটির ভাষা বদলে যেতে পারে। তাই নতুন দায়িত্ব বা নতুন শিল্পকে ভয় না পেয়ে ভাবুন, আগের অভিজ্ঞতার কোন অংশটি এখানে নতুনভাবে কাজে লাগানো যায়। আপনার অতীত কোনো বোঝা নয়; সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে সেটিই ভবিষ্যতের পুঁজি।
ডিজিটাল দক্ষতা: টিকে থাকার মৌলিক শর্ত
আজকের কর্মজগতে ডিজিটাল দক্ষতা ছাড়া এগিয়ে যাওয়া কঠিন। তবে ডিজিটাল দক্ষতা মানে শুধু কোনো সফটওয়্যার চালাতে পারা নয়। তথ্য পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া, ড্যাশবোর্ড থেকে ব্যবসায়িক সংকেত খুঁজে বের করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কাজকে আরও কার্যকর করা, অনলাইনে পেশাদার যোগাযোগ বজায় রাখা-এসবই এর অংশ। প্রযুক্তি মানুষের বিকল্প নয়; বরং যে মানুষ প্রযুক্তিকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন, প্রযুক্তি তাঁর ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
শেখা থামানো যাবে না
বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ চাকরির দরজা খুলতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য দরকার ধারাবাহিক আপস্কিলিং। প্রতি বছর নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, গত বছর আমি কী শিখেছি, আর আগামী বছর কোন দক্ষতা আমাকে আরও কার্যকর করবে। ব্যবসায়িক যোগাযোগ, আর্থিক সচেতনতা, ডেটা বিশ্লেষণ, উপস্থাপনা, আলোচনার কৌশল, নেতৃত্ব এবং ইংরেজি ও বাংলায় পরিষ্কারভাবে লেখার ক্ষমতা-এসব দক্ষতা একসঙ্গে গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে।
বিক্রয় অভিজ্ঞতা: ব্যবসার উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
বিক্রয় ও বিতরণ অভিজ্ঞতার একটি বিশেষ মূল্য আছে। বিক্রয় আপনাকে মানুষের কথা শুনতে শেখায়; বিতরণ শেখায়, পরিকল্পনা বাস্তবে কোথায় ভেঙে পড়ে। বিক্রয় পেশা তরুণদের প্রত্যাখ্যান সামলাতে, দর-কষাকষি করতে, লক্ষ্য নির্ধারণ করতে এবং ফলাফলের দায় নিতে শেখায়। তাই বিক্রয়কে শুধু একটি চাকরি হিসেবে নয়, ব্যবসা শেখার উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখুন।
স্থিতিস্থাপকতা: ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার ক্ষমতা
লক্ষ্য পূরণ না হওয়া, পদোন্নতি আটকে যাওয়া, পছন্দের চাকরি না পাওয়া, প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা-এসব কর্মজীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা। স্থিতিস্থাপকতা বা রেজিলিয়েন্স মানে কষ্ট না পাওয়া নয়; কষ্টের মধ্যেও শিক্ষা খুঁজে আবার দাঁড়াতে পারা। ব্যর্থতার পর নিজেকে দোষারোপ না করে তথ্য বিশ্লেষণ করুন: কোথায় প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল, কোন সিদ্ধান্তটি ভিন্নভাবে নেওয়া যেত, এবং পরের সুযোগের জন্য এখন কী তৈরি করতে হবে।
পেশাগত সম্পর্ক: বিশ্বাসের ভিত্তি
নেটওয়ার্কিং মানে শুধু পরিচিত মানুষের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্য পেশাগত সম্পর্ক তৈরি করা। যাঁদের সঙ্গে কাজ করেন, তাঁদের সময়কে সম্মান করুন, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুন, প্রয়োজনে সহায়তা করুন এবং কৃতিত্ব ভাগ করে নিন। একজন ভালো সহকর্মীর পরিচয় শুধু তিনি কী অর্জন করেছেন তাতে নয়, অন্যদের এগিয়ে নিতে তিনি কতটা প্রস্তুত তাতেও।
সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ: নিজের ওপর
চাকরির পদবি, প্রতিষ্ঠানের নাম কিংবা বর্তমান বেতন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এগুলোই আপনার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। আপনার প্রকৃত নিরাপত্তা তৈরি হয় এমন দক্ষতা, চরিত্র ও শেখার ক্ষমতা দিয়ে, যা এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে আপনার সঙ্গে যেতে পারে। নিজের কাজের ফলাফল লিখে রাখুন, ভুল থেকে শিক্ষা নিন, কঠিন দায়িত্ব এড়িয়ে যাবেন না এবং এমন মানুষ হয়ে উঠুন, যাঁর ওপর নির্ভর করা যায়।
তরুণ বন্ধুদের জন্য শেষ কথা
করপোরেট জীবন কোনো দৌড় নয় যেখানে সবাইকে একই সময়ে একই লাইনে পৌঁছাতে হবে। কারও যাত্রা দ্রুত হবে, কারও পথ বাঁক নেবে, কারও সাফল্য আসবে নীরবে। তুলনা নয়, প্রস্তুতিই হোক আপনার প্রতিদিনের অভ্যাস। বাজার বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, প্রতিষ্ঠানের কাঠামো বদলাবে-কিন্তু শেখার আগ্রহ, মানুষের প্রতি সম্মান, কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং প্রতিকূলতার মুখে ফিরে দাঁড়ানোর সাহস কখনো পুরোনো হয় না।
আজ থেকেই এমন একটি দক্ষতা শিখুন, এমন একটি সম্পর্ক গড়ুন এবং এমন একটি কাজ করুন, যা আগামী দিনের আপনাকে আজকের চেয়ে শক্তিশালী করে। মনে রাখবেন, ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সুযোগটি অনেক সময় বাইরে অপেক্ষা করে না; সেটি তৈরি হয় আপনার প্রস্তুতির ভেতরেই।
লেখক:
হেড অব সেলস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন
কনজ্যুমার ডিজিটাল বিজনেস, এ সি আই