নেপালে নিখোঁজ পশ্চিমবঙ্গের ৩২ পর্যটক

নেপালে হড়পা বানের ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া ৩২ জন পর্যটকের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া নেপালের রুশাই এলাকায় প্রবল জলস্রোতে সেতু ভেঙে পড়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন বাঁকুড়ার ইন্দপুরের বাসিন্দা অশোক পাল। তিনি গত ১০ বছর ধরে ওই এলাকায় একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পে সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছিলেন। খবর আনন্দ বাজার।

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনার ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় পরও নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবারের উদ্বেগ বাড়ছে। বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, রাজ্য থেকে নেপালে যাওয়া ৩৩ জনের মধ্যে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৩২ জনের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা যায়নি।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, নেপালে বিপর্যয়ের খবর পাওয়ার পর ভবানী ভবন ও তাঁর সচিবালয়ে দুটি পুলিশ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ৩২ পর্যটকের মধ্যে পাঁচজন কলকাতা পুলিশের আওতাধীন এলাকার বাসিন্দা। বাকি ২৭ জন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের আওতাধীন এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয় থানা ও প্রশাসন তাঁদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।

শুভেন্দু অধিকারী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সঙ্গে কথা হয়েছে। নেপালে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গেও রাজ্য সরকারের যোগাযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘নেপাল আমাদের বন্ধু-দেশ। ভারত তাদের সাহায্য করছে। আমাদের খুব বেশি কিছু করতে হবে না। তবে আমরা সজাগ।’

যে পর্যটন সংস্থার মাধ্যমে ৩২ জন কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন, তাদের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সংস্থাটি একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে এই যাত্রার আয়োজন করেছিল।

কলকাতার পর্যটকদেরও খোঁজ নেই

দক্ষিণ ২৪ পরগনার মৌখালির বাসিন্দা মিতালি মিত্রও নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন। তাঁর স্বামী প্রবীর মণ্ডল জানান, বুধবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটে হোটেল থেকে চেকআউটের সময় স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। মিতালি জানিয়েছিলেন, সীমান্তের দিকে যাচ্ছেন। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।

প্রবীর জানান, বুধবার বৃষ্টির কারণে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল ছিল এবং হোটেলের ওয়াই-ফাইও ঠিকমতো কাজ করছিল না। তিনি পর্যটন সংস্থা ও ভবানী ভবনের কন্ট্রোল রুমের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন।

দুর্গাপুরের অবসরপ্রাপ্ত বাসিন্দা সুভাষচন্দ্র বসুরও খোঁজ মিলছে না। তাঁর মেয়ে গার্গী বসু জানান, বুধবার সকাল ৬টার দিকে সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে তাঁর বাবা জানিয়েছিলেন, তিনি সীমান্তের দিকে যাচ্ছেন। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

হুগলির দম্পতিরও সন্ধান নেই

চন্দননগরের বাসিন্দা শিপ্রা রায় পাটারীও নিখোঁজ। বয়সের কারণে তাঁর স্বামী রবীন পাটারী নেপাল যাওয়ার ছাড়পত্র না পাওয়ায় শিপ্রা একাই পর্যটন সংস্থার সঙ্গে যাত্রা করেন। সিঙ্গুর গোলাপ মোহিনী স্কুলের সাবেক শিক্ষিকা শিপ্রার ৬ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার কথা ছিল।

শিপ্রার ভাই অখিল রায় জানান, বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বোনের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। এরপর থেকে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

উত্তরপাড়ার ভদ্রকালী পানপাড়া বাই লেনের বাসিন্দা ক্ষিতীশ বিশ্বাস ও তাঁর স্ত্রী মমতা বিশ্বাসও নিখোঁজ। গত ২১ আগস্ট কলকাতার একটি পর্যটন সংস্থার মাধ্যমে তাঁরা কৈলাস-মানস সরোবরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। তাঁদের একমাত্র মেয়ে ১৮ বছর বয়সে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর থেকেই তাঁরা বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতেন বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।

বিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে নিখোঁজ বাঁকুড়ার অশোক

নেপালের রুশাই এলাকায় প্রবল জলস্রোতে সেতু ভেঙে পড়ার পর থেকে নিখোঁজ অশোক পাল। বাঁকুড়ার ইন্দপুরের বাসিন্দা অশোক পূর্ব বর্ধমানে তাঁর বোনের বাড়িতে থাকতেন। গত ১০ বছর ধরে তিনি ওই এলাকায় একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পে সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

অশোকের বোন কবিতা দাস জানান, বুধবার সকাল ৮টা ২০ মিনিটেও ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। এরপর থেকেই তাঁর মোবাইলে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

অশোকের স্ত্রী তাঁদের দু’বছরের শিশুপুত্রকে নিয়ে বীরভূমের মল্লারপুরে বাবার বাড়িতে থাকেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অশোক। তাঁর আত্মীয়দের দাবি, যে বিদ্যুৎ প্রকল্পে তিনি কাজ করতেন, সেখানে প্রায় ৪০ জন কর্মী ছিলেন। দুর্ঘটনার পর থেকে তাঁদের কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

পশ্চিম মেদিনীপুরের অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মীও নিখোঁজ

পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরের হিজলির প্রেমবাজার এলাকার ৬২ বছর বয়সী স্বপনকুমার সিংহও নেপালে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। গত ২১ আগস্ট কলকাতার একটি পর্যটন সংস্থার মাধ্যমে তিনি একাই মানস সরোবরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।

পরিবারের সঙ্গে মঙ্গলবার রাতে তাঁর শেষ কথা হয়। স্বপনের দাদা মিলনকুমার সিংহ জানান, নেপালের বিপর্যয়ের খবর জানার পর থেকেই তাঁরা উদ্বিগ্ন। ভারতীয় দূতাবাস ও ভবানী ভবনের কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করলেও এখনও কোনো তথ্য পাননি।

পুরুলিয়ার দম্পতির সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

পুরুলিয়া শহরের কুকস কম্পাউন্ড এলাকার বাসিন্দা অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী মৌসুমী গঙ্গোপাধ্যায়ও নেপালে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। কর্মসূত্রে তাঁরা দুর্গাপুরে থাকতেন এবং সেখান থেকেই নেপালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন।

পরিবারের সদস্য ভারতী গঙ্গোপাধ্যায় জানান, দু’জনের সঙ্গেই ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। একজনের ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, অন্যজনের ফোনেও যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।

নেপালের ভয়াবহ দুর্যোগের পর নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে তৎপরতা চলছে। এদিকে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাঁদের স্বজনদের সন্ধান পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

এদিকে আকস্মিক এই বন্যায় নেপাল ও চীনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে এবং দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।