তেরো বছর আগের সেই চেনা ছায়া, ডাগআউটে পরিচিত পন্থায় পায়চারি আর সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর গ্যালারিতে কান ফাটানো দুয়োধ্বনি, সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল সময়টা যেন ২০১০-এর কোঠায় আটকে আছে, যখন প্রথমবার রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে এসেছিলেন হোসে মরিনহো। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা আর বর্তমানের বাস্তবতা মনে করিয়ে দিল, মরিনহোর এই প্রত্যাবর্তন নেহাত কোনো নস্টালজিয়া নয়, বরং স্প্যানিশ ফুটবলে এক নতুন ঝড় ওঠার পূর্বাভাস। প্রথমার্ধের চরম স্থবিরতা আর দর্শকদের ক্ষোভ যখন গ্রাস করতে বসেছিল রিয়ালকে, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফরাসি এই তারকাই যেন এক জাদুকরী হ্যাটট্রিকে বদলে দিলেন পুরো চিত্রনাট্য। রিয়াল সোসিয়েদাদকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে লস ব্লাঙ্কোসরা বুঝিয়ে দিল, বার্নাব্যুতে স্পেশাল ওয়ানের ফেরা মানেই নতুন কোনো আখ্যানেরই সূচনা।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে সোসিয়েদাদ। প্রথমার্ধের ছন্দহীন খেলায় গ্যালারির ক্ষোভের মুখে পড়ে রিয়াল শিবির। তবে ৪০ মিনিটে ফেদে ভালভার্দের চোখ জুড়ানো পাস থেকে ডি-বক্সে ঢুকে বাঁ পায়ের জোরালো শটে গোল করে খরা কাটান এমবাপ্পে। যদিও এর ঠিক চার মিনিট পরেই লুকা সুচিচের গোলে সমতা ফেরায় সোসিয়েদাদ।
বিরতিতে ১-১ সমতার পর মার্ক কুকুরেয়াকে মাঠে নামান মরিনহো, যা পুরো ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেয়। ৬০ মিনিটে জুড বেলিংহামের সঙ্গে দারুণ এক ওয়ান-টু খেলে এমবাপ্পে দলকে আবারও এগিয়ে দেন। এরপর ৬৮ মিনিটে বেলিংহামের পাস থেকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ব্যবধান বাড়িয়ে ৩-১ করেন। ৮০ মিনিটে ভিনির অবিশ্বাস্য এক পাস থেকে চমৎকার চিপ শটে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন ফরাসি তারকা এমবাপ্পে। এই জয়ে লা লিগায় নিজের ৫০তম হোম ম্যাচ জয়ের মাইলফলকও ছুঁয়ে ফেললেন মরিনহো।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে সমর্থকদের দুয়ো ও দলের ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে মরিনহো বলেন, ‘বিক্ষোভ ও করতালির মধ্যে সবসময়ই ন্যায়ের একটা অনুভূতি থাকে এবং মাঝেমধ্যে এই দুয়ো শোনাটা কারও জন্যই ক্ষতিকর নয়। এটি আপনাকে আরও পরিণত হতে সাহায্য করে।’ বার্নাব্যুর সমর্থকদের মানসিকতা তুলে ধরে তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা সবাই সান্তিয়াগো বার্নাব্যুকে জানি এবং এখানকার সমর্থকরা কতটা কড়া তাও জানি। চাপের মুখে আমার খেলোয়াড়রা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং দারুণ এক দ্বিতীয়ার্ধ উপহার দিয়েছে, তাতে আমি অত্যন্ত খুশি।’
এমবাপ্পের ফর্ম ও দলীয় পারফরম্যান্স নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে পর্তুগিজ এই কোচ সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, ‘এই ছেলেটি অবিশ্বাস্য। আমি তাকে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইতিহাস গড়তে এক প্রকার ক্ষুধার্ত দেখতে পাচ্ছি এবং এটি এমন একটি দল, যেখানে কিলিয়ান কিলিয়ানের মতোই অসাধারণ হওয়া সত্ত্বেও দল হিসেবে তাদের প্রশংসা না করে পারা যায় না।’ এমবাপ্পের এ মৌসুমের সম্ভাব্য গোলসংখ্যা কত হতে পারে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মরিনহো রসাত্মক ও বাস্তবসম্মত সুরে সরাসরি বলেন, ‘সেটা ৬০, ৪০ কিংবা ৫০ হতে পারে, আমি বলতে পারি না। আমি ট্রফিসহ ৪০টি গোল কিংবা অনেক পরিশ্রমের বিনিময়ে ৪০টি গোলই বেশি পছন্দ করব... আজ আমি তাকে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে রেখেছিলাম, কারণ আমার মনে হয়েছিল সে চারটা গোল করে ফেলতে পারে!’
মরিনহোর বার্নাব্যুতে এই ফেরা এবং এমবাপ্পের দাপট নিশ্চিতভাবেই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। প্রথমার্ধের হতাশা ঝেড়ে ফেলে লস ব্লাঙ্কোসরা যেভাবে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করল, তাতে চলতি মৌসুমে রিয়াল যে প্রতিপক্ষকে এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি দেবে না, তা বলাই বাহুল্য।