শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সতর্কবার্তা

বাড়ছে এআই-নির্ভর সাইবার হামলার ঝুঁকি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার আগেই বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইসহ প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে একটি যৌথ খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে। খবর বিবিসি।

চিঠিতে বলা হয়েছে, এআই ব্যবহার করে চালানো সাইবার হামলা আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই আরও ব্যাপক হয়ে উঠতে পারে। ফলে এখনকার প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা ভবিষ্যতের এই হুমকি মোকাবিলায় যথেষ্ট হবে না।

চিঠির শুরুতেই বলা হয়েছে, 'সাইবার প্রতিরক্ষা জোরদার করার জন্য আমাদের হাতে সময় খুবই সীমিত।' এতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থ ও সম্পদ বরাদ্দেরও সমালোচনা করা হয়েছে।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ক্যাপিটাল ওয়ান, পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠান মাস্টারকার্ড ও ভিসা এবং প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাডোবি, ওরাকল ও আইবিএম।

সরকারগুলোর প্রতি তাদের আহ্বান, হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তায় কার্যকর প্রতিরক্ষামূলক এআই এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ উদ্যোগে অর্থ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, সাইবার হুমকি মোকাবিলায় সরকার ও প্রযুক্তি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং নিজেদের প্রযুক্তি, অর্থ ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগাতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বড় সাইবার হামলার ঘটনা সামনে আসার পর এই সতর্কবার্তা দেওয়া হলো।

চলতি সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, চীনা হ্যাকাররা মার্কিন সিনেট, নাসা, ফেডারেল রিজার্ভ এবং বিচার বিভাগের প্রযুক্তি অবকাঠামোয় অনুপ্রবেশ করেছিল।

এদিকে চলতি গ্রীষ্মে ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটা তাদের এআই ব্যবস্থার এমন কিছু কর্মকাণ্ডের কথা জানিয়েছে, যা সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কিছু এআই এজেন্ট নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করেছে, এমনকি নিরাপত্তাব্যবস্থার বাধা পেরোতে বাস্তব মানুষের পরিচয়ও নকল করেছে।

জুলাইয়ে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো ওপেনএআইয়ের কয়েকশ এআই এজেন্ট নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য গোপন বার্তা বোর্ড তৈরি করে। পরে তারা সমন্বিতভাবে কাজ করে এআই ডেভেলপারদের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসে সফলভাবে হামলা চালায়। ঘটনাটিকে বিশ্বের প্রথম এআই-সক্ষম সাইবার হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

হাগিং ফেসও ওই যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে। হামলার ঘটনা তদন্ত করতে প্রতিষ্ঠানটি চীনা প্রযুক্তি কোম্পানি জেড.এআইয়ের তৈরি একটি এআই টুল ব্যবহার করে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত সাতটি পানি ও বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার হামলার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এফবিআই পানি ও বর্জ্যপানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সাইবার নিরাপত্তা আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে চিঠিতে প্রতিরক্ষামূলক এআই ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হলেও উন্নত এসব প্রযুক্তি এখনো সবার জন্য সহজলভ্য নয়।

অ্যানথ্রপিকের তৈরি ‘মাইথস’ নামের একটি এআই ব্যবস্থা মাত্র কয়েক সেকেন্ডে এমন নিরাপত্তা দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারে, যা মানুষ হ্যাকাররা দীর্ঘদিনেও শনাক্ত করতে পারেনি বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি একটি পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবস্থায় ২৭ বছর ধরে অজানা থাকা একটি দুর্বলতাও মাইথস শনাক্ত করেছে।

তবে প্রযুক্তিটি ভুল হাতে পড়লে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে—এই আশঙ্কায় অ্যানথ্রপিক এর ব্যবহার সীমিত রেখেছে।

যৌথ চিঠিতে ফ্রন্টিয়ার এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি দায়িত্বশীলভাবে তাদের শক্তিশালী এআই মডেল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তায় পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও সরাসরি কারিগরি সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

তবে এসব সহায়তা কখন এবং কীভাবে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে চিঠিতে বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়নি।

এআই নিয়ে গবেষণাকারী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সিআইভিএআই এর গবেষণা প্রধান অ্যান্ড্রু ইউন সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্ব খুব শিগগিরই নজিরবিহীন মাত্রার এআই-নির্ভর হ্যাকিং কার্যক্রমের মুখোমুখি হতে পারে। তবে এই পরিস্থিতির জন্য চিঠিতে স্বাক্ষরকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোরও কিছুটা দায় রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

ইউনের মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থায় বড় ধরনের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সঠিক কাজ করেছে। তবে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে তাদের জবাবদিহির মধ্যে রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, চিঠিতে এআইয়ের হ্যাকিং সক্ষমতার দ্রুত অগ্রগতি কিছুটা ধীর করার কোনো উদ্যোগের কথা বলা হয়নি।

চিঠিতে সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং এআই কোম্পানিগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। শক্তিশালী এআই মডেলগুলো যে ধরনের সাইবার হামলা চালাতে পারে, সেই সক্ষমতার কথা মাথায় রেখে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সিনেটররা ‘কিল সুইচ অ্যাক্ট’ নামে একটি নতুন আইন প্রস্তাব করেছেন। এই আইনের মাধ্যমে বিপজ্জনক বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এআই মডেল বন্ধ করার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসা নোবেলজয়ী প্রযুক্তিবিদ জিওফ্রি হিন্টনও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বৃহস্পতিবার বিবিসিকে তিনি বলেন, এআই যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যখন তা মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে, তাহলে সমাজ বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারে।