আমরা তীব্র দাবদাহ, প্রচণ্ড উত্তাপ এবং দুপুরের প্রখর রোদ অনুভব করছি। এর মধ্যেও রয়েছে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ। এটি মুমিনকে মহান আল্লাহর রবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব) এবং তার কুদরত (ক্ষমতা) সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি সৃষ্টিজগতে মহান আল্লাহর প্রতিষ্ঠিত নিয়মকে স্মরণ করিয়ে দেয়। কেননা এগুলো মহান আল্লাহর রবুবিয়্যাতের অন্যতম নিদর্শন। তিনিই দিন, মাস ও ঋতুর পরিবর্তন ঘটান, বছর ও যুগের আবর্তন ঘটান। তিনিই সৃষ্টিজগতের মূল পরিচালক এবং একক নিয়ন্ত্রক।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ যদি রাতকে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত তোমাদের ওপর স্থায়ী করে দেন, তবে আল্লাহ ছাড়া এমন কোনো মাবুদ আছে, যে তোমাদের আলো এনে দিতে পারে? তোমরা কি শোনো না? বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ যদি দিনকে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত তোমাদের ওপর স্থায়ী করে দেন, তবে আল্লাহ ছাড়া এমন কোনো মাবুদ আছে, যে তোমাদের জন্য রাতের আগমন ঘটাতে পারে, যাতে তোমরা বিশ্রাম নিতে পার? তোমরা কি চোখ মেলে দেখো না?’ (সুরা কাসাস ৭১-৭২)
যার রবুবিয়্যাত সর্বব্যাপী, একমাত্র তিনিই একক ইবাদতের যোগ্য। একই সঙ্গে এসব পরিবর্তন আমাদের এই দুনিয়ার নিয়মও স্মরণ করিয়ে দেয়। মহান আল্লাহ এই পৃথিবীকে পরিবর্তনশীল অবস্থার আবাস করেছেন। এর কোনো অবস্থা চিরস্থায়ী নয়। কোনো পরিস্থিতিও স্থায়ীভাবে এক অবস্থায় থাকে না।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে দুনিয়ার অবস্থাকে এভাবে তুলে ধরেছেন, ‘জেনে রাখো, দুনিয়ার জীবন তো কেবল খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদ, সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক অহংকার এবং ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে পরস্পরের ওপর আধিক্য অর্জনের প্রতিযোগিতা। এর দৃষ্টান্ত হলো বৃষ্টির মতো। তা থেকে উৎপন্ন ফসল কৃষকদের মুগ্ধ করে। তারপর তা শুকিয়ে যায়। তখন তুমি সেটাকে হলুদ বর্ণের দেখতে পাও। অবশেষে তা খড়কুটোয় পরিণত হয়। আর পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। দুনিয়ার জীবন তো প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা হাদিদ ২০)
‘দুনিয়ার জীবন তো প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়’, এটি এক বিস্ময়কর উপমা এবং দুনিয়ার পরিবর্তনশীল অবস্থার এক চমৎকার চিত্র। কখনো এখানে নেয়ামত ও স্বাচ্ছন্দ্য আসে। আবার কখনো সংকট ও বিপদ আসে। ঠিক যেমন কৃষিক্ষেত্র কখনো সতেজ ও সজীব থাকে, আবার কখনো শুকিয়ে যায় এবং বিবর্ণ হয়ে পড়ে। বছরের ঋতুগুলো যেমন একের পর এক পরিবর্তিত হয়, আলো ও অন্ধকার যেমন পালাক্রমে আসে, তেমনি সংকট ও কঠিন অবস্থার পর স্বস্তি ও সমৃদ্ধিও আসে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি শপথ করছি সন্ধ্যার লালিমার, রাতের এবং তাতে যা কিছু সমবেত হয় তার, এবং চাঁদের, যখন তা পরিপূর্ণ হয়, তোমরা অবশ্যই এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় আরোহণ করবে।’ (সুরা ইনশিকাক ১৬-১৯)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই এক অবস্থার পর আরেক অবস্থায় উপনীত হবে।’ (সহিহ বুখারি)
এর মধ্য থেকে যে শিক্ষাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তার একটি হলো, যখন কোনো মুমিনের মন দুনিয়াবি কিংবা আখেরাতের কোনো কল্যাণ ও উপকারের কাজ করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যখন সে আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে ঝুঁকে যায়, তখন তাকে আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত এই কথাটি স্মরণ করা উচিত।
আর মানুষের মন স্বভাবতই অলসতার দিকে ঝোঁকে এবং আরামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু যখন সে ভালো কাজ থেকে পিছিয়ে থাকার খারাপ পরিণতি এবং ধৈর্যের উত্তম পরিণতি ও সুন্দর ফলাফল স্মরণ করে, তখন তার উদ্যম জেগে ওঠে। সে ভালো কাজের দিকে এগিয়ে যায়, যদিও তাতে কিছুটা কষ্ট থাকে।
হে মুসলিম উম্মাহ! মহান আল্লাহ মানুষকে আধুনিক শীতলীকরণ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের এমন সব ব্যবস্থা দান করেছেন, যা অতীতের যুগ ও বিগত সময়গুলোতে ছিল না। এগুলো মহান আল্লাহর নেয়ামত, যা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দাবি রাখে। এগুলো স্মরণ, চিন্তা ও শিক্ষা গ্রহণেরও বিষয়।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের গৃহগুলোকে তোমাদের জন্য শান্তির জায়গা বানিয়েছেন। তিনি পশুর চামড়া থেকে তোমাদের জন্য এমন গৃহের ব্যবস্থা করেছেন, যা তোমরা হালকাবোধ করো তোমাদের ভ্রমণকালে কিংবা অবস্থানকালে। তিনি ওগুলোর পশম, লোম আর চুল থেকে তোমাদের পরিধেয় ও ব্যবহার্য সামগ্রীর ব্যবস্থা করেছেন, যা তোমরা কিছুকাল পর্যন্ত কাজে লাগাও। আর আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, তা থেকে তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন এবং পাহাড় থেকে তোমাদের জন্য আশ্রয়স্থল বানিয়েছেন, আর ব্যবস্থা করেছেন পোশাকের, যা তোমাদের গরম থেকে রক্ষা করে এবং বর্মেরও ব্যবস্থা করেছেন যা তোমাদের রক্ষা করে তোমাদের যুদ্ধে। এভাবেই তিনি তোমাদের ওপর তার নেয়ামতকে পূর্ণ করবেন, যাতে তোমরা অনুগত হও।’ (সুরা নাহল ৮০-৮১)
অতএব, আপনারা আল্লাহর অধিক পরিমাণ প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। তার কাছে বেশি বেশি দোয়া করুন এবং তার জিকিরে নিজেদের জিহ্বা সিক্ত রাখুন।
হে আল্লাহ! সর্বত্র এবং সর্বকালে মুসলমানদের অবস্থা সংশোধন করে দিন। তাদের শত্রু এবং আপনার শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য করুন।
হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে আপনাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহকে অব্যাহত রাখুন এবং তার আদেশ অনুসরণের মাধ্যমে তার নেয়ামতকে সংরক্ষণ করুন।
২১ আগস্ট শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন আহমদ আবদুর রাফি