ছয় মাসে রাষ্ট্রের পুনর্গঠন: জনগণের আস্থা, জবাবদিহি ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০১:০০ পিএম

দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন মূল্য যে রাজনৈতিক দলটি দিয়েছে, সেই বিএনপির জন্য ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন নিছক একটি নির্বাচনী বিজয়ের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। হামলা, মামলা, গুম, খুন, নির্যাতন, রাজনৈতিক হয়রানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দলটি যে রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, তার পরিণতিতে ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণকে বহুদিন পর নিজেদের রাজনৈতিক পছন্দ প্রকাশের সুযোগ দেয়। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। আজ সেই সরকারের ছয় মাস—১৮০ দিন।

ছয় মাস একটি রাষ্ট্রের ইতিহাসে খুব দীর্ঘ সময় নয়। বিশেষ করে এমন একটি রাষ্ট্রের জন্য নয়, যে রাষ্ট্র দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক অব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি সংকট এবং সর্বোপরি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের আস্থার সম্পর্কের গভীর ক্ষয় নিয়ে নতুন সরকারের হাতে এসেছে। কিন্তু ছয় মাস এমন একটি সময়ও, যার মধ্যে একটি সরকারের চরিত্র, অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার দিকনির্দেশনা সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।

এই ছয় মাসের সবচেয়ে বড় অর্জন তাই কোনো একটি প্রকল্প, কোনো একটি বাজেট, কোনো একটি অবকাঠামো কিংবা কোনো একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়। সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা।
একটি সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসতে পারে; কিন্তু জনগণের সরকার হয়ে উঠতে হলে তাকে প্রতিদিন জনগণের কাছে জবাব দিতে হয়। নির্বাচনের দিন ভোট পাওয়া একটি রাজনৈতিক ম্যান্ডেট। কিন্তু সেই ম্যান্ডেটের মর্যাদা রক্ষা করা একটি প্রতিদিনের দায়িত্ব। নির্বাচনের পর ক্ষমতা আর জনগণের হাতে থাকে না—এমন ধারণাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিপদ। বরং নির্বাচনের পর জনগণের ক্ষমতাই সরকারের ওপর আরও বড় দায়িত্ব আরোপ করে।

এই ছয় মাসের মূল্যায়ন তাই শুধু সরকার কী করেছে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ হতে পারে না। প্রশ্ন হতে হবে—কীভাবে করেছে, কেন করেছে, কার জন্য করেছে এবং আগামী দিনে কোথায় যেতে চায়।

ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন নিয়ে মানুষের হতাশা ও অবিশ্বাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায় রয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে অংশগ্রহণের সংকট, ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে রাতের ভোটের অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে ‘ডামি নির্বাচন’-এর রাজনৈতিক অভিধা—সব মিলিয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।


এই বাস্তবতার বিপরীতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তন করে না; এটি রাষ্ট্রের বৈধতার ভিত্তিকে পুনর্নির্মাণ করে। ভোটার যখন বিশ্বাস করেন তাঁর একটি ভোটের মূল্য আছে, তখন তিনি কেবল একজন প্রার্থী নির্বাচন করেন না—তিনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নিজের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

এই কারণেই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং তার পরবর্তী সরকারকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের বিজয় হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এটি বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি বহিঃপ্রকাশ।

রাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রকৃত উৎস জনগণ—এই কথাটি সংবিধানে লেখা থাকলেই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আচরণে এই সত্যের প্রতিফলন থাকতে হয়।
বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ এখানেই।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া সরকারকে জনগণের কাছে আরও বেশি দায়বদ্ধ হতে হবে। ক্ষমতার বৈধতা যেন কখনো ক্ষমতার অহংকারে পরিণত না হয়—এটাই গণতন্ত্রের মৌলিক পরীক্ষা।

জনসমর্থন শুধু আবেগ নয়, এটি দায়িত্বেরও উৎস

গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন কর্মসূচিকে ঘিরে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, রাজনৈতিক আবেগ এবং জনসম্পৃক্ততা সরকারের প্রতি ব্যাপক আস্থার একটি চিত্র তুলে ধরেছে। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে মানুষের ঢল কিংবা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের অভূতপূর্ব উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির সঙ্গে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করেছে। কিন্তু এখানেই সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও রয়েছে।


জনগণের ভালোবাসা কোনো সরকারের স্থায়ী সম্পদ নয়। এটি অর্জন করতে হয়, ধরে রাখতে হয় এবং প্রতিদিন নতুন করে প্রমাণ করতে হয়। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা যদি সুশাসনের বিকল্প হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। আবার সুশাসন যদি মানুষের আবেগ, প্রত্যাশা ও মর্যাদাকে উপেক্ষা করে, তাহলেও সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

সুতরাং সরকারের জন্য জনসমর্থনের প্রকৃত অর্থ হলো—আরও বেশি দায়িত্ব, আরও বেশি আত্মসংযম এবং আরও বেশি জবাবদিহি।
প্রধানমন্ত্রী যেখানেই যান, মানুষ তাঁর কাছে আসে—এটি আনন্দের বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি বড় পরীক্ষা। কারণ মানুষের প্রত্যাশা যত বেশি, সরকারের ব্যর্থতার মূল্যও তত বেশি।

জনতার ভালোবাসাকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার না করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের শক্তিতে রূপান্তর করাই হবে পরবর্তী দিনের চ্যালেঞ্জ।

গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য ভিন্নমতের মধ্যে

একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে শুধু তার সমর্থকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই হবে না। তাকে সমালোচকের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে।
বিগত সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিরোধী মতের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ফলে নতুন সরকারের সামনে প্রথম কাজগুলোর একটি ছিল রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্গঠন করা।

বাকস্বাধীনতা মানে শুধু সরকারের প্রশংসা করার অধিকার নয়। বরং সরকারের সমালোচনা করার অধিকারই বাকস্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা।
কেউ সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারেন। কেউ প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে পারেন। কেউ রাজনৈতিক দল, নীতি কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তুলতে পারেন। এমনকি কখনো সেই বক্তব্য অশোভন বা অতিরঞ্জিতও হতে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি হলো—রাষ্ট্র সব সমালোচনার জবাব মামলা, ভয় কিংবা নিপীড়নের মাধ্যমে না দিয়ে যুক্তি, তথ্য এবং রাজনৈতিক কর্মদক্ষতার মাধ্যমে দিতে পারে।

এই সংস্কৃতি যদি সত্যিই প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেটিই হবে গত দেড় দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের যে রাজনৈতিক দর্শন সামনে এনেছিলেন, তার মূল শক্তি ছিল রাজনৈতিক বহুত্ববাদ। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণার মধ্যেও ছিল রাষ্ট্রের নাগরিক পরিচয়কে দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
আজ সেই দর্শনকে আধুনিক রাষ্ট্রের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

কারণ বাংলাদেশ শুধু বিএনপির সমর্থকদের নয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমর্থকদেরও, জামায়াতের সমর্থকদেরও, বামপন্থীদেরও, জাতীয়তাবাদীদেরও, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদেরও, পাহাড়ের মানুষেরও, সমতলের মানুষেরও। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের সরকার হয়, তাহলে তার দায়িত্ব হবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা।
সংসদকে আবার জনগণের বিতর্কের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা

গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি জাতীয় সংসদ। সংসদ যদি শুধু সরকারি সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জায়গায় পরিণত হয়, তাহলে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি ক্ষয়ে যায়।

একটি প্রাণবন্ত সংসদে সরকারকে প্রশ্ন করা হবে। বিরোধী দল সমালোচনা করবে। সরকারি দলের সদস্যরাও সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। সংসদে তর্ক হবে, মতবিরোধ হবে, কখনো উত্তপ্ত বিতর্কও হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হবে সাংবিধানিক ও সংসদীয় প্রক্রিয়ায়।
এই ধরনের সংসদীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা বর্তমান সরকারের একটি বড় দায়িত্ব।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আইন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া, বিভিন্ন অধ্যাদেশকে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় আইনে রূপান্তর করা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে সংসদকে সক্রিয় করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এখানেও একটি নীতি মনে রাখতে হবে—সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আইন পাস করার ক্ষমতা দেয়, কিন্তু গণতান্ত্রিক বৈধতার সর্বোচ্চ রূপ হলো আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্য সৃষ্টি।

শিক্ষার্থীদের সংসদীয় কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত করা, সংসদের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে মর্যাদা দেওয়া, বীরশ্রেষ্ঠদের নামে গ্যালারি নামকরণ—এসব উদ্যোগ প্রতীকী হলেও রাষ্ট্রের নাগরিক সংস্কৃতি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ গণতন্ত্র শুধু সংসদে আইন পাসের বিষয় নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি।


ইশতেহার: প্রতিশ্রুতির কাগজ নয়, জনগণের সঙ্গে চুক্তি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনী ইশতেহার অনেক সময় নির্বাচনের আগে প্রকাশিত একটি আকর্ষণীয় দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ভোট পাওয়ার পর সেটির বাস্তবায়ন নিয়ে তেমন রাজনৈতিক চাপ দেখা যায়নি। এই সংস্কৃতি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারকে যদি সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্র পরিচালনার রোডম্যাপ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে সেটি হবে রাজনৈতিক জবাবদিহির একটি নতুন মানদণ্ড।

বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০, তারেক রহমানের ২৭ দফা এবং যুগপৎ আন্দোলনের অংশীদারদের সঙ্গে প্রণীত ৩১ দফা—এই ধারাগুলো এক ধরনের রাজনৈতিক বিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করে।
অতীতের দর্শনকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড, নারীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড, প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড, জেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান বিনিময়কেন্দ্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের জন্য সম্মানী, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ—এসব কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গুণগত মানের ওপর।
কোনো প্রকল্প চালু করাই সাফল্য নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো—যে কৃষক কার্ড পেলেন, তাঁর উৎপাদন বাড়ল কি না; যে নারী ফ্যামিলি কার্ড পেলেন, তাঁর পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়ল কি না; যে তরুণ কর্মসংস্থান খুঁজছেন, তিনি বাস্তবে কাজ পেলেন কি না।
রাষ্ট্রের নীতি তখনই সফল হয়, যখন কাগজের সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন সৃষ্টি করে।

কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অর্থনীতি

প্রথম মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে কৃষকদের নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগকে প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলা যায়। কারণ কৃষি অর্থনীতি শুধু খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামাজিক স্থিতিশীলতারও ভিত্তি।
কৃষকের ঋণ যদি তাকে উৎপাদন থেকে বিচ্ছিন্ন করে, তাহলে রাষ্ট্রের খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই কৃষককে শুধু ভর্তুকি দিয়ে নয়, বাজার, প্রযুক্তি, ঋণ, বীমা, সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্যের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।


একইভাবে শ্রমিকের বেতন, বকেয়া ও বোনাস নিশ্চিত করা জরুরি। ঈদের আগে শ্রমিক অসন্তোষ না থাকা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শ্রমিকের জীবনমান উন্নত করতে হলে শুধু উৎসবভিত্তিক ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশের শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শ্রমিকের নিরাপত্তা, উদ্যোক্তার আস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা—এই তিনটির ভারসাম্যের ওপর।

বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগও তাই সতর্কতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান শুধু ঐতিহ্যবাহী বলে চালু করা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়। প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বাজার এবং উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে টেকসই করতে হবে।
দ্রব্যমূল্য: সরকারের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা

একটি সরকারের জনপ্রিয়তা পরিমাপের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো বাজার। রাজনৈতিক বক্তৃতা, আন্তর্জাতিক সম্মেলন কিংবা বড় প্রকল্পের চেয়ে সাধারণ মানুষের কাছে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস, ওষুধ এবং বাসাভাড়ার দাম অনেক বেশি বাস্তব।

রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তাই সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি—প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ আর টেকসই বাজার সংস্কার এক জিনিস নয়।
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে হলে আমদানি-প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, পরিবহন খরচ কমাতে হবে, মজুত ও সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগীর কাঠামো বিশ্লেষণ করতে হবে।

মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে শুধু বাজারে অভিযান নয়; সুদের হার, মুদ্রা সরবরাহ, বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, উৎপাদন ও রাজস্ব নীতির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। এখানেই সরকারের অর্থনৈতিক দক্ষতার প্রকৃত পরীক্ষা।

জ্বালানি সংকট: উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যতের শিক্ষা

জ্বালানি খাতের সংকট বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন উত্তরাধিকারগুলোর একটি। গ্যাসের ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা, এলএনজি সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানের ঘাটতি—সবকিছু একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
দুটি এফএসআরইউ-এর একটি কারিগরি সমস্যায় পড়লে তার প্রভাব পুরো সরবরাহব্যবস্থায় পড়ে—এটি শুধু একটি যন্ত্রের সমস্যা নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তার কাঠামোগত দুর্বলতারও প্রতিফলন।


অতীতের ভুলের দায় নির্ধারণ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একটি নতুন সরকারকে শুধু অতীতের ব্যর্থতার ব্যাখ্যা দিয়ে থেমে থাকলে চলবে না।
আজকের প্রশ্ন হলো—আগামী দশ বছরে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ করতে হবে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতাকে পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে আমদানি-নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে বহুমুখী উৎস তৈরি করতে হবে।
চীন, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিদেশি সহায়তা কখনো জাতীয় জ্বালানি নীতির বিকল্প হতে পারে না।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার শেষ ভরসা হতে হবে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা।

অর্থনীতি: সংস্কারের সময় এখনই

সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন অর্থনীতির যে অবস্থা ছিল তা রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, রাজস্ব ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা—এসব সমস্যার সমাধান করতে হলে একদিকে কঠোর সংস্কার, অন্যদিকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
এখানে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—রাজস্ব বাড়ানো এবং একই সঙ্গে নাগরিক ও ব্যবসার ওপর অযৌক্তিক করের চাপ না বাড়ানো। ৬০টির বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর বা ভ্যাটের চাপ কমানোর উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে করের আওতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের সমস্যা শুধু করের হার নয়; করদাতার সংখ্যা এবং কর প্রশাসনের দক্ষতাও বড় সমস্যা।


