তিন দশক পর স্বীকৃতি: প্যারিসে অনিয়মিত মানুষের অধিকার সংগ্রামের স্মৃতিফলক

প্যারিসের ঐতিহাসিক সাঁ-বের্নার গির্জা থেকে কাগজপত্রহীন মানুষদের উচ্ছেদের ঘটনার ৩০ বছর পূর্তিতে তাঁদের দীর্ঘ সংগ্রাম ও মানবিক মর্যাদাকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে উন্মোচিত হলো এক বিশেষ স্মারক ফলক। ফরাসি রাজধানী প্যারিসের ১৮তম অ্যারনডাইসমেন্টে নির্মিত এই স্মারক উন্মোচন অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে সংহতি প্রকাশ করতে উপস্থিত ছিলেন সলিডারিটি এশিয়া ফ্রান্সের সভাপতি নয়ন এনকে ও সহ-সভাপতি তৌহিদ আহমেদসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। এ ছাড়া প্যারিসের বিভিন্ন এলাকার মেয়র, ডেপুটি মেয়র এবং সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা এ স্মরণসভায় অংশ নেন।

প্যারিসের ১৮তম এলাকার মেয়র এরিক লেজুয়াঁদ্র সূচনা বক্তব্যে বলেন, “কাগজপত্রহীন মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে আমাদের অবস্থান অনড়। ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামে আমরা সর্বদা পাশে থাকব।”

অ্যাসোসিয়েশন ৭৫-এর সভাপতি আবুবাকার এবং স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁদের বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, প্রশাসনিক কাগজপত্রের অভাব কখনো কোনো মানুষের মানবিক মর্যাদা কেড়ে নিতে পারে না। ফরাসি সমাজে তাঁদের অবদান ও অধিকারের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখন সময়ের দাবি।

সমাপনী বক্তব্যে প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক আন্দোলনের বীরত্ব স্মরণ করে বলেন, অধিকার ও মর্যাদার দাবিতে রাজপথে নামা সেই মানুষদের লড়াই আজও সমভাবে প্রাসঙ্গিক।

১৯৯৬ সালের আগস্টে বৈধ কাগজপত্রের অভাব, জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তা ও আবাসন সংকটে পড়া দুই শতাধিক কাগজপত্রহীন মানুষ প্যারিসের ১৮তম এলাকার সাঁ-বের্নার গির্জায় আশ্রয় নেন। তৎকালীন গির্জার ধর্মযাজকের সহানুভূতি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক আন্দোলনে রূপ নেয়।

তবে ২৩ আগস্ট ১৯৯৬ তারিখে সরকারি নির্দেশে পুলিশ গির্জার দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং অবস্থানকারীদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ফ্রান্সে। পুলিশের এমন পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ হয়ে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন, যা পরবর্তীতে ফ্রান্সে কাগজপত্রহীন মানুষের অধিকার আদায়ের এক দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী আন্দোলনের জন্ম দেয়।

প্যারিসের ১৮তম এলাকায় উন্মোচিত এই স্মারকটি কেবল একটি প্রস্তরফলক নয়; এটি তিন দশক আগের এক ঐতিহাসিক সামাজিক বিপ্লবের প্রতীক। এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার, সংহতি ও মানবিকতার এক জীবন্ত নিদর্শন।

অনুষ্ঠানের ইতি টেনে বক্তারা বলেন, আইনি বৈধতা মানুষের দাপ্তরিক পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু তার মৌলিক মানবিক মর্যাদা নয়। কাগজপত্রহীন মানুষরাও ফরাসি সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাঁদের অধিকার রক্ষায় নাগরিক সমাজের এই সংহতি আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।