চবিতে দুদিনব্যাপী জাতীয় মডেল লেজিসলেটিভ এসেম্বলি শুরু

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দুদিনব্যাপী জাতীয় মডেল লেজিসলেটিভ এসেম্বলি আয়োজন করা হয়েছে। এতে তিনটি আইনের ওপর আলোচনা করা হয়, এগুলো হলো পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল ৯টায় চবির আইন অনুষদের অডিটোরিয়ামে শুরু হয় জাতীয় মডেল লেজিসলেটিভ এসেম্বলি।

অনুষ্ঠানে উদ্বোধন করেন চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি জাফর আহমেদ। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, এডভোকেট জিয়াউল হক, চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শামসুল হক, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. এ বি এম আবু নোমান।

এতে দেশের ৬০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে ৩০০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে তিনটি আইনের ওপর আলোচনা করা হয়, এগুলো হলো পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩।

অনুষ্ঠানে চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান বলেন, ‘আপনারা যদি আইনপ্রণেতা হিসেবে ভূমিকা রাখতে চান, তবে মানব পাচার রোধে এই মুহূর্তে ঠিক কী ধরনের আইন প্রয়োজন, তা নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা ও বিতর্ক করা উচিত। ​আমাদের দ্রুত পরিবর্তিত জলবায়ু ও পরিবেশকে আমরা কীভাবে রক্ষা করতে পারি? আপনারা দেখেছেন, গত সপ্তাহে নেপালে ঠিক কত বড় বিপর্যয় ঘটে গেছে। ​হঠাৎ করেই দেখা গেল, মানুষ রাস্তায় হাঁটছিল কিংবা ঘরে ঘুমাচ্ছিল, এমন সময় আকস্মিক বন্যা এসে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল। চোখের পলকে মানুষ বুঝে ওঠার আগেই তাদের সমস্ত সম্পদ ও জীবন বিলীন হয়ে গেল।’

তিনি আরও বলেন, ‘​চিন্তা করে দেখুন, বৈশ্বিক পরিবেশের এই ক্ষয়ক্ষতির পেছনে নেপালের কিন্তু কোনো ভূমিকা ছিল না; অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আজ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তারাই অন্যতম। ​তাই আপনারা যারা ভবিষ্যৎ আইনপ্রণেতা হতে যাচ্ছেন, আপনাদের ভেবে দেখতে হবে—কীভাবে এমন আইন প্রণয়ন করা সম্ভব, যা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে এবং সাধারণ মানুষকে সুরক্ষাও জোগাবে।’

চবি উপাচার্য আরও বলেন, ‘​আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একজন যোগ্য সংসদ সদস্যকে একাধারে দক্ষ আইনপ্রণেতা, জনগণের সঠিক প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকাণ্ডের তদারককারী, নীতি নির্ধারণে কার্যকর অবদানকারী এবং নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে হয়। ​একটি সংসদ কতটুকু কার্যকর, তা কেবল সংসদ সদস্যদের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না; বরং তারা সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব কতখানি সুচারুভাবে ও নিষ্ঠার সাথে পালন করছেন, সেটাই আসল বিষয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘​বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি আমরা বিবেচনা করি, তবে একটি গণতান্ত্রিক সমাজকে শক্তিশালী করতে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়নকে উৎসাহিত করতে এবং তরুণ ও পরিবর্তনশীল জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে সংসদ সদস্যরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এক্ষেত্রে আপনাদের বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানব পাচার রোধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়টিতে কীভাবে কঠোর সুরক্ষা ও আইনি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা যায়, সে বিষয়েও আপনাদের ভাবতে হবে। ​আমি আশা করি, আমাদের নবীন শিক্ষার্থীরা পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানব পাচার প্রতিরোধে কীভাবে কার্যকর আইন ও নীতিমালা তৈরি করতে হয়, তা ভালোভাবে শিখতে পারবেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের শিক্ষার্থীরা আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও আইন প্রণয়নের পদ্ধতিগুলো সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে পারবে।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি জাফর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের আইন তৈরি হয়, কিন্তু কার্যকর বা বাস্তবায়ন করতে খামখেয়ালিপনা বা সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। তাছাড়া সাধারণ মানুষের মাঝে আইন ও অধিকার নিয়ে সচেতনতা তৈরির কোনো স্পষ্ট প্রবণতাও সচরাচর দেখা যায় না। পরিবেশ রক্ষায় আমাদের তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একইসাথে মানবপাচার রোধে সরকার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সুদৃঢ় সমন্বয় গড়ে তুলে সম্মিলিতভাবে কাজ করা জরুরি। এছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে আইনের প্রতি যথাযথ সচেতনতা ও শ্রদ্ধা তৈরি করতে আমাদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—দেশের কোনো মানুষ যেন কোনোভাবেই বিচারহীনতার মধ্যে না পড়ে এবং কেউ যেন কোনো অবিচারের শিকার না হয়। সর্বোপরি, সাধারণ মানুষ যাতে কেবল আইনের মারপ্যাঁচ ও জটিলতার কারণে ভোগান্তির শিকার না হয়, সে বিষয়ে বিচারব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’