যে ব্যক্তি নিয়মিত কর দেন, আর যে ব্যক্তি বিশাল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও করব্যবস্থার বাইরে থাকেন—দুজনকে একইভাবে দেখা হলে করব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। অতএব ন্যায্য করব্যবস্থা হবে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে কর ফাঁকি কঠিন এবং নিয়মিত কর দেওয়া সম্মানের বিষয়।


ব্যাংকিং খাত: আস্থা ফিরিয়ে আনার লড়াই

আর্থিক খাতের সংস্কার সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। ব্যাংক হলো অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা। ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতা মানে শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর অর্থ হলো উদ্যোক্তার ঋণ পাওয়া কঠিন হওয়া, আমানতকারীর আস্থা কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া।

অতএব ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের মূলনীতি হওয়া উচিত তিনটি—সুশাসন, জবাবদিহি এবং আমানতকারীর নিরাপত্তা। যারা রাজনৈতিক প্রভাব বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা হতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে পুরো ব্যাংকিং খাতকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়মের সুযোগ না থাকে।

অর্থপাচার বন্ধ করা এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। তবে অর্থ ফেরত আনা একটি দীর্ঘ ও জটিল আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া। এখানে আবেগের চেয়ে তথ্য, আইন, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বেশি কার্যকর।

প্রবাসী: অর্থনীতির নীরব শক্তি

বাংলাদেশের প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ নন; তাঁরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রাষ্ট্রদূত। তাঁদের পাঠানো অর্থ পরিবারকে টিকিয়ে রাখে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে এবং দেশের অর্থনীতিতে ভোগ ও বিনিয়োগের প্রবাহ তৈরি করে।
প্রবাসী কার্ডের মতো উদ্যোগ তখনই সফল হবে, যখন একজন প্রবাসী সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সেবা, সম্মান এবং সুরক্ষা পাবেন।
বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, ভাষা প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা এবং নিরাপদ অভিবাসন—এসবকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ করতে হবে।

শুধু বেশি মানুষ বিদেশে পাঠানো নয়; বেশি দক্ষ মানুষকে বেশি বেতনের চাকরিতে পাঠানোই হতে হবে লক্ষ্য।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা: রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কোনো ব্যয় নয়; এগুলো জাতীয় বিনিয়োগ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা বৃদ্ধি, নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, দুরারোগ্য রোগীদের আর্থিক সহায়তা—এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে সেবা বাস্তবে মানুষের কাছে পৌঁছানোর ওপর।
ঢাকার বাইরে একজন রোগী যদি চিকিৎসকের অভাবে আবার রাজধানীতে ছুটতে বাধ্য হন, তাহলে হাসপাতালের ভবন বড় করলেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত হয়েছে বলা যাবে না।

একইভাবে শিক্ষা সংস্কার মানে শুধু নতুন বিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা নয়। শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ানোই শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ফ্রি ওয়াইফাই, স্কুল ড্রেস, ব্যাগ, মিড-ডে মিল—এসব সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার ব্যয় কমাতে পারে। কিন্তু এর পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষকের জবাবদিহি, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার মানও নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিংয়ের মতো উদ্যোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে প্রাকৃতিক সম্পদ নয়—মানবসম্পদ।

তরুণদের বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুযোগ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড নিজে থেকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয় না। দক্ষতা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা পরিবেশ এবং প্রযুক্তির সঙ্গে তরুণদের যুক্ত করতে হয়। স্টার্টআপ ফান্ড, ইনোভেশন গ্র্যান্ট, সহজ ঋণ, ফ্রিল্যান্সার কার্ড এবং ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া সহযোগিতা—এসব উদ্যোগকে একটি বৃহত্তর জাতীয় উদ্ভাবন নীতির অংশ করতে হবে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি শুধু ডিগ্রি দেয় কিন্তু শিল্পের প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি না করে, তাহলে বেকারত্ব কমবে না।

প্রতিটি অঞ্চলের শিল্পের সঙ্গে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র তৈরি করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থী যেন পড়াশোনা শেষ করার আগেই বুঝতে পারেন—তাঁর এলাকার অর্থনীতিতে কী ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন।
এখানেই শিক্ষা ও অর্থনীতিকে এক সুতোয় বাঁধতে হবে।

