অধরা তিতাস গ্যাস ও বাড়িওয়ালারা

ছয় মাস আগে ফাহিমা আক্তারকে (১৯) বিয়ে করেছিলেন আনোয়ার হোসেন শাহীন (২৫)। জুলাই মাসের ১ তারিখে ভাটারা নতুনবাজার ১০০ ফিট এলাকার ‘সাঁঝের মায়া’ বাড়ির নিচতলা ভাড়া নিয়ে সংসার শুরু করেছিলেন তারা। তাদের সঙ্গে থাকত ভাগ্নি হাফসা আক্তার (৮)। ২১ জুলাই বাসার গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে তিনজনই নিহত হন।

নিহত ফাহিমার ভাই আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, ‘বাড়িওয়ালা একটি ডাবল বার্নার গ্যাসের চুলার মাঝখান দিয়ে তিন ইঞ্চি দেয়াল তুলেছেন। ডাবল চুলা সিঙ্গেল করে দুই পরিবারকে দিয়েছেন। পাশের ভাড়াটিয়ারা চুলা জ্বালালে ফাহিমাদের পাশে শোঁ শোঁ শব্দ হতো; গ্যাসের গন্ধ বের হতো এবং লাইন থেকে ঝরঝর করে পানি পড়ত। বিষয়টি বাড়িওয়ালাকে জানালে তিনি পাইপ মেরামত করে দেন। এরপরও কয়েকবার পাইপে লিক হয়েছে। বাড়িওয়ালা আর পাইপ ঠিক করে দেননি। ওই লিকেজ থেকেই বিস্ফোরণ ঘটে।’ 

অবহেলাজনিত ওই মৃত্যুর দায় নিচ্ছে না বাড়িওয়ালা এবং তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। বাড়িওয়ালা নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিলেও এখনো দেননি। তিনটি প্রাণ অকালে ঝরে গেলেও দায় নিতে চায় না কোনো পক্ষই।

ভাটারা থানার ওসি মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ওই ঘটনায় নিহত হাফসার মা রাহিমা বেগম বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। নিহত স্বামী-স্ত্রীর পক্ষে কেউ অভিযোগ করেননি। অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করা হলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নিতাম।’ 

গত ৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের বন্দরে বাসায় গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ হন গৃহকর্তা রাজমিস্ত্রি মাইদুল ইসলাম (২৪) ও তার স্ত্রী বিউটি আক্তার (২২) এবং তাদের শিশুসন্তান মো. মারুফ। পরে তারাও মারা যান। এ ঘটনায়ও মামলা করেননি নিহতদের স্বজনরা।

নিহত বিউটি আক্তারের ভাই মো. রনি বলেন, ‘কার বিরুদ্ধে মামলা করব। বোন, দুলাভাই, ভাগ্নিকে তো আর ফিরে পাব না। মামলা করলে ময়নাতদন্ত করবে, পোড়া শরীর আবার কাটবে।’ 

দুটি ঘটনাই শুধু নয়; সারা দেশে গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিকা- অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। মৃত্যু, দগ্ধ হওয়া ও ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। অবহেলাজনিত কারণে এসব ঘটনা ঘটলেও দায় নিচ্ছে না কোনো পক্ষই।

২০২৫ সালে সিলিন্ডার ও সিলিন্ডারের সঙ্গে যুক্ত উপকরণের লিকেজ থেকে এক হাজার ৪১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর আগের বছর ঘটেছে ৭৪৮টি। আগের বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে ২৯৩টি দুর্ঘটনা বেশি হয়েছে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি বাড়লেও সিলিন্ডার আমদানি, বাজারজাতকরণ ও নিরাপত্তা-পরীক্ষার বিষয়ে সরকারের তিন তদারকি সংস্থা নির্বিকার। আবার ভুক্তভোগীরাও কোনো মামলা করছে না।

গ্রাহকদের অসচেতনতা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নির্বিকার ভূমিকার কারণে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সঠিক নিয়মে সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল না করা, মানহীন সুরক্ষার যন্ত্রাংশ ব্যবহার, সঠিক পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণ না করা, মেয়াদোত্তীর্ণ বোতল ও চুলার পাশে সিলিন্ডার রাখা দুর্ঘটনার বড় কারণ। দুর্ঘটনা কমাতে হলে মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করে জড়িতদের বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘লাইনের গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণ উভয় কারণেই অগ্নিকা- ঘটছে। নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, নজেল, ভালভের কারণে লিকেজ হয়। নানা কারণে ঘরে জমে থাকা গ্যাসের গন্ধ এখন তেমন টের পাওয়া যায় না। আগুন জ্বালানো মাত্র বিপদে পড়ছেন বাসিন্দারা।’ তিনি বলেন, নিম্নমানের সিলিন্ডার অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে এলে গ্যাসের চাপ বেড়ে বিস্ফোরণ হয়। সিলিন্ডারের হাইড্রোলিক পরীক্ষা করা হচ্ছে না। দুর্ঘটনায় সিলিন্ডার আমদানি থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার দায় রয়েছে। গ্রাহকদেরও সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। চুলা জ্বালানোর ১৫-২০ মিনিট আগে দরজা-জানালা খুলে রাখতে হবে। এরপর আগুন ধরাতে হবে।’ 

পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে আগুনের ঘটনা ছিল ২৭ হাজার ৫৯টি; মৃত্যু হয়েছে ৮৫ জনের, আহত হয়েছেন ২৬৭ জন। চুলা থেকে দুই হাজার ৯০৯টি (১০.৭৫%), গ্যাস সিলিন্ডার যন্ত্রাংশের লিকেজ থেকে ৯২০টি (৩.৪০%), গ্যাস সরবরাহ লাইনের লিকেজ থেকে ৫৬২টি (২.০৮%) এবং গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ থেকে ১২১টি (০.৪৫%) আগুনের ঘটনা ছিল। ২০২৪ সালে সারা দেশে গ্যাস সিলিন্ডার যন্ত্রাংশের লিকেজ থেকে ৫৩৯টি, সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত ২৯টি, গ্যাসের সরবরাহ লাইনের লিকেজ থেকে ৩৭৯টি এবং শীততাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে ৬১টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে।

বাস্তবে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি। কারণ হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাস্থলে যেসব লাশ তারা পান সেসবেরই রেকর্ড হয়। পরে চিকিৎসাধীন মারা গেলেও মৃত্যুর তালিকায় স্থান হয় না।

আগুনে পোড়া অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা নেন ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। গত বছর সিলিন্ডার ও লাইনের গ্যাস লিকেজসংক্রান্ত দুর্ঘটনায় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন যথাক্রমে ১৬২ ও ৮৩ জন। দগ্ধ কয়েকজনকে মৃতাবস্থায় আনা হয়। তবে ভর্তি রোগীদের মধ্যে কতজন মারা গেছেন তা জানা যায়নি।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, ‘গ্যাসের আগুনে দগ্ধ রোগীর সমস্যা বেশি হয়। শরীরে গভীর ক্ষত হয়। গ্যাস বা ধোঁয়ায় শ্বাসনালি পুড়ে যায়। শারীরিক ট্রমার কারণে মৃত্যুঝুঁঁকি বেড়ে যায়।’ দগ্ধদের বেশিরভাগের ভাষ্য তারা ঘরে গ্যাস লিকেজ টের পাননি। চুলা জ্বালানোর সময় বিস্ফোরণ হয়েছে। সবাইকে সচেতন হতে হবে।

নেই পরীক্ষণ কেন্দ্র : দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি গ্রাহক এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। গ্রাহকদের বড় অংশই গ্রামাঞ্চলের। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩০ কোম্পানির অন্তত দুই কোটি সিলিন্ডার বাজারে রয়েছে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত এক বছরে এলপিজি সিলিন্ডার আমদানি করা হয়েছে ৬ লাখ ১৩ হাজার ৩২৩টি। অন্য সিলিন্ডার আমদানি করা হয়েছে ৩ লাখ ১ হাজার ১৯০টি। দেশে সিলিন্ডার তৈরির জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান বাজারজাত করেছে দেশে নির্মিত ৩৫ লাখ ৮২৯টি এলপিজি সিলিন্ডার। কিন্তু এসব সিলিন্ডারের মান পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত কোনো পরীক্ষণকেন্দ্র নেই।

সংস্থাটির সহকারী পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান বলেন, ‘অনেক অসাধু ব্যবসায়ী গভীর রাতে বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে অবৈধভাবে গ্যাস স্থানান্তর করে। কক্সবাজার বা রংপুরের মতো জায়গায় ঘটে যাওয়া বড় দুর্ঘটনাগুলোর তদন্তে দেখা গেছে, ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধ লাইসেন্স ছিল না। সারা দেশে মাত্র ১৪ কর্মকর্তা এই বিশাল কর্মযজ্ঞের তদারকি করছেন। জেলাপর্যায়ে কোনো অফিস নেই, শুধু বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালিত হয়।’ তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটলে গুরুত্ব বুঝে পরিদর্শন করা হয়। লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের অবহেলা পাওয়া গেলে তাদের অনুমোদন বাতিল করা হচ্ছে এবং অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে।’ 

কয়েকটি ঘটনা : ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের হালিশহরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় একই পরিবারের ৯ জন দগ্ধ হন। চিকিৎসাধীন তাদের ৫ জনের মৃত্যু হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার নারিন্দার একটি বাসায় শীততাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুন লেগে মো. সেলিম ব্যাপারী (৩০) দগ্ধ হয়ে মারা যান। ২ মে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বাসায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের ৫ জন দগ্ধ হন; পরে পাঁচজনেরই মৃত্যু হয়। ১০ জুলাই বংশালের মুকিম বাজারের শিয়া গলিতে একটি মোটর পার্টসের দোকানে/গুদামে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দেলোয়ার হোসেন (৩৫) নিহত এবং নাজমুল হোসেন (৩৩) দগ্ধ হন। গত ৬ মার্চ ভোরে তুরাগ নদীপাড়ের কামারপাড়ার একটি বাসায় গ্যাস বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ ১০ জন দগ্ধ হন। পরে সোনিয়া আক্তার (২৫) নামে একজন মারা যান। একই দিন বিকালে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার সিদলাই ইউনিয়নের পোমকাড়া গ্রামে একটি চায়ের দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে শিশুসহ দুজন আহত হন।