সময়ের মূল্য বুঝে জীবন গড়ার শিক্ষা

সময় অমূল্য সম্পদ। এ সম্পদ হারিয়ে গেলে আর কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া যায় না। অথচ আমরা অনেক সময় এর গুরুত্ব ভুলে যাই। ইসলাম মানুষকে প্রতিটি মুহূর্তের ব্যাপারে সচেতন হতে শেখায়। কারণ সময়ের সঠিক ব্যবহার দুনিয়ার জীবনকে সুন্দর করে এবং আখেরাতের সফলতার পথও প্রশস্ত করে।

সময় অপূরণীয় সম্পদ : ইসলাম সময়কে জীবন ও ইমানের সঙ্গে সমান্তরালে মূল্যায়ন করেছে। সময়ই মানুষের কাজ, আমল, জ্ঞান ও আখিরাতের মূল ভিত্তি। সুরা আসরে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘শপথ সময়ের, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিতে আছে।’ (সুরা আসর ১-২)

এই আয়াতই সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে যথেষ্ট। সময় এমন এক সম্পদ, যা একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। পৃথিবীর সব সম্পদ দিয়ে তা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।

কোরআনে সময়ের গুরুত্ব : পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা সময়ের ওপর বহুবার শপথ করেছেন। যেমন ‘শপথ প্রভাতের’ (সুরা ফজর ১) ‘শপথ রাতের যখন তা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়।’ (সুরা লাইল ১) ‘শপথ দিবসের যখন তা আলোকিত হয়।’ (সুরা শামস ৩) এসব শপথ সময়ের বিভিন্ন অংশকে নির্দেশ করে। আর আল্লাহ যেহেতু কোনো বিষয়কে অযথা শপথ করেন না, তাই বোঝা যায় সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

হাদিসে সময় সচেতনতা : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে বারবার উম্মতকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘দুটি নিয়ামত আছে, যেগুলোর ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকার মধ্যে রয়েছে, তা হলো স্বাস্থ্য ও অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি ৬৪১২)

এই হাদিস স্পষ্ট করে যে অবহেলা, অলসতা কিংবা অজুহাতে সময় নষ্ট করা এক ধরনের ধোঁকা। সময় নষ্ট করা মানে, জীবনের মূল্যবান মুহূর্তগুলোকে হারিয়ে ফেলা।

নবীজির জীবনে সময় ব্যবস্থাপনা : রাসুল (সা.) তার জীবনে সময়কে কতটা গুরুত্ব দিতেন, তা তার দৈনন্দিন জীবন থেকেই বোঝা যায়। তিনি সময় ভাগ করে ইবাদত, দাওয়াত, পরিবার, যুদ্ধনীতি ও উম্মতের কল্যাণে ব্যয় করতেন। সাহাবিরা তার সময় ব্যবস্থাপনার প্রতি এতটাই বিস্মিত ছিলেন যে, তারা বলতেন ‘আমরা কখনো রাসুলুল্লাহকে অলস বা উদ্দেশ্যহীন অবস্থায় দেখিনি।’

সাহাবিদের সময় সচেতনতা : সাহাবায়ে কেরামের জীবনেও সময় সচেতনতা ছিল অনন্য। হযরত ওমর (রা.) বলতেন, ‘আমি পছন্দ করি না যে আমি অলস থাকি, না আমি দুনিয়ার কোনো কাজে নিয়োজিত থাকি, না আখেরাতের কোনো কাজে।’ ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন, ‘আমি কখনো কোনো দিনকে এমন পার হতে দিই না, যাতে আমার ইলমে বা আমলে কোনো বৃদ্ধি না ঘটে।’

সময় অপচয়ের পরিণতি : ইসলামের দৃষ্টিতে সময় নষ্ট করাও এক ধরনের গুনাহ। অলসতা, ফাঁকা সময়, ফেসবুক-ইউটিউব আসক্তি, অনর্থক আড্ডা, ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করা, এসবই সময় অপচয়ের উদাহরণ। কেয়ামতের দিন মানুষ তার প্রতিটি সময়ের হিসাব দিতে বাধ্য থাকবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন বান্দা পাঁচটি বিষয়ের হিসাব না দেওয়া পর্যন্ত এক কদমও এগোতে পারবে না, এর মধ্যে একটি হলো, সে কীভাবে তার সময় অতিবাহিত করেছে।’ (তিরমিজি)

সময় সচেতনতা ও নামাজ : ইসলামে সময় ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা পাওয়া যায় নামাজ থেকে। নামাজের পাঁচটি নির্ধারিত সময় রয়েছে, যা একজন মুসলমানকে সময়ানুবর্তী হতে শেখায়। নামাজের মাধ্যমে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ভাগে আল্লাহর স্মরণ, আত্মশুদ্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চা হয়।

সময় সচেতনতার অভাব : আজকের সমাজে সময় সচেতনতার অভাব লক্ষণীয়। যুবসমাজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল স্ক্রিনে কাটায়। শিক্ষা ও ক্যারিয়ারের সময় অলসতায় হারিয়ে ফেলে। সময়কে মূল্য না দিয়ে ‘পরে করব’, ‘সময় আছে’, এই ধারণা নিয়ে চলে। এভাবে একটি প্রজন্ম দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু নষ্ট করে দেয়, যা শুধু ব্যক্তি নয়, জাতিকেও পিছিয়ে দেয়।

লেখক : ইসলামি গবেষক