নেপাল ও চীনের তিব্বতে শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটানো ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয়েছিল একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে কয়েক শ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ার পর। বরফ ও পাথরের ওই ধসের সঙ্গে সৃষ্টি হয় প্রবল আকস্মিক বন্যা। খবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের।
হিমবাহটি ঠিক কী কারণে ধসে পড়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নেপালের কর্মকর্তারা শুরুতে এ অঞ্চলে অনুভূত একটি ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, যে কম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তি। এর পরপরই ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেমে আসে।
স্যাটেলাইটের ছবিতেও হিমালয়ের লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কয়েক দিন আগের ছবির সঙ্গে তুলনা করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বরফ ও পাথরের বিশাল স্রোত পাহাড়ি লেহেন্দে খোলা নদী দিয়ে নেমে আসে। নদীটি নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। প্রবল সেই ধস তিব্বতের গিরং বন্দর ও নেপালের বিভিন্ন এলাকায় আঘাত হানে। এতে দ্রুতগতির আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়ে সড়ক, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও গ্রাম ভেসে যায়।
চীনা সরকারের ভূতত্ত্ববিদ গুও ঝাওচেং জানিয়েছেন, ভূমিধসের কারণ হওয়া বরফধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত ঘণ্টায় প্রায় ৫০ মিটার গতিতে এগিয়ে যায়। ফলে মানুষকে সতর্ক হয়ে নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য খুব কম সময়ই ছিল। স্রোতটি ২০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট বন্যার পানি নেপালের বিভিন্ন উপত্যকা দিয়ে দ্রুত নেমে যায়। এতে ভারতের সীমান্তের কাছে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হয়েছে। হিমালয় থেকে ওই এলাকায় পানির উচ্চতার পার্থক্য ছিল ৪ হাজার ৫০০ মিটারের বেশি।
রেড ক্রস জানিয়েছে, বন্যায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি গ্রাম। সড়ক ও সেতু চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় অনেক জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবে দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এখনো পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) জানিয়েছে, আকস্মিক বন্যার প্রবল স্রোত পানি, পলি ও বিশাল পাথর বয়ে নিয়ে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী দিয়ে নেমে আসে। নিচের দিকে গালছিতে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বা ৩০ ফুট বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের দুর্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা থাকতে পারে। আর্থ সায়েন্সেস নিউজিল্যান্ডের ‘মাউন্টেনস টু সি’ কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের বরফ ও পাথর অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
তার মতে, এর ফলে এ ধরনের হিমবাহ ধস এবং একের পর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বুধবারের হিমবাহ ধসের তাৎক্ষণিক একমাত্র কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা ঠিক হবে না। তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহ গলে যাওয়ার বিষয়টি দুর্যোগে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।