বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৪১ নেতাকর্মীর ন্যায়বিচার এবং এখনও নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীর সন্ধানের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে গুম ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিচারের আওতায় আনা এবং স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
আজ রবিবার (৩০ আগস্ট) বেলা ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ‘গুম ও নিপীড়নের খতিয়ান: ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ ও গুম প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কারের দাবি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, প্রচার সম্পাদক ও ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীর পরিবারের সদস্যরা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শিবির সভাপতি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), ডিজিএফআই, র্যাব, সিটিটিসিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে এসব কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়।
গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে ছাত্রশিবির জানায়, যাচাই-বাছাই শেষে দেশে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংগঠনটির দাবি, এর মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ২৪১ জনই ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী। তবে গুম কমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত ঘটনার বাইরেও গত দেড় দশকে ছাত্রশিবিরের সাত শতাধিক নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন বলে জানান তিনি।
এখনও নিখোঁজ ৭ নেতাকর্মী: সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ছাত্রশিবিরের সাত নেতাকর্মীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তারা হলেন- ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রশিবির নেতা মো. ওয়ালীউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস, ঢাকার হাফেজ জাকির হোসেন, বেনাপোলের রেজওয়ান হোসেন, বান্দরবানের জয়নাল হোসেন, ঝিনাইদহের মু. কামরুজ্জামান এবং কক্সবাজারের শফিকুল ইসলাম।
ছাত্রশিবিরের অভিযোগ, ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রনেতা ওয়ালীউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসকে আশুলিয়ার নবীনগর এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তাদের আর কোনো সন্ধান মেলেনি। ২০১৩ সালের ২ এপ্রিল রাতে ঢাকার শ্যামলীর বাসা থেকে হাফেজ জাকির হোসেনকে সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যায় বলে দাবি সংগঠনটির।
২০১৬ সালের ৪ আগস্ট বেনাপোলের দুর্গাপুর বাজার থেকে রেজওয়ান হোসেনকে প্রকাশ্যে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়। একই বছরের ২৩ অক্টোবর বান্দরবান সদর থেকে জয়নাল হোসেন এবং ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল ঝিনাইদহের লেবুতলা থেকে মু. কামরুজ্জামানকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে র্যাব সদস্য পরিচয়ে শফিকুল ইসলামকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়।
সংগঠনটির দাবি, এসব ঘটনার এক যুগেরও বেশি সময় পার হলেও নিখোঁজ সাতজনের অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে শিবির নেতারা বলেন , নিখোঁজদের সন্ধানের দাবিতে তাদের পরিবার ও সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় থানা, র্যাব কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন, নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা র্যাব সদর দপ্তরে গিয়ে তাদের সন্ধান দাবি করেন। পরে ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর ওয়ালীউল্লাহ, আল মুকাদ্দাস, জাকির হোসেন, জয়নাল আবেদীন, রেজওয়ান হুসাইন ও কামরুজ্জামানের পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়।
ছাত্রশিবিরের দাবি, গুমের পাশাপাশি গত দেড় দশকে তাদের অন্তত ১০১ নেতাকর্মী রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে নিহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নেওয়ার পর অনেক নেতাকর্মীকে নির্যাতন করে পরে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’ এর নামে হত্যা করা হয়েছে। কারও কারও মরদেহ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে দাফন করা হয়েছে।
এ ছাড়া রিমান্ডে নির্যাতন এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও ‘শিবির’ তকমা দিয়ে হয়রানি ও হত্যা করা হয়। এ প্রসঙ্গে বিশ্বজিৎ দাস ও বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের উদাহরণও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। বর্তমানে প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত আইনের খসড়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ছাত্রশিবির।
সংগঠনটির অভিযোগ, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গুমের মতো গুরুতর অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর রাখার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
ছাত্রশিবিরের ভাষ্য, যেসব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুম ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন কাঠামোর মধ্যে তদন্ত পরিচালিত হলে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- গুমের প্রতিটি ঘটনা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীর অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রের স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ, গুম ও হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা, ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন সংশোধন।
এ ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব কমান্ড কাঠামোর বাইরে স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনার পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার দাবিও জানানো হয়।