বিলেতি গাব

গ্রামের সঙ্গে যাদের নাড়ির যোগ তারা নিশ্চয় ফলটি চেনেন। বিশেষ করে উপকূলীয় জেলাগুলোয় এখনো মোটামুটি সহজলভ্য। বাড়ির আশপাশের বনবাদাড়ে আপনাআপনিই জন্মায়। রাতে বাদুড়ের দল ফল খেয়ে বীজগুলো নিচে ছড়িয়ে রাখে। সে বীজ থেকে সহজেই চারা হয় এবং গাদাগাদি করে বেড়ে ওঠে। নানান বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করেও বেঁচে থাকতে পারে। গ্রামে যতটা পরিচিত ঠিক ততটাই অচেনা শহরে। সম্ভবত গাঁও-গেরামের ফল বলেই খানিকটা অবহেলা। কিন্তু বিলেতি গাব স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। আজকাল অবশ্য বর্ষার শেষ দিকে স্বল্প সময়ের জন্য বাজারেও দেখা যায়।

এ গাছের জন্মস্থান মালয়েশিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া, জাভা ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন উষ্ণম-লীয় অঞ্চল। মালয় উপদ্বীপে এদের কয়েকটি বুনো জাতও পাওয়া যায়। অথচ ফলটির নাম কেন বিলেতি গাব হলো! এমন নামকরণের পেছনে দুটো যুক্তি থাকতে পারে। প্রথমত আমাদের প্রকৃতিতে আরেকটি গাব আছে, যা এখন দেশি গাব নামে পরিচিত। মূলত সে গাব থেকে আলাদা করার জন্যই একটি নতুন নাম দেওয়া। দ্বিতীয়ত ফলটির গায়ের রঙ লালচে বাদামি, বিলেতের মানুষদের গায়ের রঙ সাধারণত এমনই। আবার এক সময় আমাদের দেশে একটা প্রবণতা ছিল যেকোনো কিছুর সঙ্গে বিলেতি নাম জুড়ে দেওয়া। এসবের যেকোনো একটি কারণ হয়তো হতে পারে।

গ্রামে এ ফলের নানামুখী ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কাঁচা অবস্থায় কেউ কেউ সবজি হিসেবে রান্না করে খায়। কেউ কেউ নুন-মরিচ-চাটনি দিয়ে মাখিয়ে খেতে পছন্দ করেন। এই স্বাদটা নারীদের প্রিয়। শিশুরা ভেতরের কোমল আঁটিগুলো বের করে খায়। তা ছাড়া পাকা ফল স্বাদ গন্ধেও অপূর্ব। দেশি গাব এবং বিলেতি গাবের মধ্যে বিস্তর তফাৎ। ঢাকায় রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের প্রধান ফটক এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারসহ অন্য স্থানেও বিক্ষিপ্তভাবে চোখে পড়ে।

বিলেতি গাব মাঝারি আকৃতির চিরসবুজ বৃক্ষ। দশ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। বাকল কালো ও ফাটাফাটা। পাতা বেশ বড়, চকচকে সবুজ। একই গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদাভাবে ফোটে। ফুল ফোটার মৌসুম বসন্ত, ফল পাকে বর্ষায়। ফুল পাকা ফলের মতো মিষ্টি সৌরভ ছড়ায়। ফল ডিম্বাকৃতি বা গোলাকার। কাঁচা ফল সবুজাভ বাদামি, উজ্জ্বল মখমলের মতো ত্বকে আবৃত। পাকা রঙ লোভনীয় লাল। শাস নরম ও সুমিষ্ট। প্রতি ১০০ গ্রাম শাস থেকে ৬০ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। ফল ও বাকল বিভিন্ন রোগের মহৌষধ। কাঠ শক্ত, ঘরের চৌকাঠ ও অন্য কাজে ব্যবহার্য।

লেখক : প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক