ইরানের হাতে হরমুজের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’

বিশ্ব তেল বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মিত্রদের আশ্বস্ত করতেই হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্য ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান। হরমুজ প্রণালি খোলা ও বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নিরাপদ রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র যে দাবি করছে তা প্রত্যাখ্যান করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। এক বিবৃতিতে আইআরজিসির নৌবাহিনী দাবি করেছে, তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নিজেদের হাতে রেখেছে। ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তারা ওয়াশিংটনের দাবিকে ‘স্পষ্ট মিথ্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানে হামলার পর জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্ব জলপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। এতে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম হুহু করে বেড়ে যায়। যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।

আইআরজিসি বলেছে, এই জলপথে তাদের নিয়ন্ত্রণ ‘সুনির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত’। তেহরানের অনুমতি ছাড়া যেকোনো জাহাজের চলাচলে কড়াকড়ি ‘পূর্ণ শক্তিতে’ বহাল থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক হামলা বন্ধ না করা পর্যন্ত এবং চুক্তি অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি না মানা পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ বজায় থাকবে। ইরান যুদ্ধের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। কয়েকবার যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ ঘোষণা দিয়েছে। যেসব কারণে দুই দেশ শান্তি চুক্তিতে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম এই প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।

ওয়াশিংটন বলছে, ইরানের নৌযান চলাচলের ওপর তাদের অবরোধ বহাল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপার গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাদের বাহিনী হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক নৌপথ থেকে মাইন সরিয়ে ফেলেছে এবং এখন এসব পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল উন্মুক্ত রয়েছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত সাত দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৯টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার হিসাবে এই সংখ্যা ছিল প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি। তবে ওয়াশিংটনের দাবি সত্ত্বেও শিপিং ডেটা বলছে, প্রণালিটিতে জাহাজ চলাচল এখনো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সম্প্রতি যেখানে দিনে গড়ে ১৫টি পণ্যবাহী জাহাজ পারাপার হতো। গত বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ৭টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। এর আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১৭টি। তবে কিছু জাহাজ ‘ট্র্যাকিং ট্রান্সপন্ডার’ বন্ধ রেখে চলায় প্রকৃত সংখ্যায় কিছুটা হেরফের হতে পারে।

তেলের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পরিচালনা এবং এ সংক্রান্ত রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। আইআরজিসি জানিয়েছে, চূড়ান্ত কাঠামো নিয়ে আলোচনা চললেও ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয়ে ওমানের সঙ্গে ঐকমত্য হয়েছে। এ ছাড়া কাতার ও ওমানের মধ্যস্থতায় বাণিজ্য নৌ চলাচল স্বাভাবিক করতে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পুনরায় আলোচনা শুরুর কূটনৈতিক চাহিদাও তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি চলমান এই অচলাবস্থার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন প্রণালিটি এড়িয়ে বিকল্প পাইপলাইন ও রপ্তানির পথ তৈরির পরিকল্পনাও ত্বরান্বিত করছে।