পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যের প্রদর্শন!

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৯ এএম

কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত হবে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) ২৬তম সম্মেলন। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের পর্দা উঠছে আজ রবিবার। সংস্থাটির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে শহরটিতে জড়ো হচ্ছেন বিশ্বের এক ডজন রাষ্ট্রপ্রধান। যাদের মধ্যে রয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। যুক্তরাষ্ট্র-পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে রাশিয়া, চীন ও ইরানের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে এবারের সম্মেলন ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের সম্মেলনকে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ‘ঐক্য’ দেখাতে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করবেন জোটটির নেতারা। কেননা পুতিন এবং জিনপিং অতীতে এসসিও সম্মেলনগুলোকে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি ‘বহুমুখী বিশ্ব’ গড়ার এবং ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রদর্শনের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

বিশকেকের এই সম্মেলনটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন জোটের দুই প্রধান সদস্য দেশ (রাশিয়া ও ইরান) সরাসরি সামরিক যুদ্ধে লড়ছে এবং অন্য সদস্যরা (চীন ও ভারত) যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের কারণে বড় ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধের মুখোমুখি। কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারোভের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় এই পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে পুতিন, শি জিনপিং, পেজেশকিয়ান ছাড়াও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অংশ নেবেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, সম্মেলনের ফাঁকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন শি জিনপিং এবং মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলাদাভাবে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞাকবলিত দুই দেশÑ রাশিয়া ও ইরান তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নজিরবিহীনভাবে জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই মস্কো ও বেইজিংকে ইরানের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করার বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। পুতিন ও পেজেশকিয়ানের এই বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যার মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ গোপনে মস্কো সফর করেছেন। গণমাধ্যমের গুঞ্জন অনুযায়ী, র‌্যাটক্লিফ রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইউক্রেন ও ইরান সংকট নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ঐতিহাসিকভাবে এসসিও মূলত অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর জোর দিলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্কো ও বেইজিংয়ের নেতৃত্বে এটি ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ১০টি স্থায়ী সদস্য ছাড়াও বর্তমানে এই জোটের ১৫টি ‘সংলাপ অংশীদার’ রয়েছে; যার মধ্যে তুরস্ক, সৌদি আরব এবং কাতার অন্যতম। এ ছাড়া আফগানিস্তান ও মঙ্গোলিয়া এই জোটের পর্যবেক্ষক দেশ হিসেবে রয়েছে। এসসিও-র প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে যে, এই গ্রুপটি ‘অন্য কোনো দেশের’ বিরুদ্ধে গঠিত কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক জোট নয়। তবে পুতিন ও জিনপিং প্রায়শই এই মঞ্চ থেকে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিয়ে আসছেন। গত বছরের সম্মেলনেও পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধ উসকে দেওয়ার জন্য পশ্চিমাদের দায়ী করেছিলেন এবং শি জিনপিং ওয়াশিংটনের চাপের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।

চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্বর্ণ, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সম্পদ, বিমান ও সমুদ্র পরিবহন খাতের ওপর দ্বিতীয় স্তরের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যার লক্ষ্য মূলত ইরানি অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া। ওয়াশিংটন ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে। ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ চীন এর জবাবে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা নিজেদের জাতীয় ও বাণিজ্যিক স্বার্থ ‘দৃঢ়ভাবে রক্ষা’ করবে। অন্যদিকে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দীর্ঘ সময় নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা ইরানও জানিয়েছে, তারা অর্থনৈতিক চাপের কাছে মাথা নত করবে না; যদিও তাদের দেশের মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরান ২০২৩ সালে এই ব্লকের পূর্ণ সদস্যপদ পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ হাসান নাজমি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, তেহরান বিশ্বাস করে এসসিও-র মতো জোটে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বড় সাহায্য করবে। তবে এই জোট থেকে ইরান আসলে কতটা সুনির্দিষ্ট সুবিধা পাবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, যেকোনো সংকটের সময়ে এই জোটগুলো ইরানের সমস্যা সমাধানে খুব কমই ভূমিকা রাখতে পেরেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত