‘বাঙালি’ পরিচয়ে প্রত্যাবাসনে বাধা!

মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বারবার পরিচয় সংকট সৃষ্টি করার পরও কেন বাংলাদেশকেই রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের মূল ভুক্তভোগী হতে হয় এটি জরুরি এবং জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৮ সালে প্রথমবার এই সংকটের পর নব্বইয়ের দশকে দ্বিতীয়বার শুরু হয়ে সেই সময়কার শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন, এর পরবর্তী অনানুষ্ঠানিকভাবে আবারও তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিপুল সংখ্যায় বাংলাদেশে ঢুকে পড়া, এসব এখন ইতিহাসের অংশ। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া এবং ২০১২ সাল থেকে আবারও আরাকানে নতুন করে সংকটে এবং এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ‘আরসা’ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কর্র্তৃক রাখাইনের উত্তরাঞ্চলের পুলিশ ফাঁড়ি এবং সেনা ব্যাটালিয়নে সশস্ত্র হামলায় উল্লেখযোগ্য হতাহত এবং ক্ষয়ক্ষতি সাধনের পর সেনাবাহিনী কর্র্তৃক নির্বিচারে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর হামলায় প্রাণ বাঁচাতে নিজ দেশের বিভিন্ন এলাকাসহ বাংলাদেশে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার (জাতিসংঘ, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ) ভিত্তিতে তাদের সে সময় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দিয়ে কক্সবাজার এবং টেকনাফের ৩২টি শরণার্থী শিবিরে স্থানান্তরিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েক হাজার শরণার্থীকে বাংলাদেশ সরকারের অর্থব্যয়ে এবং নৌবাহিনীর সহায়তায় স্থান্তরিত করা হয় নোয়াখালীর ভাসানচরে। 

এই  বিষয়গুলোর অবতারণা এ কারণেই যে, বছরের পর বছর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে থাকা এই রোহিঙ্গা সংকটের ছায়া এখন অনেক প্রলম্বিত। আমাদের কতটুকু সক্ষমতা রয়েছে এই সংকট বয়ে বেড়াবার! একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ ধারণ করতে হয়েছে অন্যদিকে সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের জন্য সত্যিকার অর্থে কী ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে, এগুলো এখন কঠিন বিষয় । একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট-উদ্ভূত বিষয়গুলো নিয়ে যখন প্রতিবেশী দেশ মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়, এর বিপরীতে কৃতজ্ঞতার ভাষার পরিবর্তে দায় অস্বীকার করে উল্টো এই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করে ‘বাঙালি’ তকমা দেওয়াকে কেবল অকৃতজ্ঞতা হিসেবেই নয়, বরং বলা যায় এই সংকট পুরোটাই বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার এক জঘন্য অপপ্রয়াস।

রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের সূচনা থেকেই চীন এই বিষয়ে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে আশ্রিত এই বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গা ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বরের মধ্যে নিজ দেশে ফেরত যাবে বলে মিয়ানমারের সম্মতি থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত তিনটি চুক্তির আলোকে বাংলাদেশ থেকে ৮ লাখের অধিক রোহিঙ্গার তালিকা দেওয়া হলেও মিয়ানমার অর্ধেক যাচাই-বাছাই করার পর ৩ লাখের কিছু বেশি রোহিঙ্গাকে নিজেদের দেশের বলে স্বীকৃতি দিয়ে প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দেয়। এর বাইরে তাদের নতুন যুক্তি হচ্ছে তাদের বুথিডং, মংডু এবং রাথিডং টাউনশিপে ৭ লাখ ৪০ হাজার বাঙালি অবৈধভাবে বসবাস করত, যার মধ্যে ৫ লাখ ৪০ হাজার ২০১৭ সালের সংঘাতের পর বাংলাদেশে ফিরে যায়। তাদের অবস্থান থেকে তারা বাংলাদেশে শরণার্থীর স্বীকৃতি পাওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যার বিষয়টি স্পষ্টভাবে না বললেও যা বুঝাতে চাচ্ছে তা হচ্ছে ৩ লাখের কিছু বেশি রোহিঙ্গা (যাদের আবার রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী হিসেবে তারা স্বীকৃতি দিতে চায় না) ছাড়া বাদবাকিদের বিষয়ে তাদের কিছু করণীয় নেই!

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের চেষ্টাকে মিয়ানমার নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করছে। এমন অবস্থান থেকেই সম্প্রতি তারা রোহিঙ্গাদের বাঙালি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং তাদের হিসাবে আশ্রিতদের রাখাইন বলে চিহ্নিত করেছে! যেহেতু তাদের দাবি অনুযায়ী ৩টি টাউনশিপে অবস্থানকারী বাঙালিদের ৫ লাখের অধিক বাংলাদেশে ফেরত গিয়েছে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ কর্র্তৃক দাবিকৃত সংখ্যাটিকে তারা বিবেচনায় নিতে চাচ্ছে না। অবস্থাদৃষ্টে বুঝা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানের বিপরীতে তারা নিজেদের এই অবস্থানকে তুলে ধরে কেবল নিজেদের পক্ষেই জনমত গড়ার চেষ্টা করছে না, গোটা বিষয় নিয়ে একটা দায়িত্বহীনতাকেও প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। সংকটের ৯ বছর পর মিয়ানমার সরকারের তরফে বিবৃতিতে ৩ লাখের কিছু বেশি রোহিঙ্গাকে পরিস্থিতি অনুকূল হলে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হবে বলার মধ্য দিয়ে গোটা বিষয়টি  নতুন করে  এই  শরণার্থী সংকটকে আরও প্রকট করা হলো। মিয়ানমারের তরফে  ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিকে আপত্তি জানিয়ে আরও বলা হয়েছে, এ নামে তাদের কোনো জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই, তারা কেবল রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুতদের ফিরিয়ে নেবে। এমন বক্তব্য কেবল শরণার্থী সংকটকেই ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা নয়, একটি জাতির পরিচয়কে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে সঘোষিতভাবে জাতিগত নিধন প্রক্রিয়ায় নিজেদের সংশ্লিষ্টতাকেও তারা প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিল।

