এফবিজেএর উদ্বেগ

ভিসা নীতিতে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম

বাংলাদেশের নতুন ভিসা নীতি ২০২৬-এ বিদেশি সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতাদের পেশাগত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে নতুন কিছু শর্ত আরোপের বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ফ্রান্স-বাংলাদেশ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (এফবিজেএ)। 

সংগঠনটির দাবি, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির পথে কোনো ধরনের অযাচিত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয়। মঙ্গলবার প্যারিস থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানায় এফবিজেএ। সংগঠনটির কমিউনিকেশন অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস সেলের পক্ষে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন নিয়াজ মাহমুদ ও মুমিন আনসারি।

সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন ভিসা নীতিতে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র বা তথ্যচিত্র নির্মাণের সময় বিদেশি সাংবাদিক ও নির্মাতাদের সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মনোনীত একজন প্রতিনিধির সার্বক্ষণিক উপস্থিতির বিধান রাখা হয়েছে। কাজ শেষে বাংলাদেশ ছাড়ার আগে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা প্রযোজনা দলকে মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র বা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) জমা দেওয়ার শর্তও রাখা হয়েছে। এফবিজেএ বলেছে, সাংবাদিকতার অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ, বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতার ভিত্তিতে সংবাদ বা তথ্যচিত্র তৈরি করা। কাজের পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারি প্রতিনিধি উপস্থিত থাকলে সাংবাদিক ও সংবাদসূত্রের মধ্যে স্বাভাবিক ও নির্ভার যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংগঠনটির মতে, কোনো সাক্ষাৎকারদাতা বা তথ্যদাতা যদি মনে করেন যে তার বক্তব্য দেওয়ার সময় সরকারি কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত রয়েছেন, তাহলে তিনি নিজের মতামত প্রকাশে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। এতে তথ্য সংগ্রহের স্বাভাবিক পরিবেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তেমনি সংবাদ বা তথ্যচিত্রের বৈচিত্র্য ও নিরপেক্ষতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এফবিজেএ আরও বলেছে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নয়। এর সঙ্গে জনগণের তথ্য জানার অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। বিদেশি সাংবাদিকরা যখন বাংলাদেশে কাজ করেন, তখন দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতা আন্তর্জাতিক দর্শক ও পাঠকের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। বিবৃতিতে জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছে সংগঠনটি। 

এফবিজেএর ভাষ্য, ওই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও নাগরিক অধিকারের ওপর থাকা বিভিন্ন বাধা ও নিয়ন্ত্রণের অবসান। সেই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্রে নতুন করে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করা উদ্বেগের বিষয়। সাংবাদিকদের পেশাগত নৈতিকতা ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতার বিষয়টিও বিবৃতিতে গুরুত্ব পেয়েছে। এফবিজেএ বলেছে, কোনো সাংবাদিককে এমন কোনো চুক্তি, অঙ্গীকারনামা বা নথিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে তার পেশাগত স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে সংবাদসূত্রের পরিচয় ও তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির অংশ।

সংগঠনটির মতে, বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের সংবাদ ও তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকারও সমানভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এফবিজেএ বলেছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তারা অস্বীকার করে না। তবে নিরাপত্তার নামে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয়, যা সাংবাদিকতার মৌলিক স্বাধীনতাকে অকার্যকর বা সীমিত করে ফেলে। বরং নিরাপত্তা ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা প্রয়োজন।

এ অবস্থায় নতুন ভিসা নীতি ২০২৬-এর আওতায় স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে অযাচিত বাধা সৃষ্টি করতে পারে এমন শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা এবং প্রয়োজন হলে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে এফবিজেএ। একই সঙ্গে বিদেশি ও স্থানীয় সাংবাদিকদের ভয়, চাপ কিংবা সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়াই পেশাগত দায়িত্ব পালনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে এফবিজেএ আরও বলেছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সম্পাদকীয় স্বায়ত্তশাসন এবং সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার রক্ষা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। স্বাধীন ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার সুযোগ যত বেশি নিশ্চিত হবে, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার পরিবেশও তত বেশি শক্তিশালী হবে।

বিবৃতির শেষাংশে বিশ্বের সাংবাদিক ও গণমাধ্যম সংগঠনগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এফবিজেএ বলেছে, সাংবাদিকদের ভয় বা অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়াই সত্য, জনস্বার্থ ও বাস্তবতার বিষয়গুলো তুলে ধরার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের ভিসা নীতিতেও সেই নীতির প্রতিফলন থাকা উচিত বলে মনে করে সংগঠনটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত