ডাঃ উৎপল কুমার কুন্ডু
অকুলোপ্লাস্টি ও অকুলার অনকোলজি ঢাকা আই কেয়ার হাসপাতাল।
চোখের দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখার পাশাপাশি চশমার বিকল্প হিসেবেও কন্টাক্ট লেন্স এখন বেশ জনপ্রিয়। বিশ্ব কন্টাক্ট লেন্স দিবসের বার্তা হলোÑ দৃষ্টির স্বচ্ছতার সঙ্গে চোখের নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেওয়া। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে কন্টাক্ট লেন্স সুবিধাজনক ও কার্যকর; তবে অসতর্কতায় চোখে সংক্রমণসহ নানা জটিলতা হতে পারে।
কন্টাক্ট লেন্স কী
কন্টাক্ট লেন্স হলো চোখের কর্নিয়ার ওপর পরার স্বচ্ছ বা রঙিন পাতলা লেন্স। এটি মূলত চোখের দৃষ্টির সমস্যা সংশোধনে ব্যবহৃত হয়। কেউ কেউ সাজের অংশ হিসেবেও রঙিন বা কসমেটিক লেন্স ব্যবহার করেন। তবে লেন্স অবশ্যই চোখের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও সঠিক মাপ অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত।
কেন পরবেন
চশমার তুলনায় কন্টাক্ট লেন্স অনেকের জন্য বেশি স্বাচ্ছন্দ্যদায়ক। খেলাধুলা, বাইরে চলাফেরা কিংবা বিশেষ অনুষ্ঠানে সুবিধা দেয়। মুখের স্বাভাবিক সৌন্দর্যও বজায় থাকে। রঙিন লেন্স চোখের চেহারায় পরিবর্তন আনতে পারে। শুধু ফ্যাশনের জন্য প্রেসক্রিপশন ছাড়া লেন্স ব্যবহার করা নিরাপদ নয়।
কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সমস্যা লেন্সের নয়, বরং যারা এই লেন্স ব্যবহার করেন তাদের নিজেদের! চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ এবং লেন্স ব্যবহারের নিয়ম-কানুন ঠিকঠাক না মানার কারণেই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের এক গবেষণায়ও এমন তথ্যই উঠে এসেছে। কিন্তু কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারকারী সবাই কি ঝুঁকিতে আছেন? দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে এই প্রতিবেদন থেকে জেনে নিন কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারের নানা ঝুঁকি এবং সেসব প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সাবধানতা।
ঝুঁকি ও সমস্যা
চোখে কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সংক্রমণ। আর চোখে সংক্রমণের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হলো কেরাটিটিস। ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণুর কারণে এই সংক্রমণ হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ মানেন না বলেই এমন সংক্রমণের শিকার হন বেশির ভাগই। যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৫ ভাগ ব্যবহারকারীই লেন্স খোলা বা পরার আগে হাত ধুয়ে নেন না। অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, মাসে লেন্স ব্যবহারের সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে এক থেকে দেড়গুণ বেশি সময় লেন্স পরে থাকেন অনেকেই। এ ছাড়া, স্বল্প মেয়াদে (দুই সপ্তাহ) ব্যবহারযোগ্য লেন্স দুই থেকে আড়াইগুণ বেশি সময় ধরে ব্যবহার করেন অনেকেই।
ভুলে গেলে চলবে না যে, কন্টাক্ট লেন্স একটা স্পর্শকাতর ‘মেডিকেল ডিভাইস’। স্টেরিলাইজ করা ছোট্ট পাত্রে বিশেষ তরলের মধ্যে রাখা এই লেন্স মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে নিজেই দূষিত হয়ে যেতে পারে। কন্টাক্ট লেন্স পরে ঘুমালে কর্নিয়ায় সংক্রমণ ২০ গুণ বেড়ে যেতে পারে। লেন্স পরা অবস্থায় চোখের পাতা বন্ধ থাকায় কর্নিয়া অক্সিজেন সংকটে পড়ে। এ কারণে জীবাণু মোকাবিলায় দুর্বল হয়ে পড়ে চোখ।
কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারে করণীয়
সব সময়ই লেন্স পরা এবং খোলার আগে অবশ্যই হাত ভালো করে সাবান বা কোনো জীবাণুনাশক দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। হাত ধোয়ার পর হাত শুকিয়ে নিয়ে শুকনো হাতেই লেন্স পরতে বা খুলতে হবে।
কন্টাক্ট লেন্স কখনোই গোসলের পানি বা অন্য কোনো পানিতে ভেজানো ঠিক না। কারণ পানিটা নিজেই সংক্রমিত হয়ে অতি ক্ষুদ্র জীবাণু লেন্সে লেগে থেকে কর্নিয়ার আলসার সৃষ্টি করতে পারে।
গোসল বা সাঁতারের আগে লেন্স খুলে নিতে হবে। এমনকি পানিরোধক ‘ওয়াটার-টাইট গগল্স’ চোখে পরার আগেও লেন্স খুলে নিতে হবে।
ভুলেও কন্টাক্ট লেন্স থুতুতে ভিজিয়ে রাখা যাবে না বা থুতুর সংস্পর্শে আনা যাবে না। কেননা মুখের ভেতর এবং থুতুতে বহু ব্যাকটেরিয়া থাকে। এই ব্যাকটেরিয়ার অনেকগুলোই আমাদের পরিপাকের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও চোখের জন্য নয়।
চোখে আইলাইনার বা মাশকারা ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই আগে লেন্স পরে নিয়ে তারপর চোখের মেকআপ করতে হবে।
আপনার চোখ যদি লালচে হয়ে ওঠে, চোখ যদি জ্বালাপোড়া করতে থাকে, তাহলে দেরি না করে লেন্স খুলে নিন। চোখের চিকিৎসকের কাছে যান। আর সব সময়ই লেন্সের বিকল্প হিসেবে আপনার সঙ্গেই চশমা রাখুন।
অনলাইনে কন্টাক্ট লেন্স কেনার সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু সাবধান। চোখের চিকিৎসকের পরামর্শপত্র অনুযায়ী আপনার জন্য উপযোগী লেন্সের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েই লেন্স কিনুন।