শিশুদের স্ক্রিন-জীবন: অভিভাবক নাকি প্ল্যাটফর্ম, কে দায়ী?

রেস্টুরেন্টের টেবিলে বাবা-মা দুজনেই ফোনে চোখ, পাশের চেয়ারে ছোট ছেলেটির হাতে ট্যাব। খাবার এল, কেউ কারও দিকে তাকাল না। এই ছবি এখন ঢাকার প্রায় প্রতিটি পরিবারে চেনা।

আইসিডিডিআরবির নতুন গবেষণা বলছে, ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুরা দিনে গড়ে ৪.৬ ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটায়। সংস্থাটি ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছয়টি স্কুলের ৪২০ জন শিশুর ওপর এই গবেষণা করেছে। ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চে (জেএমআইআর)।

চারজনের মধ্যে তিনজনের বেশি - ৮৩ শতাংশ শিশু - দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত সীমা মাত্র দুই ঘণ্টা। ফলাফল ভয়ংকর। এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশুর চোখের সমস্যা; ৮০ শতাংশের ঘন ঘন মাথাব্যথা। চোখের সমস্যায় আক্রান্তদের ৯৬ শতাংশই সেই দল থেকে, যারা বেশি স্ক্রিনে থাকে। 

যারা বেশি স্ক্রিনে, তারা ঘুমায় গড়ে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টা; সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশুর মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ দেখা গেছে - উদ্বেগ, অস্থিরতা, আচরণগত সমস্যা। ওজনাধিক্য ও স্থূলতাও বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশি।

গবেষকরা বলছেন, রাতের বেলা স্ক্রিন ব্যবহার মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে ঘুমের চক্র নষ্ট করে; দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা শরীরচর্চা কমিয়ে দেয়। আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, দেশের ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু দিনে ছয় ঘণ্টার বেশি স্ক্রিনে থাকে, ৪৮ শতাংশ প্রায় চার ঘণ্টা।

গবেষণার প্রধান লেখক শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেছেন, দেরিতে ঘুম, বারবার মাথাব্যথা, চোখের কষ্ট, খিটখিটে ভাব, বাইরে খেলায় আগ্রহ কমে যাওয়া - এসব লক্ষণ উপেক্ষা করা যাবে না।

এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়। গত নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের আইন পাস করে; গত ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর।

সেখানে প্ল্যাটফর্মগুলোকে ৪৯.৫ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার পর্যন্ত জরিমানার মুখে পড়তে হয়। প্রথম মাসেই ৪৭ লাখের বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলেছে প্ল্যাটফর্মগুলো।

যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের গোপনীয়তা নিয়ে অভিযোগে টিকটক সম্প্রতি ৪০ কোটি ডলারের সমঝোতায় রাজি হয়েছে। ফ্রান্সসহ বেশ কয়েকটি দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোও শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার সীমিত করতে আইন করেছে; ফ্লোরিডায় ১৪ বছরের কম বয়সীদের জন্য পুরোপুরি নিষেধের আইন হয়েছে।

আর ইনস্টাগ্রাম আনা শুরু করেছে এমন ফিচার, যা এক টাচেই রিল বানিয়ে দেয়। শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার লড়াইয়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আরও শক্তিশালী অস্ত্র হাতে নিচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার সংসদীয় তদন্তে এমন সব বাবা-মার সাক্ষ্য এসেছে, যাঁদের সন্তান সোশ্যাল মিডিয়ার বুলিংয়ের শিকার হয়ে নিজের জীবন নিয়েছে। মার্কিন সার্জন জেনারেলও বলেছেন, সোশ্যাল মিডিয়া তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট বাড়াচ্ছে; এ কারণে এতে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা থাকা উচিত।

তাহলে প্রশ্ন: দায়টা কার? অভিভাবকের, প্ল্যাটফর্মের, নাকি রাষ্ট্রের?
সহজ উত্তর: সবার। কিন্তু এত দিন আমরা শুধু বাবা-মাকেই দোষ দিয়ে এসেছি।

আইসিডিডিআরবির গবেষণায় একটি সংখ্যা চোখ কেড়ে নেয়। শিশুরা দিনে ৪.৬ ঘণ্টা স্ক্রিনে, আর তাঁদের বাবা-মাও গড়ে ৩.৯ ঘণ্টা। শিশু শেখে দেখে, উপদেশ শুনে নয়। যে বাবা সারাক্ষণ ফোন হাতে থাকেন, তিনি সন্তানকে বলবেন "ফোন ছেড়ে বই পড়" - সেটা কতটা কার্যকর হবে?

কিন্তু শুধু অভিভাবকের দোষ দিলেও হবে না। এই স্ক্রিনগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা, যেন মনোযোগ আটকে থাকেই। রিল, শর্টস, টিকটক - প্রতিটি ফিচারের পেছনে রয়েছে মনোযোগ-কেন্দ্রিক নকশা।

অস্ট্রেলিয়া যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার মূল বার্তাটিই হলো: দায় প্ল্যাটফর্মের ওপর, অভিভাবকের ওপর নয়। প্ল্যাটফর্মকেই প্রমাণ করতে হবে যে তারা শিশুদের সুরক্ষার যুক্তিসংগত পদক্ষেপ নিচ্ছে।

বাংলাদেশে এ নিয়ে তেমন কোনো আলোচনাই নেই। শিশুদের স্ক্রিন সময় নিয়ে জাতীয় নীতিমালা নেই; স্কুলে ডিজিটাল সাক্ষরতা কতটা শেখানো হয়, সেটাও বড় প্রশ্ন। আমাদের স্ক্রিন-সংস্কৃতির বাস্তবতাও মোটেও সুখের নয়। সম্প্রতি এক শিক্ষিকার একটি নিরীহ রিল ঘিরে যে বিতর্ক ও হেনস্থা হলো, সেটাই বলে দেয় - একটি ভুল পোস্ট, একটি ভাইরাল ভিডিও কত দ্রুত কারও জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। শিশুদের তো প্রশ্নই নেই; বড়রাই যখন এই ঝুঁকির মুখে, তখন শিশুদের জন্য সুরক্ষা কাঠামো কত জরুরি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

নতুন ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন হয়েছে, কিন্তু শিশুদের তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে বাস্তবায়নের কোনো কথা শোনা যায় না। উল্টো দিকে, শহরের খেলার মাঠ কমছে, নিরাপত্তার ভয়ে শিশুদের ঘরের বাইরে পাঠানো যাচ্ছে না; ডিজিটাল মাধ্যমই হয়ে উঠছে একমাত্র বিনোদন। গবেষণাতেই বলা হয়েছে, খেলার জায়গার অভাব ও নিরাপত্তা শঙ্কা শিশুদের স্ক্রিনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তাহলে করণীয় কী? আমরা কিছু পদক্ষেপ নিতে পারি এই সংকটকে মোকাবেলা করতে:
প্রথমত, ঘর থেকে শুরু করতে হবে। রাতের খাবার টেবিলে স্ক্রিন-মুক্ত সময়; বাবা-মা নিজেরা মডেল হবেন; ২০-২০-২০ নিয়ম - প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিনের পর ২০ ফুট দূরের জিনিস ২০ সেকেন্ড দেখা। আইসিডিডিআরবির পরামর্শগুলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া দরকার।

দ্বিতীয়ত, স্কুলে ডিজিটাল স্বাস্থ্য পাঠ্যক্রম। শিশুদের শেখাতে হবে স্ক্রিন কীভাবে ও কতটুকু ব্যবহার করতে হয়। অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষামূলক ব্যবহারের কারণে ইউটিউবকে নিষেধের আওতা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে - এই উদাহরণটা মনে রাখার মতো। শ্রেণিকক্ষ থেকে ফোন সরিয়ে দেওয়া, বিরতির সময় খেলার ব্যবস্থা - এসব ছোট উদ্যোগও বড় ফল দিতে পারে।

তৃতীয়ত, প্ল্যাটফর্মের দায় নিশ্চিত করতে হবে। বয়স-উপযোগী নকশা, অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ, শিশুদের তথ্যের সুরক্ষা - এসব নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। শিশুদের আকর্ষণের জন্য যে সব ফিচার বানানো হয়, তার জবাবদিহি থাকতে হবে। টিকটকের ৪০ কোটি ডলারের সমঝোতা যেমনই হোক, এ বার্তাই দেয় - প্ল্যাটফর্মকে দায় নিতে হয়।

চতুর্থত, রাষ্ট্রীয় নীতিমালা। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে শিশুদের স্ক্রিন সময় নিয়ে জাতীয় নির্দেশিকা দরকার; শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে। অভিভাবকদের জন্যও প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা দরকার - স্ক্রিন কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তা অনেক বাবা-মাই জানেন না। তবে সাবধান, এ আলোচনা যেন প্রযুক্তিবিরোধী হয়ে না ওঠে। স্ক্রিন খারাপ নয়; স্ক্রিন শেখায়, সংযুক্ত করে। ইন্টারনেটই এখন শিশুদের জানালা।

আশার কথা, সমাধানও আছে প্রযুক্তির ভেতরেই। স্ক্রিন টাইম ট্র্যাকিং অ্যাপ, অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ, বয়স-উপযোগী কনটেন্ট ফিল্টার - এসব হাতের নাগালেই। প্রযুক্তি যেভাবে শিশুদের মনোযোগ কেড়ে নেয়, সেভাবেই তা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারও দিতে পারে; দরকার শুধু সচেতন ব্যবহার।

আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ নিজেই বলেছেন, প্রযুক্তি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার সমাধান নয়; দরকার ভারসাম্য। আরেকটি দিকও আছে: ডিজিটাল বৈষম্য। যাদের হাতে স্ক্রিন নেই, তারা পিছিয়ে পড়ছে; যাদের আছে, তারা ডুবছে। সমাধান নিষেধ নয়, সাঁতার শেখানো। যে শিশু স্ক্রিনে পড়াশোনা করে, কোডিং শেখে, সৃজনশীল কাজ করে, সে কিন্তু লাভবান হয়; সমস্যা তখনই, যখন স্ক্রিন মানেই রিল আর গেম।

প্রশ্ন হলো: ঢাকার যে শিশুটি দিনে সাড়ে চার ঘণ্টা স্ক্রিনে, তার জন্য আমরা কী চাই - নিষেধ, নাকি দক্ষতা? আমরা কি তাকে ডিজিটাল সাগরে সাঁতার কাটার স্কিল শেখাব, নাকি সাঁতার না শিখিয়েই শুধু ঢেউয়ের ওপর ছেড়ে দেব? 

 

লেখক: সাদিক মোহাম্মদ আলম

তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও এন্টারপ্রাইজ এআই পরামর্শক 

ই–মেইল: hello@sadiqalam.com