অতীতেও বিভিন্ন সময়ে প্রত্যাবাসন নিয়ে এবং রাখাইন রাজ্যের অস্থিতিশীলতা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের তরফে এদেশে অবস্থানরত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে প্রতিবাদ জানানো হয়। সাম্প্রতিক অবস্থান নিয়েও বাংলাদেশ সরকারের তরফে  প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করার প্রয়োজন রয়েছে, কেবল কূটনৈতিকভাবে প্রতিবাদ জানানো কিংবা কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা দাবি করাই সংকটের সমাধান নয়। বরং এই সংকটকে ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিকীকরণের প্রয়োজন রয়েছে। মিয়ানমারের নতুন  বিবৃতিতে কার্যত বাংলাদেশকেই দোষারোপ করা হলো। ‘অন্য দেশের ক্যাম্পে থাকা ব্যক্তিদের মিয়ানমারের নাগরিক’ বলে একটা জাতিগত পরিচয় দেওয়ার বিষয়ে তাদের দিক থেকে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। বিষয়টা বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা দূরে থাক, উপরন্তু বাংলাদেশকেই এ নিয়ে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মিয়ানমারের এই অপচেষ্টা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও অবনতিশীল করবে না, এই সংকট ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে সমাধানের দিকটিও তারা সংকুচিত করে ফেলল।

যে বিষয়টি আবারও সামনে চলে আসে সেটা হচ্ছে, এর আগে প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত একাধিক চুক্তি হলেও তারা তাদের স্বীকৃতদের এখন পর্যন্ত ফেরত নেওয়ার মতো কোনো অবস্থা সৃষ্টি করেনি। তারা যাদের তাদের দেশের বলে মনে করে তাদের ফেরত নিতে না পারাটাও তাদের ব্যর্থতা এবং এর দায়ভার বাংলাদেশ বছরের পর বছর বহন করতে থাকবে সেটাও অনুচিত । এক্ষেত্রে চীন, বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যকার আলোচনা এবং সেই সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন, বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন কর্র্তৃক এই বিষয়টি নিয়ে সে সময় উদ্বেগের বিপরীতেও তাদের দিক থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ৯ বছর পর একটি সংকটকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রচেষ্টার বিপরীতে বাংলাদেশের দিক থেকে একা নয়, আন্তর্জাতিকভাবে এর প্রতিকারে অংশগ্রহণ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন অনুযায়ী শরণার্থীরা তাদের মানবাধিকার প্রাপ্তির সব ধরনের অধিকার রাখে। এই অধিকার নিশ্চিত করা কোনো একক দেশের দায়িত্ব নয়, এটি আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা। ২০১৭ সালে সংকটে বাংলাদেশের মানবিক প্রচেষ্টাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে এটি সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল।  আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের ওপর এটি সামগ্রিকভাবে একটি বড় বাধা হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তা শুধু রোহিঙ্গাদের নয়, কক্সবাজারের মানুষের মৌলিক মানবাধিকার, নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

গত ২৩ আগস্ট রাজধানীতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে একাধিক সেমিনারে বক্তারা বিদ্যমান  সংকট সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, ‘কেবল মানবিক সহায়তা নয়, প্রত্যাবাসনই সংকটের একমাত্র সমাধান’। তার এই মতের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নেই। এই সংকট আজকের অবস্থায় এসে উপনীত হওয়ার পেছনেও কিন্তু আমাদের দায় রয়েছে। আমরা প্রত্যাবাসন চাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু সত্যিই কি তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন চাচ্ছি? এতদিন ধরে মানবিক সহায়তার প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহায়তা জোগাড় করা বা রোহিঙ্গাদের ‘গিনিপিগ’ বানিয়ে তাদের নিয়ে গবেষণা চালানোর বিপরীতে প্রত্যাবাসন বিষয় নিয়ে আমাদের মনোযোগ কতটা কেন্দ্রীভূত ছিল এই প্রশ্নও কিন্তু আমাদের করতে হবে।

মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা কিন্তু কখনো প্রীতিকর  ছিল না। তারপরও তাদের নতুন করে আশ্রয় দেওয়ার আগে রাজনৈতিক ঐকমত্যের  প্রয়োজন ছিল এবং জাতীয় সংকটে তো তাই করা উচিত। এ নিয়ে নতুন করে বাংলাদেশ সরকারের আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া খুব জরুরি। মিয়ানমারের হঠাৎ অবস্থান বদলের এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে নতুন কূটনৈতিক কৌশলে আন্তর্জাতিক মহলে এই বিষয়টি উপস্থাপনের পাশাপাশি মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে হবে। বিদ্যামান ভূ-রাজনীতির নিরিখে কূটনীতির ছক কষতে হবে। এই বোঝা আমাদের জন্য বহুমাত্রিক নেতিবাচকতা বাড়াচ্ছে। মিয়ানমার বলছে ৩ লাখের কিছু বেশি, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত এপ্রিলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১১ লাখ ৮৯ হাজার। এই সংকট উত্তরণে সরকারের সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি জনগণকে জানানো অতি আবশ্যক।

লেখক : রাজনীতি-কূটনীতি বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।  

mfulka@yahoo.com