মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্পের পথেই সরকার

জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পথে হাঁটছে সরকার। এর মধ্যে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া দুই মেগা প্রকল্পও রয়েছে। মাতারবাড়ি ও পায়রাতে হবে দুটি কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। একই সঙ্গে ভোলায় নির্মাণ করা হবে দুটি গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে শেখ হাসিনা সরকারের বিদ্যুৎ নীতির কঠোর সমালোচনা চলছে। তবে এর মধ্যেই নতুন কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। পিডিবি ও বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র বলছে, এরই মধ্যে সরকার বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হতে পিডিবিকে নির্দেশ দিয়েছে।

মার্চ থেকে বিদ্যুৎ খাতে নাজেহাল অবস্থার জন্য সাবেক সরকারকে দায়ী করছে বর্তমান সরকার। বলা হচ্ছে, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ক্ষমতা বেশি হওয়ায় ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে চাপ বাড়ছে। আর এজন্যই বিদ্যুৎ খাতে সংকট তীব্র হয়েছে। অথচ এবার বর্তমান সরকারই নতুন একই ধরনের কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছে। সাবেক সরকারের রেখে যাওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে তারা।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে জানান, সরকার মাতারবাড়িতে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে চায়। আগামী বছরের প্রথম দিকেই এই কাজ শুরু হবে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগের খবর সঠিক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাতারবাড়িতে একটি কেন্দ্রের কথা বলছেন, কিন্তু সরকার এরই মধ্যে মাতারবাড়ির সঙ্গে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেরও উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে ভোলায় আরও দুটি কেন্দ্র নির্মাণের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পিডিবি একটি কেন্দ্রের দরপত্র আহ্বান করেছে।

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গত ৬ জুলাই বিদ্যুৎ বিভাগের এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, অথচ সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। তিনি মনে করেন, সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ধরলেও ২০ শতাংশ রিজার্ভসহ এত ওভার ক্যাপাসিটির কোনো প্রয়োজন ছিল না। তার ভাষায়, অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে রাষ্ট্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভর্তুকির চাপ নিতে হচ্ছে। এর আগে গত ১২ জুন বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টার (এনএলডিসি) পরিদর্শনের সময় বলেন, ‘ক্যাপাসিটি চার্জের নামে আগের সরকারের সময় সম্পাদিত চুক্তিগুলোর কারণে রাষ্ট্রকে বড় ধরনের আর্থিক বোঝা বহন করতে হচ্ছে।’

বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, নতুন কেন্দ্র ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়া কি নির্মাণ করা সম্ভব? আর ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়েই যদি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়, তাহলে সেটি নিয়ে সমালোচনা কেন হচ্ছে!

মাতারবাড়ি এবং পায়রাতে হবে নতুন কেন্দ্র : মাতারবাড়িতে দুটি কেন্দ্র নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রথমটি নির্মাণ করার সময় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বিশ্বব্যাপী নেতিবাচক প্রচারণার মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে সময় নেয় তখনকার সরকার। প্রথম ইউনিট নির্মাণের সময় দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং জমি উন্নয়নের কাজ করে রাখা হয়। জাপানের ঋণ সহায়তায় কেন্দ্রটি নির্মাণ করে রাষ্ট্রীয় কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি। মাতারবাড়িতে তাদের একটি ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লাচালিত কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া চীনের এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি বিসিপিসিএল পায়রাতে একটি ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে। এই কেন্দ্রটিরও একটি দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের কথা ছিল। একই উৎপাদন ক্ষমতার কেন্দ্রটির জন্য দরপত্র চূড়ান্ত করার পাশাপাশি ঋণের সংস্থান করা হয়েছিল। একই সঙ্গে পায়রা থেকে ঢাকা পর্যন্ত ৪০০ কেভির দ্বিতীয় সঞ্চালন লাইন নির্মাণ এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত ছিল। মাতারবাড়ির মতোই কেন্দ্রটির জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং উন্নয়নের কাজও করে রাখা হয়েছে। ফলে এই দুই জায়গাতে হবে ২ হাজার ৫২০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র।

কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে জানান, তারা দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছেন। তবে একেবারে প্রথম দিকেই কাজ শুরু নাও হতে পারে। নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (এনডব্লিউপিজিসিএল) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদেরকেও পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট এবং সঞ্চালন লাইন নির্মাণের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

ভোলায় হবে দুই কেন্দ্র : ভোলার গ্যাস গ্রিডে আনার নানা আলোচনার মধ্যে সরকার পিডিবিকে সেখানে ২২৫ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিতে বলেছে। এরই মধ্যে পিডিবি ২২৫ মেগাওয়াটের প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠিয়েছে। তবে এর মধ্যে ভোলায় একটি ১০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র নির্মাণের জন্য পিডিবি দরপত্র আহ্বান করেছে। আগামী অক্টোবরে কেন্দ্রটি নির্মাণের দরপত্র জমা দেওয়ার সময় শেষ হচ্ছে। কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হবে বেসরকারি উদ্যোগে। পিডিবির উদ্যোগে নির্মাণ করতে চাওয়া ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র উৎপাদনে আসার আগ পর্যন্ত ৩ বছর কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।

ভোলায় পিডিবির যে ২২৫ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি রয়েছে, সেটি ১৯৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। পিডিবির তথ্য বলছে, কেন্দ্রটি ২০২২-২৩ অর্থবছরে সক্ষমতার (প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর) ৬১ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। পিডিবি তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলছে ওই বছর কেন্দ্রটি ১ হাজার ৪০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-আওয়ার (ইউনিট) বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এরপর ২০২৩-২৪ এ কেন্দ্রটি ৫০ ভাগ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর উৎপাদন করে ৮৫৭ মিলিয়ন ইউনিট এবং ২০২৪-২৫ এ উৎপাদন করে ৫২ ভাগ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরে ৮৮৮ মিলিয়ন ইউনিট। অর্থাৎ যে কেন্দ্র রয়েছে, তার উৎপাদন না বাড়িয়ে ১০০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. জেরাউল করিম বলেন, ‘কয়লাচালিত কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগের খবরটি সঠিক। এখন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানির মতো দেশগুলো নতুন করে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। আমরাও বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়লা কেন্দ্রগুলো নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি।’ ভোলার কেন্দ্র নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি বিভাগ থেকে ভোলায় কিছু অব্যবহৃত গ্যাস রয়েছে। এই গ্যাস নাকি কূপের মধ্যে থাকলে এমনিতে নষ্ট হয়ে যায়, যার পরিমাণ প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট হতে পারে। এজন্য একটি ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। কেন্দ্রটি চলবে ৩ বছর। এর মধ্যে আমাদের ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র উৎপাদনে এলে কেন্দ্রটি বন্ধ করা হবে।’

বিষয়গুলো নিয়ে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যা ১৭ বছরে করেছিল, এখন কেউ যদি তা এক বছরে করতে চায়, তাহলে তো এমন হতেই পারে। আমাদের নদী, খাল-বিল, বিশেষ করে পললসমৃদ্ধ কৃষির জন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উপযুক্ত নয়। বিষয়টি আগের সরকার যেমন বোঝেনি, এরাও বুঝতে পারছে না। এজন্যই কয়লাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে।’

তিনি বলেন, ‘যে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের সমালোচনা তারা করছে, এই কেন্দ্র নির্মাণ করলে কি ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হবে না? অবশ্যই দিতে হবে।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘একই সঙ্গে কয়লা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যারা বিনিয়োগ করেন, তারা কয়লার এই উদ্যোগের কথা শুনলেই আর বিনিয়োগ করবে না। ফলে ওইসব প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। দেশের অভ্যন্তরের গ্যাস এবং এলএনজি দিয়ে সমস্যা সমাধান করে দীর্ঘমেয়াদে কয়লার বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে।’