নেপালে কেন এই বিপর্যয়

তিব্বত থেকে সৃষ্টি হওয়া আকস্মিক বন্যায় নেপালের রাসুয়া ও ধাদিং জেলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। দুর্যোগের পরপরই ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) তাদের মূল্যায়ন সংশোধন করে জানায়, প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্প বলে ধারণা করা সিসমিক সংকেতটি আসলে হিমবাহ ধস ও ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট কম্পন ছিল। ইউএসজিএসের বিশ্লেষণে বলা হয় সিসমিক ঘটনাটি ছিল হিমবাহ ধস ও পাথর-কাদার প্রবাহ, যা ভাটির দিকের অঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এই প্রতিবেদন লেখার আগ পর্যন্ত আকস্মিক এই বন্যায় নেপালে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮৯ জনে। দেশি-বিদেশি পর্যটকসহ নিখোঁজ রয়েছেন আট শতাধিক মানুষ। নিখোঁজদের খোঁজে মরিয়া তল্লাশি চলছে। উদ্ধার অভিযানে নেপাল সেনাবাহিনী ও পুলিশের ৫ হাজারেরও বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নেপালকে জরুরি ত্রাণ হিসেবে ৫ লাখ ডলার সহায়তা ও বিশেষজ্ঞ দল পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নেপাল সরকার ভোতেকোশি নদীর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় এলাকাগুলোকে তিন মাসের জন্য দুর্যোগকবলিত অঞ্চল ঘোষণা করেছে। তিব্বতের উজানে একটি কৃত্রিম হ্রদ এখনো আটকে থাকায় সেখানে পুনরায় বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা করছে চীনা কর্র্তৃপক্ষ।

ইউএসজিএস ভূ-কম্পনজনিত ওই ঘটনার মাত্রাও আগে উল্লেখিত ৪ দশমিক ৪ থেকে বাড়িয়ে ৫ দশমিক নেপালে কেন এই বিপর্যয় ২ করেছে। প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হিমবাহের নিচের একটি বড় অংশ ভেঙে কয়েকশ মিটার নিচে উপত্যকার মাটিতে আছড়ে পড়ার মধ্য দিয়ে প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার শুরু হয়ে থাকতে পারে। কানাডার ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড্যানিয়েল শুগার জানান, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় প্রায় ০ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার বরফের একটি অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় পড়ে। ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্বের বিশেষজ্ঞ বিক্রম গুপ্ত বলেন, হিমবাহের সামনের অংশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভেঙে পড়েছিল এটি নিশ্চিত। এর সঙ্গে সম্ভবত বিপুল পরিমাণ পাথর ও কাদা যুক্ত হয়েছিল বা ধসের সঙ্গে সেগুলোও নেমে এসেছিল। কাঠমা-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের (আইসিআইএমওডি) জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিংগং ঝাং জানান, নেপালের দিকে লেন্দে নদীতে একটি বরফ-পাথরের ধস নদী বন্ধ করে দেয়। এর ফলে উজানে পানি জমতে থাকে এবং বাঁধটি ভেঙে গেলে ভাটিতে প্রবল বন্যার সৃষ্টি হয়।

গত বুধবার নেপালের অভ্যন্তরীণ এলাকা এবং তিব্বতের রাজধানী লাসা ও কাঠমান্ডুকে সংযোগকারী গিরিপথে এই দুর্যোগ আঘাত হানে। এই দুর্যোগে মধ্যাঞ্চলীয় বাগমাতি প্রদেশের রাসুয়া ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলা ল-ভ- হয়ে গেছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ও যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, বিশাল কাদার তোড় মুহূর্তের মধ্যে তিব্বত-নেপাল সীমান্ত ক্রসিং ধ্বংস করে শত শত মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বহুতল ভবন, ধাতব ব্রিজ, সড়ক ও বিদ্যুৎকেন্দ্র খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে। দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে আসার সঙ্গে আগামী কয়েক দিনে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা হেলিকপ্টারে করে বন্যাকবলিত দুর্গম অঞ্চলে খাদ্য, তাবু ও জরুরি ওষুধ পৌঁছে দিচ্ছেন। নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজারাম বাসনেত বিবিসিকে জানিয়েছেন, রসুয়া ও নুওয়াকোট জেলাসহ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সেনাসদস্যদের অধিক সংখ্যায় নিয়োজিত করা হয়েছে।

উদ্ধারকারী দলগুলোর দেওয়া তথ্যের বরাতে নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত আট জেলা থেকে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে চিতওয়ানে সর্বাধিক ১৩২টি, পূর্ব নাওয়ালপরাসিতে ৮২টি, ধাদিংয়ে ৩৩টি, গোর্খায় ৩০টি, রাসুয়ায় ১৭টি, পশ্চিম নাওয়ালপরাসিতে ১৫টি, নুয়াকোটে ২৮টি এবং তানাহুন জেলা থেকে ২২টি লাশ পাওয়া গেছে। নেপালের ‘ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’র তথ্য অনুযায়ী স্থানীয় অধিবাসী, উদ্ধারকাজে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং দেশি-বিদেশি পর্যটক মিলিয়ে অন্তত ৮২৬ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ৬৪৪ জনই পর্যটক, যাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক এবং ১২৭ জন নেপালি ভ্রমণকারী রয়েছেন। নিখোঁজ নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৪ জন, নেপাল পুলিশের ২৮ জন এবং সশস্ত্র পুলিশ বলের (এপিএফ) ১৩ জন সদস্য রয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৫৫৮ জন; তাদের মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।

বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোকে আগামী ৩ মাসের জন্য ‘দুর্যোগকবলিত অঞ্চল’ ঘোষণা করা হয়েছে। নেপালি সংবাদমাধ্যম হিমালয়ান টাইমস জানিয়েছে, এ ঘোষণার মাধ্যমে দুর্গতদের উদ্ধার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার রাজধানী কাঠমান্ডুর সিংহ দরবারে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে বন্যায় নিহতদের প্রতি শোক ও তাদের পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানানো হয়। নেপাল সরকারের মুখপাত্র এবং শিক্ষা ও ক্রীড়ামন্ত্রী সস্মিত পোখরেল জানান, আহতদের বিনা খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আহতদের ও ক্ষতিগ্রস্ত অবিলম্বে উদ্ধার করার এবং ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার অভিযানের জন্য মন্ত্রণালয়টিকে নেপালের সেনাবাহিনী, বেসরকারি হেলিকপ্টার ও অন্যান্য সম্পদ কাজে লাগানোরও কর্র্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় দুর্যোগ কমিটিগুলোকে বন্যাদুর্গতদের জন্য খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নেপালের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বন্যায় নিহতদের পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেবে সরকার। অর্থমন্ত্রীকে ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি ও ভৌত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য আর্থিক বরাদ্দ সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষতি : নেপালের বিদ্যুৎ কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে তাদের প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির শক্তি, পানিসম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে, ত্রিশূলী ও ভোটেকোশী নদী অববাহিকায় চালু থাকা ও নির্মাণাধীন ডজন খানেক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মারাত্মক ক্ষতি করেছে এই দুর্যোগ।

নদীর তীরে এবং বন্যাকবলিত এলাকায় অবস্থিত প্রকল্পগুলোর বাঁধ, হেডওয়ার্কস, পাওয়ার হাউস, সংযোগ সড়ক, ট্রান্সমিশন কাঠামো, নির্মাণসামগ্রী ও অন্য ভৌত অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাসুয়ায় ২৩৬ মেগাওয়াট যৌথ ক্ষমতার পাঁচটি চালু থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ৩৪২ দশমিক ৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি নির্মাণাধীন প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নুয়াকোটে ১২৩ মেগাওয়াট যৌথ ক্ষমতার চারটি চালু থাকা প্রকল্প ও ৫২ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি নির্মাণাধীন প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ৫ লাখ ডলার অর্থ সহায়তা : নেপালে বন্যা-ভূমিধসে প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করে জরুরি অর্থ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালের বন্যাদুর্গত সম্প্রদায়ের জরুরি আশ্রয়, বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রাথমিক ত্রাণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৫ লাখ ডলার অর্থ সহায়তা পাঠাবে। এই দুর্যোগে নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪ জন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রয়েছেন; যাদের বড় একটি অংশই সেখানে পর্যটক হিসেবে গিয়েছিলেন।