ফলোঅন করেও ১৫৪ ওভার ব্যাটিংয়ে কলম্বো টেস্ট বাঁচালো শ্রীলঙ্কা

কলম্বো টেস্টে ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং রোমাঞ্চকর এক ম্যাচ বাঁচানোর গল্প লিখলো শ্রীলঙ্কা। ভারতের পাহাড়সম রান আর ফলোঅনের জোড়া চাপ মাথায় নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তারা সোনাল দিনুশার দৃঢ়চেতা ব্যাটিংয়ে। ম্যাচের পঞ্চম ও শেষ দিনে ভারতীয় বোলারদের সমস্ত আক্রমণ বুক চিতিয়ে প্রতিহত করে ১৫৪ ওভার ব্যাটিং করে ড্র ছিনিয়ে এনেছে শ্রীলঙ্কান লায়নরা।

ব্যাট হাতে যেন দেওয়ালে পরিণত হয়েছিলেন সোনালের দিনুশা। একের পর এক চার-ছক্কার ঝলকানি নয়, ছিল অবিশ্বাস্য আত্মসংযম আর একাগ্রতার প্রদর্শনী। তার দুর্দান্ত অপরাজিত ১৩৩ রান এবং শেষ দিকের ব্যাটারদের পাহাড়সম ধৈর্যের ওপর ভর করে ভারতের নিশ্চিত জয়ের স্বপ্ন ভেস্তে দিয়েছে শ্রীলঙ্কা। 

লাঞ্চের পর ভারতের আক্রমণের পাল্টা জবাব

শ্রীলঙ্কাকে অলআউট করতে শেষ দিনে আর মাত্র ৪ উইকেটের প্রয়োজন ছিল ভারতের। কিন্তু ৬ উইকেটে ২২৯ রান নিয়ে ব্যাট করতে নেমে ভারতীয় বোলারদের হতাশায় ডুবিয়ে ১০০ রান তুলে নেন দিনুশা আর কেশারা নুয়ান্থা। লঞ্চের ঠিক পরেই ভারতের স্পিনার মানব সুথার টার্ন ও বাউন্সে কেশরা নুয়ান্থাকে গালিতে ক্যাচ বানালে স্বাগতিকদের এগিয়ে থাকার ব্যবধান ছিল মাত্র ১১৭ রান। তখনও দিনের প্রায় দুটি পূর্ণ সেশন বাকি থাকায় জয়ের পথেই ছিল ভারত। 

তবে আসল চমক দেখায় শ্রীলঙ্কার টেল-এন্ডাররা। নুয়ান্থা-দিনুশার ১১২ রানের সপ্তম জুটি ভাঙার পর ভারতের বোলারদের টানা ৪৯.২ ওভার আটকে রাখে স্বাগতিকদের শেষ তিন জুটি। প্রভাত জয়সুরিয়া দিনুশাকে সঙ্গ দিয়ে ৭১ বল ক্রিজে কামড়ে পড়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্র জাদেজার বলে ক্যাচ আউট হন। প্রথম ইনিংসে ভুল শট খেলে আউট হওয়া লাহিরু কুমারা এবার পুরোপুরি নিজেকে বদলে ফেলেন। টানা দুই ঘণ্টা ক্রিজে টিকে থেকে ৯০ বলে মাত্র ১২ রান করেন এবং দিনুশার সাথে ১৭০ বলে ৪৭ রানের এক অনবদ্য জুটি গড়েন। কুমারার আউটের পর নামা অসিতা ফার্নান্দোকে নিয়ে আরও ৫৬ বল পার করে দেন দিনুশা।

শ্রীলঙ্কার লিড যখন ২১৬ রানে পৌঁছায়, ভারত নিজেদের জয়ের আশা ছেড়ে দিয়ে পার্ট-টাইম বোলারদের হাতে বল তুলে দেয়। শেষ সেশনের শেষ ঘণ্টা শুরু হতেই শ্রীলঙ্কা নিজেদের ইনিংস ৪২৯/৯ রানে ডিক্লেয়ার করে এবং দুই অধিনায়ক হাত মিলিয়ে ড্র মেনে নেন। তবে ১-০ ব্যবধানে সিরিজে জিতে নিয়েছে ভারত।

