জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ সুজনের

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ‘স্বাধীন প্রতিষ্ঠান’ বলা হলেও প্রস্তাবিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় এর প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

সুজন বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে কমিশনের স্বাধীন তদন্তের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। খসড়ায় অভিযোগ পাওয়ার পর তা প্রথমে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠিয়ে তাদের প্রতিবেদন নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা কমিশনের নিরপেক্ষ তদন্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে সাধারণ অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনের তদন্ত, সাক্ষ্য গ্রহণ, দলিল ও প্রমাণ সংগ্রহ, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সুজন। কিন্তু গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ যেসব রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে উঠতে পারে, তাদের ক্ষেত্রে কমিশনের স্বাধীন তদন্তক্ষমতা সীমিত থাকলে এসব ইতিবাচক পরিবর্তনের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।

সুজনের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রণীত ২০২৫ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের খসড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কমিশনকে সরাসরি ও স্বাধীন অনুসন্ধান ও তদন্তের যে ক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমান খসড়ায় সেই ক্ষমতা কমানোর পরিবর্তে আরও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে তারা।

এ ছাড়া কমিশনের সদস্য নিয়োগে রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কাঠামোর প্রভাব, অর্থ বরাদ্দে সরকারের ওপর নির্ভরশীলতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুজন। সংগঠনটির মতে, এসব বিষয় কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

সুজন বলছে, বাংলাদেশে অতীতে, বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কারা হেফাজতে মৃত্যু এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যও এসব ঘটনার চরম ভুক্তভোগী ছিলেন বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।

সংগঠনটির ভাষ্য, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রণীত অধ্যাদেশ বাতিল করলেও এ বিষয়ে আরও ভালো আইন করার কথা বলেছিল। কিন্তু বর্তমান খসড়া দেখে মনে হচ্ছে, সরকার সেই অঙ্গীকার থেকে সরে যাচ্ছে।

সুজন মনে করে, ভবিষ্যতে কোনো সরকার, রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্রীয় বাহিনী যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার মতো শক্তিশালী ও কার্যকর সুরক্ষা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আইনে থাকতে হবে। কমিশনকে এমন স্বাধীনতা ও ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে এর কার্যকারিতা বা স্বাধীনতাও পরিবর্তিত না হয়।

আইনটি তড়িঘড়ি করে পাস না করে সংসদীয় কমিটিতে বিস্তারিত পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে সুজন। একই সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগীদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।

এ ছাড়া ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ এমনভাবে প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে সুজন, যাতে গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো সংস্থা বা বাহিনী নিজেরাই তদন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে এবং দ্রুত স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করা এবং গুম প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করে খসড়াটি চূড়ান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিবৃতিতে সুজনের চেয়ারপার্সন বিচারপতি এম এ মতিন এবং প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার স্বাক্ষর করেছেন।