নারী: উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া বাংলাদেশ কখনো পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না। ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগের পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ, নিরাপদ গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে।
মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হবে ব্যাপক। কারণ একজন শিক্ষিত নারী শুধু নিজে এগিয়ে যান না; তিনি একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং শেষ পর্যন্ত একটি সমাজকে এগিয়ে দেন।

নারীদের জন্য নিরাপদ গণপরিবহন, বিশেষ বাস সার্ভিস কিংবা ট্রেনে আলাদা সুবিধা—এসব উদ্যোগকে নারীর চলাচলের স্বাধীনতার বৃহত্তর নীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা: ভয় নয়, আস্থা

রাষ্ট্রের শক্তি শুধু অপরাধীকে গ্রেপ্তারে নয়; রাষ্ট্রের শক্তি হলো সাধারণ মানুষ যেন থানায় যেতে ভয় না পান।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যবহার থেকে পুলিশ ও প্রশাসনকে মুক্ত করে সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা বর্তমান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একজন নাগরিক থানায় গিয়ে যদি রাজনৈতিক পরিচয় না দিয়ে নিজের সমস্যার সমাধান পান, তাহলে সেটিই হবে রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, বিচার এবং রায় জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত মামলার তদন্তে অগ্রগতিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে দ্রুত বিচার যেন কখনো তাড়াহুড়োর বিচার না হয়—এই ভারসাম্যও জরুরি।
আইনের শাসন মানে দ্রুত শাস্তি নয়; আইনের শাসন মানে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি নিশ্চিত করা।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হতে হবে।

বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা

বিএনপি দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগের শিকার হয়েছে। ফলে বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় নৈতিক পরীক্ষা হলো—ক্ষমতায় এসে তারা যেন অতীতের প্রতিশোধের রাজনীতিতে ফিরে না যায়। যে অপরাধই হোক, তার বিচার হবে আইনের মাধ্যমে। অপরাধী বিএনপির হলেও বিচার হবে; অন্য দলের হলেও বিচার হবে; সরকারের ঘনিষ্ঠ হলেও বিচার হবে।
এই নীতিই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি হতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষ প্রতিশোধের রাজনীতি চায় না। তারা বিচার চায়। এই দুটির মধ্যে পার্থক্য বিশাল। প্রতিশোধ অতীতকে দীর্ঘায়িত করে। বিচার ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করে।

অবকাঠামো: মেগা প্রকল্প নয়, মেগা ফলাফল

বাংলাদেশে উন্নয়ন মানেই বহুদিন ধরে বড় প্রকল্প—বড় সেতু, বড় সড়ক, বড় ভবন। কিন্তু ভবিষ্যতের উন্নয়ন দর্শন হওয়া উচিত আরও পরিমিত ও ফলাফলভিত্তিক। মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয়, সময় এবং সামাজিক সুফল মূল্যায়ন করতে হবে।

এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ইলেকট্রিক বাস, সৌরশক্তি, পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন—এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের শহুরে ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয়।  কিন্তু প্রযুক্তি বসালেই স্মার্ট সিটি হয় না। স্মার্ট সিটি হলো এমন শহর যেখানে মানুষ কম সময়ে, কম খরচে এবং নিরাপদে চলাচল করতে পারে।

ঢাকার যানজট কমানো তাই শুধু রাস্তা বাড়ানোর বিষয় নয়। গণপরিবহন, পার্কিং, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পথচারী অবকাঠামো এবং নগর পরিকল্পনাকে একসঙ্গে দেখতে হবে।

পরিবেশ ও জলবায়ু

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ফলে পরিবেশ নীতি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, সৌরশক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলাধার সংরক্ষণ—এসবকে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে না দেখে একটি জাতীয় পরিবেশ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার অংশ করা প্রয়োজন।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজের মতো উদ্যোগে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
কারণ উন্নয়ন যদি নদী ধ্বংস করে, কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত করে কিংবা মানুষের বসতি ঝুঁকির মুখে ফেলে, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন নয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন হতে হবে জলবায়ু-সহনশীল।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’: পররাষ্ট্রনীতির নতুন দর্শন

একটি ছোট বা মাঝারি রাষ্ট্রের জন্য পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য অপরিহার্য। বাংলাদেশের কোনো স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী বন্ধু নেই—স্থায়ী স্বার্থ রয়েছে। সেই জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারণা নয়। বরং এর অর্থ হলো—বন্ধুত্ব থাকবে, সহযোগিতা থাকবে, অংশীদারিত্ব থাকবে; কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকবে বাংলাদেশের। চীন ও মালয়েশিয়া সফরে বিনিয়োগ, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার আলোচনা কিংবা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সক্রিয়তা—এসবকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