স্পিন আক্রমণের বিরুদ্ধে দিনুশার সুইপ শটের অসাধারণ ব্যবহার এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ ছিল এই ম্যাচের মূল চাবিকাঠি

স্পিন আক্রমণের বিরুদ্ধে দিনুশার সুইপ শটের অসাধারণ ব্যবহার এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ ছিল এই ম্যাচের মূল চাবিকাঠি। এসএসসির ধীরগতির উইকেটে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ শট না খেলে দুই ইনিংসে ৪২৬টি বল খেলেছেন দিনুশা। পুরো সিরিজে চার ইনিংসে তার রান যথাক্রমে— ১০০, ৮৪, ১০৩ এবং অপরাজিত ১৩৩; মোট ৪১৯ রান তুলেছেন ১৩৯.৬৬ গড়ে। জীবনের মাত্র পঞ্চম টেস্ট খেলতে নেমে এত পরিপক্ব ব্যাটিংয়ের পরিচয় দেওয়া সচরাচর দেখা যায় না।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

ভারত ১ম ইনিংস: ৫০৩/৯ ডিক্লেয়ার (পাডিক্কাল ১১৭, জুড়েল ১১৫*; অসিত ৩/১০৬)।
শ্রীলঙ্কা ১ম ইনিংস: ২৯০ (দিনুশা ১০৩*, সুরিয়াবান্দারা ৮০; প্রসিদ্ধ ৩/৫২, সুথার ৩/৮৫) ও (ফলো-অন) ২য় ইনিংস- ৪২৯/৯ ডিক্লেয়ার (দিনুশা ১৩৩*, সুরিয়াবান্দারা ৯২; জাদেজা ৩/৯৪, সুথার ৩/১২১)।

ফলাফল:  ম্যাচ ড্র। সিরিজের ফল: ভারত ১-০ টেস্টে জয়ী। ম্যাচসেরা: সোনাল দিনুশা, সিরিজ সেরা: দেবদূত পাদিক্কাল। 

ফলোঅন করা দলের ২৪৩ ওভার ব্যাটিং

প্রথম ইনিংসের ৮৯.৪ ওভার এবং দ্বিতীয় ইনিংসের ১৫৪ ওভার মিলিয়ে শ্রীলঙ্কা এই ম্যাচে সর্বমোট ২৪৩.৪ ওভার ব্যাটিং করেছে। এর মাধ্যমে টেস্ট ক্রিকেটের ১৪৯ বছরের ইতিহাসে ফলোঅন করার পর সবচেয়ে বেশি ওভার খেলার সর্বকালের তালিকায় ৬ নম্বরে নিজেদের নাম লেখালো শ্রীলঙ্কা।

ফলোঅন করা দল প্রতিপক্ষ ও সাল ১ম ইনিংস (ওভার) ২য় ইনিংস (ওভার) দুই ইনিংসের মোট ওভার ফল
ইংল্যান্ড উইন্ডিজ (১৯৫৭) ১২৪.০ ২৫৮.০ ৩৮২.০ ড্র
পাকিস্তান উইন্ডিজ (১৯৫৮) ৪২.২ ৩১৯.০ ৩৬১.২ ড্র
ভারত নিউজিল্যান্ড (২০০৯) ১০৫.১ ১৮০.০ ২৮৫.১ ড্র
ভারত অস্ট্রেলিয়া (২০০১) ৫৮.২ ১৯৫.০ ২৫৩.২ ভারত জয়ী
নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ড (২০২৩) ৫৩.২ ১৬১.০ ২৪৪.২ নিউজিল্যান্ড জয়ী
শ্রীলঙ্কা ভারত (২০২৬, কলম্বো) ৮৯.৪ ১৫৪.০ ২৪৩.৪ ড্র
ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়া (১৮৯৪) ১২৬.১ ১১৬.৪ ২৪২.৫ ইংল্যান্ড জয়ী
দক্ষিণ আফ্রিকা ইংল্যান্ড (১৯৯৯) ৫৪.৫ ১৭৮.২ ২৩৩.১ ড্র
ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়া (১৯৮১) ৬৯.৩ ১৬২.৩ ২৩২.০ ইংল্যান্ড জয়ী
পাকিস্তান নিউজিল্যান্ড (২০০৯) ৭৩.১ ১৫৭.০ ২৩০.১ ড্র