ছিনতাইকারীর টানে প্রাণ হারানো শিক্ষিকাকে চোখের জলে বিদায়

শেষবারের মতো এসেছেন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, নেই ক্লাসে যাওয়ার তাড়া অথবা শিক্ষকদের প্রতি কোনো তদারকি। হাজিরা খাতায় আর স্বাক্ষর করতে হচ্ছে না। প্রধান শিক্ষকের বসার ঘরে চেয়ার ফাঁকা পড়ে রয়েছে। যে বিদ্যালয়ে ৩৮ বছরের বেশি সময় শিক্ষকতা করতেন সেখানকার মাঠে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে তার নিথর দেহ। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনকে চোখের জলে শেষ বিদায় জানান সহকর্মী আর শিক্ষার্থীরা। প্রিয় শিক্ষককে এভাবে বিদায় দিতে হবে তা কখনো ভাবেনি কেউ।

নিহত শিক্ষক রনজিলার স্বামী আব্দুল মতিন জানান, চোখের চিকিৎসা করাতে শুক্রবার রাত ১২টার দিকে তাকে নিয়ে বাসে বগুড়া থেকে ঢাকায় যান। শনিবার ভোরে রিকশায় ফার্মগেটের ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে যাওয়ার পথে সংসদ ভবন এলাকায় মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি রনজিলার হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দেয়। এ সময় টানাহেঁচড়ার একপর্যায়ে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শনিবার রাতে তার মরদেহ বগুড়ায় পৌঁছায়।

বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায় স্বামী আব্দুল মতিন ও একমাত্র মেয়ে রাইসাকে নিয়ে থাকতেন রনজিলা। চিকিৎসা শেষে ফিরে আসার কথা ছিল, তবে ফিরেছে তার নিথর দেহ। তার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না প্রতিবেশী ও স্বজনরা। একমাত্র কন্যাসহ কাঁদছেন স্বজন, প্রতিবেশী আর শিক্ষার্থীরা।

গতকাল রবিবার বেলা ১১টায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীনের মরদেহ নিয়ে আসা হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। সহকারী শিক্ষক মেহেনাজ আফরীন ও মাছুমা খাতুন জানান, তারা আজ থেকে অভিভাবকহারা হলেন। সবার আগেই আসতেন বিদ্যালয়ে, নিজে ক্লাস নিতেন নিয়মিত। তার এমন চলে যাওয়া তারা মেনে নিতে পারছেন না।

শিক্ষার্থী ইকবাল, রাকিব জানায়, তাদের আদর স্নেহ করতেন, খুব সুন্দর করে পড়া বুঝিয়ে দিতেন।

শিক্ষকের স্বামী আব্দুল মতিন, এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। যেন ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করেন।

তাদের একমাত্র সন্তান নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইসা আক্তার বলেন, আমার মতো আর যেন কেউ এভাবে মা-হারা না হয়। আমি মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার চাই।

রবিবার বাদ জোহর বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রথম জানাজা ও বাদ আসর তরফসরতাজ গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে রনজিলা পারভীনকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, রনজিলা পারভীন ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে তিনি বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হন। ৩৮ বছর তিনি এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন বলে জানা গেছে উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে।

গাবতলী উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক হিসেবে রনজিলা পারভীন ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিবেদিতপ্রাণ। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।

সন্দেহভাজন দুজন গ্রেপ্তার ঢাকায় : জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীর হেঁচকা টানে নিহত স্কুল শিক্ষিকা রনজিলা পারভীন হত্যা মামলার মূল সন্দেহভাজন আসামিসহ দুজনকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে র‌্যাব।

গত শনিবার রাতে রাজধানীর পূর্ব তেজতুরীবাজার এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তারা হলেন মোশারফ হোসেন পনি ওরফে পনি গাজী ওরফে প্যারা পনি ও তার সহযোগী সেড্রিক। এ সময় ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়েছে।

গতকাল রবিবার বিকেলে মোহাম্মদপুর র‌্যাব-২ ব্যাটালিয়ন সদরদপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-২ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মালিক রাকিব’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় ঘটনার দিন মোটরসাইকেল পনি গাজীর হেফাজতে ছিল। এছাড়া নিহতের স্বামী আব্দুল মতিনও ঘটনাস্থলে এই বাইকটি ব্যবহৃত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, গত শনিবার ভোরে প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভিন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীর হেঁচকা টানে রিকশা থেকে ছিটকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়ে মারা যান। ওই ঘটনায় নিহতের স্বামী অজ্ঞাতনামা দুজন ছিনতাইকারীকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, হত্যাকা-ের মূল সন্দিগ্ধ পনি গাজী একজন পেশাদার ছিনতাইকারী এবং একাধিক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি। সে দীর্ঘদিন যাবৎ রাজধানীর তেজগাঁও এবং শেরেবাংলা নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ও ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ বিভিন্ন রকম অপরাধমূলক কর্মকা- করে আসছিল। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে।