গোপন সংবাদ পেয়ে বাড়িটির চারপাশ ঘিরে ফেলে পুলিশ। টের পেয়ে নিজের হাতে থাকা নাইন এমএম তরাস পিস্তলটি নিয়ে ঘরের ফলস ছাদে উঠে পড়েন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে গলা কাটা মোবারক। পুলিশ সদস্যরা ঘরে ঢোকার চেষ্টা করতেই একের পর এক গুলি ছুড়তে থাকেন মোবারক। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। পিস্তল থেকে ছয়টি গুলি ছোড়ার পর থেমে যায় ট্রিগার। অভিযানের সময় মোবারকের সঙ্গে পুলিশের সদস্যদের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
পুলিশের করা ওই ভিডিওতে দেখা যায়, ঘরের দরজার সামনে দুইজন পুলিশ সদস্য কালা মোবারককে বার আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাচ্ছেন। ঘরের ভেতরে এক বৃদ্ধ ও নারী দাঁড়ানো। তারাও মোবারককে আত্মসমর্পণের কথা বলছেন। অস্ত্রটি দিয়ে দেওয়ার জন্য মোবারককে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আজিজ বার বার মোবারককে প্রাণে বাঁচতে আত্মসমর্পণ করতে বলে পুলিশ।
উত্তরে মোবারক বলেন, ‘আমার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাই। আমাকে নিরাপত্তা দেবেন বলে আপনারা কসম করেন’। এরপর পুলিশের একজন সদস্য কসম করেন৷ এরপর ফলস ছাদ থেকে নেমে দুই হাত উঁচু করে দরজার কাছে এসে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। গত বুধবার রাতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকায় মোবারককে ধরতে অভিযান চালায় চট্টগ্রাম পুলিশের একটি দল।
ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের এক সদস্য মোবারকের উদ্দেশে বলছেন,‘জীবন বাঁচাতে চাইলে অস্ত্র ফেলে দে। আমাদের হাতে ধরা দে। আমরা জীবন বাঁচাব। আমরা খবর পাইছি, তোরে বাইরে কেউ মারার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা তোরে বাঁচানোর জন্য আসছি।’
তখন উত্তরে মোবারক বলেন, ‘অস্ত্র দিলে সমস্যা হবে।’ এরপর পুলিশের ওই সদস্য আবার বলেন, ‘মোবারক, তোর ভালোর জন্য আসছি। তুই সারেন্ডার কর। তোর বাঁচার সুযোগ নেই। তোকে আমরা বাঁচানোর জন্য আসছি। তুই অস্ত্র ফেল, সময় নষ্ট করিস না। বের হওয়ার এখান থেকে আর কোনো সুযোগ নেই। পুলিশ বর্তমানে কাউকে মারে না।’এরপরও মোবারক বলেন, ‘অস্ত্র ফেলব না।’ তখন ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশের একজন বলেন, ‘অস্ত্র দিলে কেউ মারবে না তোকে। কেন মারব? আমি ওসি বলছি, অস্ত্রটা দিয়ে দে।’ মোবারক তখন পুলিশকে সরে যেতে বলেন।
উত্তরে পুলিশ সদস্যরা বলেন, ‘না, যাব না। মোবারক, অস্ত্রটা দে। অস্ত্রটা ফেল। নিচে নাম, আগে নিচে নাম।’ একপর্যায়ে মোবারক বলেন, ‘আপনারা কসম করেন, আমাকে কিছু করবেন না।’
পুলিশ সদস্যরা তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘কিছু করব না। খোদার কসম, কিছু করব না। এই মুরুব্বির (ঘরে থাকা বৃদ্ধ) কাছে অস্ত্র দে, চিন্তা থাকবে না। মুরুব্বির কাছে অস্ত্রটা দে।’ পুলিশ সদস্যদের একজন তখন বলেন, ‘আমাদের কাছে কিন্তু চায়না রাইফেল, এসএমজি—সবকিছুই আছে। মোবারক, ইমন (ডেভিড ইমন) গ্রেপ্তার হয়েছে। ইমনের চেয়ে তুই বড় সন্ত্রাসী না।’
উত্তরে মোবারক বলেন, ‘স্যার, আমি একটু পরে বলব স্যার। একটা অনুরোধ...আপনারা কসম করেন, আমাকে কিছু করবেন না।’ তখন এক পুলিশ সদস্য আবারও বলেন, ‘কসম করলাম তো। খোদার কসম, কিছু করব না। কিছু করব না। অস্ত্র ফেলে দে। খোদার কসম, কিছু করব না আমরা। তোর কিচ্ছু হবে না।’ উত্তরে মোবারককে বলতে শোনা যায়, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ, ভালো হইছে।’ এরপর পুলিশের ওই সদস্য ঘরে থাকা বৃদ্ধকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মুরুব্বি, অস্ত্রটা নিয়ে আসেন। মুরুব্বি, অস্ত্র নিয়ে নেন।’
পুলিশ জানায়, মোবারকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগরে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। থানা থেকে লুট করা অস্ত্র দিয়েই রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী এলাকায় যুব দলনেতা মাসুদুল হক মাসুদকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
মোবারক সম্পর্কে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ডেভিড ইমনের চেয়েও ভয়ংকর সন্ত্রাসী কালা মোবারক। তাকে গ্রেপ্তারে ফটিকছড়ির অনেক মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছে৷ পুলিশকে ধন্যবাদ দিচ্ছে। সে ( মোবারক) এতটাই দুর্ধর্ষ শুটার যে, পুলিশ তাকে ধরতে গেলে উল্টো পুলিশকে গুলি করবে মোবারক, এমন ধারণার কথা অভিযানের আগেই আমাদের জানিয়েছিল স্থানীয়রা।’
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘রাউজানে মাসুদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে মোবারককে অস্ত্র হাতে দেখা গেছে। তার হাতে দুটি অস্ত্র ছিল। একটি অস্ত্র থানা থেকে লুট করা। মোবারক নিজেই সেই অস্ত্র দিয়ে মাসুদের মাথায় গুলি করেছেন। মোবাইলে যুবদল নেতা মাসুদের ছবি পাঠিয়ে টার্গেট ফিক্স করে দিয়েছে আরেক পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান আলম। সাজ্জাদ গ্রুপের একজন শুটার কালা মোবারক। চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামীতে সরোয়ার বাবলা খুন থেকে শুরু করে রাউজান ও ফটিকছড়ির বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে তিনি অংশ নিয়েছেন মোবারক।’
জেলা পুলিশ কর্মকর্তা তারেক আজিজ বলেন, ‘পুলিশের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের সময় মোবারক তার ফোন থেকে ছবি, ভিডিওসহ হোয়াটস অ্যাপ ডিলিট করে দেন, যাতে ধরা পড়লেও পুলিশ কোনো প্রমাণ উদ্ধার করতে না পারে। তবে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক স্বীকার করেছেন, পুলিশের অস্ত্র দিয়েই খুন করা হয় যুবদল নেতা মাসুদকে।’
পুলিশ জানায়, মোবারক বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী। বুধবারের অভিযানে তার (মোবারক) সঙ্গে তার তিন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ৩টি পিস্তল, ২৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলি ও ৪টি শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানের সময় মোবারকের ছোড়া গুলিতে পুলিশ কর্মকর্তা তারেক আজিজসহ পাঁচজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।