প্রস্রাব ঝরে পড়া রোগ নয়, উপসর্গ

ডা মো. নওশাদ আলম

সহযোগী অধ্যাপক,  ইউরোলজি বিভাগ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিস

অ্যান্ড ইউরোলজি

প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারার সমস্যাকে চিকিৎসকরা ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স বলেন। অজান্তে প্রস্রাব ঝরে পড়া বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। পুরুষদের তুলনায় নারীরা এ সমস্যায় বেশি ভোগেন। প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা রোগ নয়, রোগের উপসর্গ। নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব, মাসিক, জরায়ু ফেলে দেওয়া ইত্যাদি কারণে পেলভিক ফ্লোরের মাংসপেশি দুর্বল ও নিচের দিকে ঝুলে পড়ার কারণে এমনটা হয়। পুরুষদের প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড বড় হওয়া, প্রোস্টেট ক্যানসার ইত্যাদি কারণে এ সমস্যা হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে মূত্রথলি ও মূত্রনালির পেশির দুর্বলতা দেখা দেয় এবং প্রস্রাব ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়।

কাদের হয়

যে কারও ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স হতে পারে। অতিরিক্ত ওজন, কিছু স্নায়ুগত রোগ (পারকিনসন, স্ট্রোক, ব্রেইন টিউমার, মাল্টিপল স্কে¬রোসিস স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি), অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, প্রস্রাবের সংক্রমণের কারণেও প্রস্রাব ঝরতে পারে। তবে এসব মানুষের ঝুঁকি বেশি নারী, বয়স্ক মানুষ, ধূমপায়ী, প্রস্রাব ঝরে পড়ার পারিবারিক ইতিহাস, ডায়াবেটিস রোগী, এমএস রোগী, স্থূল ব্যক্তি ও স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষ।

ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্সের ধরন

বিভিন্ন ধরনের ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স রয়েছে স্ট্রেস ইনকন্টিনেন্স, আর্জ ইনকন্টিনেন্স, মিক্সড ইনকন্টিনেন্স, ওভারফ্লো ইনকন্টিনেন্স ও ফাংশনাল ইনকন্টিনেন্স।

স্ট্রেস ইনকন্টিনেন্স : ব্লাডারের ওপর চাপ পড়লে প্রস্রাব ঝরে পড়তে পারে। এটাকে স্ট্রেস ইনকন্টিনেন্স বলে। হাঁসলে, কাশি, হাঁচি দিলে বা কোনো কিছু উত্তোলন করলে এই সমস্যা হতে পারে।

আর্জ ইনকন্টিনেন্স : ব্লাডারের অনৈচ্ছিক সংকোচনে প্রস্রাব ঝরে পড়াকে আর্জ ইনকন্টিনেন্স বলে। এ সমস্যার ক্ষেত্রে সবসময় প্রস্রাব করার জন্য তাড়না অনুভূত হয়ে থাকে, এমনকি আপনি সবেমাত্র বাথরুমে মূত্রত্যাগ করে এলেও। আর্জ ইনকন্টিনেন্স অতি অল্প পরিমাণে প্রস্রাব নির্গমন থেকে শুরু হয় যা আপনি লক্ষ নাও করতে পারেন।

মিক্সড ইনকন্টিনেন্স : স্ট্রেস ইনকন্টিনেন্স ও আর্জ ইনকন্টিনেন্সের সমন্বয়ে প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারার ব্যর্থতাকে মিক্সড ইনকন্টিনেন্স বলা হয়।

ওভারফ্লো ইনকন্টিনেন্স : ব্লাডারে অতিমাত্রায় প্রস্রাব পরিপূর্ণ হলে ব্যক্তির অনিচ্ছায় প্রস্রাব ঝরে পড়তে পারে। এটাকে ওভারফ্লো ইনকন্টিনেন্স বলে। এক্ষেত্রে যথেচ্ছভাবে প্রস্রাব বের হয় কখনো কখনো একটানা ঝরতে থাকে, আবার কখনো কখনো বড় ধরনের প্রবাহ হিসেবে ঝরতে থাকে।

ফাংশনাল ইনকন্টিনেন্স :  ব্লাডারের কাজ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতার কারণে যথাসময়ে প্রস্রাব করতে বাথরুমে যেতে না পারার সমস্যাকে ফাংকশনাল ইনকন্টিনেন্স বলে।

করণীয়

সাইট্রাস ফল, কফি, কার্বনেটেড ড্রিংকস ও অ্যালকোহল বাদ দেওয়া। মূত্রবর্ধক ওষুধ ফিউরোসেমাইড, হাইড্রোক্লোরোথিয়াজাইড, টরসেমাইড ও স্পিরোনোল্যাক্টোনও প্যান্ট ভিজে যাওয়ার কারণ হতে পারে। কোনো খাবার বা পানীয়র প্রভাবে ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স হচ্ছে বুঝতে পারেন। তাহলে ওই খাবার বা পানীয় বাদ  দেওয়া। ওষুধের কারণে হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা। চিকিৎসক বিকল্প ওষুধ অথবা প্রস্রাব ঝরে পড়ার প্রকৃত কারণ শনাক্তকরণের দিকনির্দেশনা দেবেন।

অনেক গর্ভবতী নারীর স্ট্রেস ইনকন্টিনেন্স হয়ে থাকে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে সন্তান জন্মদানের পর অনবরত প্রস্রাব ঝরতে পারে। সন্তান জন্মদানের ছয় সপ্তাহ পরও প্রস্রাব ঝরলে চিকিৎসের কাছে যেতে হবে। বাচ্চা প্রসবের পূর্বে ও পরে পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ ও কেগেল এক্সারসাইজ করলে ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স কমবে। কারণ, এসব এক্সারসাইজ ব্লাডার নিয়ন্ত্রণকারী পেশিসমূহকে শক্তিশালী করে। বয়স্কদের ব্লাডার বা পেলভিক ফ্লোরের পেশিসমূহ দুর্বল এবং প্রোস্টেটের বৃদ্ধি। পেলভিক ফ্লোরের পেশিসমূহের দুর্বলতা কাটাতে আপনার চিকিৎসক পেলভিক ফ্লোর ফিজিক্যাল থেরাপির পরামর্শ দিতে পারেন।

প্রোস্টেটের বৃদ্ধির কারণে প্রধানত দুইভাবে ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স ঘটে। এটি ব্লাডারে চাপ দিয়ে প্রস্রাব নির্গত করায় এবং যা প্রস্রাবের প্রবাহে সাময়িক বাধা দেয়। এবং ওভারফ্লো ইনকন্টিনেন্স ঘটায়। এক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় ওষুধ দেবেন। ওষুধে কাজ না হলে সার্জারি করা লাগতে পারে। গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদান সংক্রান্ত ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্সের মতো মেনোপজাল ইনকন্টিনেন্সেও পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ করলে উপকার পাওয়া যাবে। মূত্রনালির সংক্রমণে পেলভিক এরিয়াতে ব্যথা বা চাপ, প্রস্রাবের সময় ব্যথা ও জ্বালাপোড়া, লাল বা গাঢ় প্রস্রাব ও জ্বর হতে পারে। চিকিৎসক ইউটিআই শনাক্ত করলে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। সাধারণত দুয়েকদিনে উপসর্গ চলে যায়, কিন্তু কারও ক্ষেত্রে ছয়-সাত দিন লাগতে পারে। এই সংক্রমণ দূর হয়ে গেলে প্রস্রাব ঝরে পড়াও থেমে যায়। যারা প্রোস্টেট ক্যানসারের জন্য সার্জারি করেছেন তাদের ৬-৮ শতাংশের দীর্ঘস্থায়ী ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স ছিল। এই ধরনের ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স নিয়ন্ত্রণে রাখতে পানীয় সীমিত করতে হবে, ব্লাডারকে অস্বস্তিতে ফেলে এমন কিছু এড়িয়ে চলতে হবে। কোষ্ঠকাঠিন্যেও প্রস্রাব ঝরে পড়তে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ডায়েটে বেশি করে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার, প্রচুর পানি পান করুন।

বিকল্প হিসেব ব্যায়াম

          সোজা চিত হয়ে শুয়ে দুই হাঁটু ভাঁজ করুন। এবার কোমর ওপরের দিকে ওঠান, ৫ সেকেন্ড ধরে রাখুন এবং ছাড়ুন। এটিও দিনে ৪ বেলা এবং প্রতিবার ১০ থেকে ১৫ বার করুন। আরেকটি ব্যায়ামও করতে পারেন। একটি শক্ত বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে দুই হাঁটু ভাঁজ করুন। এবার দুই হাঁটুর ফাঁকে একটি ফুটবল রেখে এতে চাপ দিন এবং ৫ সেকেন্ড ধরে রাখুন আর ছাড়ুন। পুরো প্রক্রিয়াটি ১০ থেকে ১৫ বার এবং দিনে ৪ বার করুন।

          চেয়ারে বসে একটি ব্যায়াম করতে পারেন। প্রথমে একটি চেয়ারে বসুন। মেরুদ- সোজা রেখে একটু সামনের দিকে ঝুঁকুন। এবার প্রস্রাব ধরে রাখার জন্য দরকারি মাংসপেশিগুলো সংকুচিত করুন। এই অবস্থায় ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড থাকুন। এবার সংকুচিত মাংসপেশি ছেড়ে দিন। পুরো প্রক্রিয়াটি ১০ থেকে ১৫ বার এবং দিনে ৪ বার করুন।