পররাষ্ট্রনীতির সফলতা শুধু আন্তর্জাতিক সম্মাননায় নয়; তার সাফল্য মাপা হবে কত বিনিয়োগ এসেছে, কত বাজার খুলেছে, কত কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, কতটা জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে এবং কতটা বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর বৃদ্ধি পেয়েছে তার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের পতাকা আন্তর্জাতিক মঞ্চে উঁচু করে ধরার অর্থ হলো—নিজের স্বার্থকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরা, একই সঙ্গে অন্যের স্বার্থের প্রতিও সম্মান দেখানো।

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব: প্রতীকের বাইরে বাস্তবতা

তারেক রহমানের নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো তথাকথিত ভিআইপি সংস্কৃতি ভেঙে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা। কোদাল হাতে খাল খনন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, শিশুদের কাছে যাওয়া, তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে মিতব্যয়ী আচরণ—এসব প্রতীকী দৃশ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করে।

সেই বার্তাটি হলো—রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি জনগণের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা অবশ্যই প্রতীকের বাইরে।

একজন প্রধানমন্ত্রী কতটা সাধারণভাবে চলেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তিনি কতটা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করেন।
একজন ভালো নেতা এমন প্রতিষ্ঠান রেখে যান, যা তাঁর অনুপস্থিতিতেও ভালোভাবে কাজ করে। সুতরাং বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত—ব্যক্তিনির্ভর রাষ্ট্রের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্র তৈরি করা।

ছয় মাসের পর সামনে যে প্রশ্নগুলো

ছয় মাসে সরকারের অর্জন নিয়ে আলোচনা যতটা প্রয়োজন, ততটাই প্রয়োজন ভবিষ্যতের প্রশ্ন তোলা।

প্রথম প্রশ্ন—প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কতটা গভীর হবে?

দ্বিতীয় প্রশ্ন—দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকবে?

তৃতীয় প্রশ্ন—পুলিশ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার কি টেকসই হবে? চতুর্থ প্রশ্ন—ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে?
পঞ্চম প্রশ্ন—অর্থপাচার বন্ধ ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে কতটা বাস্তব অগ্রগতি হবে?
ষষ্ঠ প্রশ্ন—জ্বালানি নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কী?
সপ্তম প্রশ্ন—তরুণদের জন্য কত সংখ্যক বাস্তব কর্মসংস্থান তৈরি হবে?
অষ্টম প্রশ্ন—শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের সঙ্গে সেবার মান কতটা বাড়বে?
নবম প্রশ্ন—স্থানীয় সরকার কতটা শক্তিশালী হবে?
দশম প্রশ্ন—ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিকের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সেবার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য থাকবে কি না?


এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে ছয় মাসের সাফল্যকে পাঁচ বছর পর কীভাবে দেখা হবে।

অতীতের দায়, ভবিষ্যতের দায়িত্ব

বিগত ১৬ বছরের শাসনের নানা অনিয়ম, মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং অর্থনৈতিক দুর্নীতির তদন্ত ও বিচার প্রয়োজন—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হবে তখনই, যখন তারা অতীতের অপরাধের বিচার করবে এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে কোনো সরকার একই ধরনের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সুযোগ না পায়, সেই প্রতিষ্ঠানও তৈরি করবে।
একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থা উৎখাত করা একটি ঘটনা। স্বৈরাচার ফিরে আসার সম্ভাবনা বন্ধ করার মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি করা একটি প্রক্রিয়া।
এই প্রক্রিয়াটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সাংবিধানিক ভারসাম্য, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন গণমাধ্যম, পেশাদার পুলিশ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার এবং কার্যকর সংসদীয় নজরদারি—এসব ছাড়া কোনো গণতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

বিএনপি যদি সত্যিই দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের শিক্ষা ধারণ করে থাকে, তাহলে তাদের শাসনের সবচেয়ে বড় স্মারক হওয়া উচিত হবে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নাগরিকের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে।
ছয় মাসের সবচেয়ে বড় অর্জন: রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা
সরকারের প্রথম ছয় মাসের সব উদ্যোগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়তো কোনো একটি কার্ড, কোনো একটি প্রকল্প বা কোনো একটি বাজেট নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা।

যদি একজন প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন, যদি সরকার সংসদকে সক্রিয় রাখে, যদি বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ থাকে, যদি পুলিশ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বদলে নাগরিকের সেবক হয়, যদি প্রশাসন দলীয় পরিচয়ের বদলে যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেয়, যদি ব্যবসায়ী রাজনৈতিক আশ্রয় নয় বরং নীতির স্থিতিশীলতা পান, যদি তরুণরা রাষ্ট্রকে ভয় না করে রাষ্ট্রকে নিজের ভবিষ্যতের অংশ মনে করে—তাহলেই একটি নতুন বাংলাদেশ তৈরি হবে। রাষ্ট্রের পুনর্গঠন শুধু রাস্তা, সেতু, ভবন বা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়।
রাষ্ট্রের পুনর্গঠন মানে মানুষের আস্থা পুনর্গঠন।


জনগণের সরকারকে জনগণের কাছেই ফিরে যেতে হবে

আজ সরকারের ছয় মাস পূর্তি। এই দিনটি তাই আত্মতুষ্টির দিন হওয়ার কথা নয়। বরং এটি আত্মসমালোচনার দিন।
এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, তা স্মরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৫ বছরেরও বেশি সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর প্রায় দুই বছরের অস্থিতিশীল ও সংকটপূর্ণ অন্তর্বর্তীকালীন সময় শেষে বিএনপি এমন একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়, যেখানে অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইন-শৃঙ্খলা এবং জনগণের আস্থার ক্ষেত্রে গুরুতর চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান ছিল। ব্যাংকিং খাত ছিল তীব্র সংকটের মধ্যে; একই সঙ্গে বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিনের রাজনৈতিকীকরণের ফলে তাদের পেশাদারিত্ব, গ্রহণযোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা অনেকটাই হারিয়েছিল।

সুতরাং চ্যালেঞ্জটি শুধু সরকার পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং রাষ্ট্রের কার্যকরভাবে শাসন করার সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্নির্মাণ করাই ছিল বড় দায়িত্ব। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক শৃঙ্খলা, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জাতীয় উন্নয়নের একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ও আস্থা পুনরুদ্ধার ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন।

এমন একটি কঠিন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে যথাযথ দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ছয় মাসে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয় পুরোপুরি উল্টে দেওয়া সম্ভব নয়; তবে সরকারের দিকনির্দেশনা, অগ্রাধিকার এবং সংস্কার কর্মসূচির প্রতি তার আন্তরিকতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রাথমিক প্রতিফলন এই সময়ের মধ্যে স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই এই প্রাথমিক সময়কে মূলত রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পুনর্গঠনের ভিত্তি তৈরির একটি পর্যায় হিসেবে দেখা উচিত।

তবে যে সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এসেছে, তার কাছে জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি।
মানুষ চায় নিরাপদ জীবন। চায় বাজারে সহনীয় দাম। চায় চাকরি। চায় ভালো শিক্ষা। চায় চিকিৎসা। চায় দুর্নীতিমুক্ত সরকারি সেবা।
চায় পুলিশকে বিশ্বাস করতে। চায় বিচার পেতে। চায় নিজের মত প্রকাশ করতে। চায় নিজের ধর্ম পালন করতে।
চায় দেশের বাইরে গেলে সম্মানের সঙ্গে বাংলাদেশের পাসপোর্ট বহন করতে। চায় তার সন্তান যেন যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে পারে।
চায় তার ভোটের মূল্য থাকুক। সবচেয়ে বড় কথা—মানুষ চায় রাষ্ট্র তাকে নাগরিক হিসেবে সম্মান করুক। এই প্রত্যাশাগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহ নয়। এগুলো নাগরিকের অধিকার।

সুতরাং সরকারের প্রতিটি সাফল্যকে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আলোকে দেখতে হবে।

সামনে আরও কঠিন পথ

ছয় মাসের অর্জনকে স্বীকার করেও বলতে হবে—সবচেয়ে কঠিন সময় এখনো সামনে। কারণ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন প্রথম কয়েক মাসে মানুষ পরিবর্তনের আশা নিয়ে অপেক্ষা করে। কিন্তু সময় যত যায়, প্রত্যাশা তত বাড়ে।  প্রথম ছয় মাসে একটি সরকার বলতে পারে—আমরা সমস্যাগুলো শনাক্ত করেছি। এক বছর পর জনগণ জানতে চাইবে—সমাধান কোথায়? দুই বছর পর প্রশ্ন হবে—পরিবর্তন কতটা স্থায়ী?  আর পাঁচ বছর পর ইতিহাস বিচার করবে—এই সরকার কি সত্যিই রাষ্ট্রের কাঠামো পরিবর্তন করতে পেরেছিল?
এই বিচার থেকে কেউ পালাতে পারবে না।

তাই আজকের ছয় মাস পূর্তি মূলত আগামী চার বছর ছয় মাসের কর্মপরিকল্পনার সূচনা হওয়া উচিত। সরকারকে এখন আরও বেশি তথ্য প্রকাশ করতে হবে। প্রতিটি ইশতেহার প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি জানাতে হবে। কোনটি সম্পন্ন, কোনটি চলমান, কোনটি বিলম্বিত এবং কেন বিলম্বিত—জনগণকে তা জানাতে হবে। এটাই জবাবদিহি।
একটি সরকার যত বেশি তথ্য জনগণের সামনে রাখবে, তত বেশি মানুষের আস্থা অর্জন করবে।

বাংলাদেশকে নতুন করে ভাবার সময়

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তনের ওপর।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে রাষ্ট্র কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। যেখানে পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের বাহিনী নয়।
যেখানে প্রশাসন কোনো ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর আনুগত্যের জায়গা নয়। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র নয়।
যেখানে ব্যবসা করতে রাজনৈতিক পরিচয় প্রয়োজন হয় না। যেখানে সাংবাদিক প্রশ্ন করলে শত্রু হয়ে যান না। যেখানে আদালত রাজনৈতিক নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে না। যেখানে নির্বাচন মানে শুধু ভোটের দিন নয়—পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা। যেখানে তরুণদের বিদেশে যাওয়ার একমাত্র কারণ বেকারত্ব নয়, বরং তারা চাইলে বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে বিদেশে যাবে।  যেখানে গ্রামের কৃষকও ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ। যেখানে পাহাড়ের মানুষ, উপকূলের মানুষ, চরাঞ্চলের মানুষ, শহরের মানুষ—সবাই রাষ্ট্রের সমান নাগরিক।
যেখানে উন্নয়ন মানে শুধু জিডিপি নয়; উন্নয়ন মানে মানবিক মর্যাদা।

এই বাংলাদেশই হতে পারে ১৬ বছরের রাজনৈতিক অন্ধকারের পর সবচেয়ে বড় অর্জন।

শেষ কথা: জনগণই শক্তির উৎস

বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে অনেক উত্থান-পতন রয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন—সব মিলিয়ে দলটির সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে।  এই সুযোগ শুধু ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নতুনভাবে নির্মাণের সুযোগ।
১৬ বছরের ক্ষত রাতারাতি শুকাবে না। দুর্নীতির শিকড় একদিনে উপড়ে ফেলা যাবে না। অর্থনীতির সব সমস্যা ছয় মাসে সমাধান হবে না। জ্বালানি নিরাপত্তা এক বাজেটে নিশ্চিত হবে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাও এক বছরে দূর হবে না।

কিন্তু একটি বিষয় ছয় মাসেই প্রমাণ করা সম্ভব—সরকার কোন দিকে হাঁটছে।

আর সেই দিক যদি হয় গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের ক্ষমতায়ন, তাহলে বাংলাদেশের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যায়। সরকারের ছয় মাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত তাই একটি কথায়—ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে, ক্ষমতার জবাবও জনগণের কাছেই দিতে হবে।
জনগণের ভোট সরকারের বৈধতার উৎস। জনগণের আস্থা সরকারের শক্তি। জনগণের কল্যাণ সরকারের উদ্দেশ্য।আর জনগণের কাছে জবাবদিহি সরকারের কর্তব্য। এই চারটি নীতি যদি রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, তাহলে ছয় মাসের এই পথচলা শুধু একটি সরকারের প্রথম অধ্যায় হয়ে থাকবে না; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের দীর্ঘ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠবে।

আজ থেকে ছয় মাস আগে যে সরকার শপথ নিয়েছিল, তার সামনে তখন ছিল ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব। আজ ছয় মাস পর সামনে আরও বড় দায়িত্ব—সেই পুনর্গঠনকে প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই করা।

জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতার একমাত্র উৎস জনগণই হোক—শুধু বক্তব্যে নয়, প্রতিটি সিদ্ধান্তে।
সরকারের অনুপ্রেরণার উৎস জনগণই হোক—শুধু নির্বাচনের সময় নয়, প্রতিদিন। রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতেই থাকুক—শুধু সংবিধানের পাতায় নয়, বাস্তব জীবনে। 

আর বাংলাদেশ এগিয়ে যাক এমন এক ভবিষ্যতের দিকে, যেখানে গণতন্ত্র হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি, মানবিক মর্যাদা হবে নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা, আইনের শাসন হবে রাষ্ট্রের শক্তি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হবে উন্নয়নের চালিকাশক্তি এবং জাতীয় স্বার্থ হবে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
সবার আগে বাংলাদেশ—এই অঙ্গীকার তখনই সত্যিকার অর্থে সফল হবে, যখন বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক অনুভব করবেন: এই রাষ্ট্র তাঁর, এই দেশ তাঁর, এবং তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাঁর কণ্ঠের মূল্য আছে। সেই বাংলাদেশই হোক আগামী দিনের লক্ষ্য।
সেই বাংলাদেশই হোক ছয় মাসের মূল্যায়নের প্রকৃত মাপকাঠি।

আর সেই বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব—সরকারের যেমন, তেমনি আমাদের সবার। 


▪️*লেখক :* প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত