পুলিশের বক্তব্যে গরমিল থাকছেই

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০৫ এএম

রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার তদন্ত নিয়ে পুলিশের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। মরদেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্থানীয় দুই যুবককে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ দাবি করেছিল ওই শিক্ষক পরিবারকে গত ২০ আগস্ট রাতে হত্যা করা হয়। তবে গতকাল রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, হত্যাকাণ্ড হয়েছে গত শুক্রবার ভোরের দিকে। এ ছাড়া মরদেহের ময়নাতদন্তে জড়িত ডোম ও চিকিৎসকের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নিয়েও তৈরি হয়েছে ধূম্রজাল। বাড়ির বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন করা, গত বুধবার রাতে হঠাৎ করে বাড়ির ছাদে ট্যাংকির পানি উপচেপড়ার ঘটনা নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে চলছে বিভিন্ন আলোচনা।

পুলিশের দাবি, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের দৃশ্য দেখে ফেলায় এবং ধমক দিয়ে চিৎকার করায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়–য়া ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন একই এলাকার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। এ ঘটনায় ফরেনসিক পরীক্ষায় মা ও মেয়েকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হলেও রংপুর সিআইডির কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের জানান, গত বুধবার পর্যন্ত মরদেহের নমুনা ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়নি। সব মিলিয়ে ফরেনসিক চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যের গরমিল নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

মামলার তদন্তের সবশেষ অবস্থা নিয়ে গতকাল সকালে রংপুর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেন মহানগর পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদ। গ্রেপ্তার হওয়া সিদ্ধার্থের জবানবন্দির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আটটি ইয়াবা সেবন করেন। এটি তাদের জীবনে একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি ইয়াবা সেবনের ঘটনা। দিনের আলো ফোটার পর সকালে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাদের দেখে ফেলেন। এ সময় তিনি ধমক দিলে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতির গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন।

এ সময় গণপতির স্ত্রী ও মেয়ে শব্দ পেয়ে ছাদে এলে মুগ্ধ গণপতির গলায় থাকা গামছা দিয়ে তার স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন। আর সিদ্ধার্থ এক হাতে মেয়ের গলা এবং অন্য হাতে তার মুখ চেপে ধরেন। পরে দুজন মিলে গামছা দিয়ে মেয়ের গলায় পেঁচিয়ে ধরেন। তাতেও তার মৃত্যু না হলে কবুতরের খাবার রাখার বাক্সের পাশ থেকে রশি এনে গলায় পেঁচিয়ে দুদিক থেকে টান দিয়ে হত্যা করেন।

বাড়ির বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ে পুলিশ কমিশনার দাবি করেন, ছাদে পাওয়া একটি পুরনো প্লায়ার্স নিয়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নিচতলায় যান এবং বিদ্যুতের তার কেটে দেন। বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলে সেটি যাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সে জন্যই বিদ্যুতের তার কেটে দেওয়া হয়। এরপর দুই তরুণ গণপতি চক্রবর্তীর কক্ষে ঢোকার পর তার ছেলে আয়ুশ ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে ফেলে। শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলায় তাকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।

পরপর চারজনকে হত্যার পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এ জন্য তারা দুজনে গোসল করেন। পরে আরেকটি ইয়াবা সেবন করেন। এ সময় তারা খেজুর ও শসা খান। পরে হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর ও এলোমেলো করেন। তারা স্বর্ণের গহনা ও ১৫ হাজার টাকা লুটও করেন। পরে সুযোগ বুঝে দুপুরের দিকে ছাদ টপকে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।

পুলিশ কমিশনার প্লায়ার্স দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার দাবি করলেও স্থানীয়দের কাছ থেকে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনার রাতে পুরো বাসাটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। মরদেহ উদ্ধারের দিন গত শনিবার রাতে খবর পেয়ে পুলিশ বাসাটিতে গেলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন দেখতে পায়। রাত ১টার দিকে স্থানীয় উজ্জ্বল কুমার বর্মন নামে এক ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকে সংযোগটি সচল করা হয়।

ইলেকট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার বর্মন বলেন, ‘গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে সংযোগ দেওয়া হয়েছে, সেখানে উঠে আমি দেখেছি সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। লাইনটা পুরোপুরি খোলা ছিল। অর্থাৎ নিউট্রাল ফেজের তার খুলে ফেলা। বাসাবাড়ির লাইন লুজ হলে লাগা থাকে। স্পার্ক করে ঝুলে থাকে। কিন্তু ‘এভাবে খুলে পড়ে থাকতে দেখিনি। কেউ খুলে রেখেছে বলেই আমার মনে হয়েছে।’

মহানগর পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদ গতকাল সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, ‘গণপতি চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ সমাজের মানুষ ছিলেন। আর মাছুয়াপাড়ায় অধিকাংশই দাস সম্প্রদায়ের মানুষ। প্রতিবেশী সিদ্ধার্থরাও দাস ছিলেন। ব্রাহ্মণ সমাজের হওয়ায় গণপতি আশপাশের দাস সম্প্রদায়ের সঙ্গে খুব একটা মিশতেন না। এ ছাড়া তিনি বেশি টাকা দিয়ে সিদ্ধার্থ দাস পরিবারের পূর্বসূরিদের কাছ থেকে জমি কেনেন। গণপতি চক্রবর্তী জমির পুরো টাকা পরিশোধ করলেও সেই টাকার ভাগ শরিক হিসাবে সিদ্ধার্থরা কম পেয়েছেন বলে জানা গেছে। হত্যার পেছনে এটিও কোনো কারণ কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস প্রীতিলতা ও আগামী চক্রবর্তীকে হত্যার জন্য গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরার সময়ে তারা চিৎকার করেছিলেন। এই চিৎকার প্রতিবেশী শুনলেও বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ খোলেননি। একজন ভদ্র মহিলা চিৎকার শোনার কথা বললেও পরে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ে এ বিষয়ে আর কোনো তথ্য দেননি।’

একই জায়গায় গত রবিবার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার গ্রেপ্তার দুই তরুণের বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলেছিলেন গণপতি চক্রবর্তীকে ভোরে বাসার ছাদে, তার স্ত্রী ও মেয়েকে তিনতলার সিঁড়িতে এবং ১২ বছর বয়সী শিশুটিকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে। তবে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘আমরা এর আগে বলেছিলাম বাচ্চাটা ঘুমিয়ে ছিল, তারা ঘুমন্ত বাচ্চার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এটা তাদের থেকে যেটুকু আমরা বক্তব্য পেয়েছিলাম, তখন আমরা সেটুকু বলেছিলাম। কোর্টে গিয়ে তারা বলেছে বিজ্ঞ আদালতে তারা স্বীকারোক্তি দিয়েছে, বাচ্চাটা ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখতে পায়।’

লিখিত বক্তব্য পাঠের পর পুলিশ কমিশনারকে সাংবাদিকরা একাধিক প্রশ্ন করলেও তিনি মাত্র দুটির উত্তর দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। এ সময় ক্ষুব্ধ এক সংবাদকর্মী উচ্চস্বরে বলেন, ‘যদি প্রশ্নের জবাব দিতে না পারেন, তাহলে অফিসে নিজের বক্তব্য ভিডিও করেই পাঠাতে পারতেন।’

এদিকে ময়নাতদন্তে যুক্ত ব্যক্তিদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নিয়েও ধোঁয়াশা কাটছে না। শিক্ষক গণপতির স্ত্রী ও মেয়ের দেহে ধর্ষণের আলামত পাওয়ার তথ্য দিয়ে আলোড়ন তৈরি করেন ময়নাতদন্তে যুক্ত ডোম। তবে পরে বিষয়টি অস্বীকার করেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘লাশগুলো যখন মর্গে আনা হয়েছিল, তার অন্তত দুদিন আগে তাদের মৃত্যু হয়েছে। লাশগুলোতে পচন ধরেছিল। পোকাও হয়ে গিয়েছিল। ফলে ডোমের কাছে যেটা বীর্য মনে হয়েছিল, আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি, আসলে সেটি বীর্য ছিল না। ফলে সেখানে ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

তিনি বলেন, ‘চারটি মরদেহেরই ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে শ্বাসরোধ করে তাদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। ধস্তাধস্তির কারণে বিভিন্ন জায়গায় হয়তো একটু আঘাত-টাঘাত আছে। তা ছাড়া অন্য কিছু নেই।’

মুখ কালো ও বীভৎস দেখানোর কারণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘ডেড বডি যখন পচে ওঠে, তখন এক্সপোজড এরিয়াগুলো, যেগুলো পোশাকের বাইরে থাকে, ওগুলো অনেক সময় একটু কালো দেখায়। ওটা কোনো ধরনের কেমিকেল বার্ন বা এ রকম কোনো কিছু ছিল না। এটা ডিকম্পোজিশন প্রসেসে, মানে ব্লাড যখন পচে যেতে থাকে, তখন কালারগুলো আস্তে আস্তে এ রকম হয়ে যায়। এটি জাস্ট পচনের একটি প্রসেস।’

ফরেনসিক রিপোর্টের আগেই চিকিৎসক এবং পুলিশের পক্ষ থেকে ধর্ষণের আশঙ্কাকে সরাসরি নাকচ করার বিষয়টি নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে পুলিশ ও অভিযুক্তের গায়ে একই ধরনের শার্ট বিতর্ক। এই বিতর্কে নতুন করে ঘি ঢেলেছেন প্রধান আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস। তিনি দাবি করেন, রবিবার রাতে পুলিশ তার ছেলেকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তার গায়ে ছিল একটি সাধারণ গেঞ্জি। তবে পর দিন পুলিশ হেফাজতে দামি শার্ট পরা দেখা গেছে। তার ছেলে কোনো দিন এমন শার্ট পরেনি। আবার ওই একই ডিজাইনের শার্ট ছিল মরদেহ উদ্ধার অভিযানে যাওয়া রংপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তীর গায়ে। সনাতন চক্রবর্তী পরে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, আড়ং থেকে কেনা একই ডিজাইনের শার্ট রংপুরের অন্তত ২০০ মানুষ পরছেন।

এদিকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি পানি দিয়ে ধুয়ে আলামত নষ্টের অভিযোগ করেছে আসামিদের পরিবার। সিদ্ধার্থের ভাই পার্থ দাস সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির লাইট বন্ধ করে আলামত নষ্ট করা হচ্ছে। এ জন্য পানি ঢেলে বাড়ি ধুয়ে ফেলা হয়েছে।

তবে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ঘটনাস্থলে দায়িত্বে থাকা পুলিশের এসআই আব্দুল হাকিম বলেন, ‘ভুল করে বাড়ির মোটরের সুইচ অন হয়ে গিয়েছিল। এতে ট্যাংকের পানি ভর্তি হয়ে উপচে ছাদে পড়ে ছিল। পরে মোটর বন্ধ করে দেওয়া হয়। আলামত নষ্ট করার অভিযোগ সঠিক নয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত