নৌকাবাইচ শুধু আনন্দময় প্রতিযোগিতা নয়, জলের বুকে লেখা আমাদের জন্ম-ইতিহাস। এ হলো বাংলার আদি-স্পন্দন। আর হৃদপিণ্ডের ভিতরে অবিরাম বাজতে থাকা হাজার বছরের ঢোল। যে ঢোলের শব্দে জেগে ওঠে নদী, জেগে ওঠে মাঠ, জেগে ওঠে আমাদের ঘুমন্ত শেকড়।
পৃথিবীর ইতিহাস বলে, সবচেয়ে পুরনো নৌকাবাইচ হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়ার ইউফ্রেটিস নদীর বুকে, তারপর মিশরীয়রা নীল নদের জলে বৈঠা চালিয়েছে। কিন্তু বাংলার বাইচের বয়স কে মাপবে? এই দেশটাই তো নদীর দেশ। বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপের বুকে আমাদের ২৩০টিরও বেশি নদী জালের মতো ছড়িয়ে আছে, শিরা-উপশিরার মতো। নদী যেখানে জীবন, সেখানে নৌকাই তো জীবন, আর জীবনের আনন্দই তো বাইচ।
বাংলায় এর গোড়াপত্তন নিয়ে দুটি জনশ্রুতি আজও হাওয়ায় ভাসে। প্রথমটি জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রাকে ঘিরে— স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকার ছড়াছড়ি, দৌড়াদৌড়ি, হুড়োহুড়ি থেকেই জন্ম নেয় বাইচের আনন্দ। দ্বিতীয়টি আরও কাব্যিক, আরও আবেগময়। আঠারো শতকের শুরুতে এক গাজী পীর মেঘনার এক পাড়ে দাঁড়িয়ে অন্য পাড়ের ভক্তদের ডাকলেন। ঘাটে নৌকা ছিল না। ভক্তরা অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটি ডিঙি নিয়ে মাঝ নদীতে আসতেই নদী ফুলে-ফেঁপে উঠলো, তোলপাড় শুরু হলো। চারপাশের যত নৌকা ছিল, খবর পেয়ে ছুটে এলো। সারি সারি নৌকা একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটলো। সেখান থেকেই বাইচের জন্ম।
আর এই জনশ্রুতির ভিতরেই আসল সত্য লুকিয়ে আছে— বিপদে একসাথে ছুটে আসা, কাঁধে কাঁধ মেলানো। এটাই বাঙালির চিরন্তন ধর্ম।
তারপর এলো মুসলিম যুগ— নবাব-বাদশাহদের স্বর্ণযুগ। তখন নৌকাবাইচ ভীষণ জনপ্রিয় ছিল। অনেকে মনে করেন, নবাবদের নৌ-বাহিনী থেকেই এর গোড়াপত্তন। পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চলে রাজ্য জয় আর রাজ্য রক্ষার প্রধান কৌশল ছিল নৌ-শক্তি। বাংলার বারো ভূঁইয়ারা এই নৌ-বলেই মোগলদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন, বুক চিতিয়ে। মগ ও হার্মাদ জলদস্যুদের দমনে এই রণবহরের ছিপ নৌকাই ছিল প্রধান অস্ত্র, জলের বুকে উড়ন্ত তীর। আজ সেই নৌ-বাহিনী নেই, কিন্তু সেই রণ-তরীর রক্ত-উত্তরাধিকার হয়ে আজও বেঁচে আছে আমাদের বাইচের নৌকা।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে এর জনপ্রিয়তা শহরের অলিতেগলিতেও ছড়িয়ে পড়ে। নবাব পরিবারগুলো বাইচের আয়োজন করতো মহা-সমারোহে, তখন থেকেই সারি গান জনপ্রিয় হতে শুরু করে হৃদয়ে হৃদয়ে। ব্রিটিশ আমলেও সিলেট অঞ্চলে বর্ষার পরে যখন সব জমি পানির নিচে তলিয়ে যেত, থই থই জলে যখন পথঘাট একাকার, তখন লম্বা খেল নাও নিয়ে বাইচ হতো, সাথে বাজতো করতালের ঝংকার।
নৌকাবাইচের একেকটা নৌকাও জীবন্ত কবিতা। এ নৌকা সরু ও লম্বাটে, যেনো জলের বুকে শুয়ে থাকা তীর, যাতে পানি কেটে দ্রুত চলতে পারে, বাতাসের আগে। সামনের গলুইতে আঁকা হয় ময়ূরের মুখ, রাজহাঁসের মুখ, উজ্জ্বল রঙের কারুকাজ, যেনো দুলহানের সাজ। অঞ্চলভেদে এর নাম আলাদা, রূপ আলাদা। ময়মনসিংহ, পাবনা, ঢাকায় চলে সরু কাঠের কোশা আর গোয়েনা, সিলেট, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঐতিহ্যের সারঙ্গি, আর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালীতে সমুদ্র-ছোঁয়া সাম্পান। চলনবিলে এখনো শিমুল, শিলকড়ই, শাল, গামারি, সেগুন কাঠ দিয়ে ৫০ থেকে ১০০ ফুট লম্বা নৌকা বানানো হয়, যেখানে ৭০ জন মাঝি একসাথে বৈঠা চালায়, এক প্রাণ এক সুরে। দুই গলুইয়ে পরানো হয় রুপা বা পিতলের অলংকার, যেনো কনের নাকে নথ।
আর গান? বাইচের প্রাণ হলো গান, আত্মা হলো সুর। মাঝিরা একসাথে গায়— “রঙের নাও রঙের বৈঠা, রঙে রঙে বাও”। এই সারি গান ছাড়া বাইচ হয় না, প্রাণ পায় না। “হেইয়া হো... হেইয়া হো...”। এই ধ্বনি যখন নদীর বুকে পড়ে, তখন মনে হয় বাংলার সমস্ত নদী একসাথে জেগে উঠেছে, ঘুম ভেঙে ডাক দিয়েছে।
বর্ষার শ্রাবণ সংক্রান্তির পর ১লা ভাদ্র থেকে শুরু হতো আসল বাইচের মৌসুম। এক ফসলের হাওরে, যেমন কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ২৪টি বড় জলমহাল শুকনো মৌসুমে সবুজ আর বর্ষায় টইটুম্বুর হয়ে যায়, দিগন্ত জোড়া জলে যখন পথঘাট একাকার, তখন ফসলের ব্যস্ততা শেষে হাওরবাসী পায় বিনোদনের ফুরসত। শুরু হয় ঘেটুগান, যাত্রা আর নৌকাবাইচের পালা। চলতো সারা বর্ষা জুড়ে, টানা কয়েকদিন ধরে শত শত নৌকার অংশগ্রহণে, হাজার মানুষের জয়ধ্বনিতে।
তাই নৌকাবাইচকে যারা শুধু খেলা বলে, তারা ভুল করে, ভীষণ ভুল করে। নৌকাবাইচ মানে শরীরের কাব্য। মাঝির তেল চকচকে পিঠ— যেনো বর্ষার পর রোদে ভেজা কাদামাটি, সোনা-রঙা। তার হাতের পেশি— যেনো শাল কাঠের গুঁড়ি, শক্ত আর নত। তার কণ্ঠ— যেনো মন্দিরের ঘন্টা, দূর থেকে শোনা যায় কিন্তু ছোঁয়া যায় না, বুকের ভিতর বাজে। নৌকার গতি— যেনো অভিমানী প্রেমিকার আঁচল উড়িয়ে চলে যাওয়া। আর জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ— যেনো কাচ ভাঙার মতো স্রোতস্বিনী নদীর নীরব কান্না, তবুও আনন্দের।
নৌকাবাইচ মানে মিলন, মানে ফিরে আসা। যে প্রেমিক সারাবছর বলতে পারেনি ভালোবাসি, সে বাইচের ভিড়ে একটু হাত ছোঁয়ে দেয়। যে বউ অভিমান করে থাকে, সে মাঝির জন্য ঘাটে প্রদীপ জ্বালায়, আঁচল বিছায়। গ্রামের পর গ্রাম এক ঘাটে এসে কোলাকুলি করে। মালিক একা না, পুরো গ্রাম চাঁদা তুলে নৌকার খরচ বহন করে, চাল তোলে, জয়ী হলে গরু-খাসি জবাই দিয়ে মেজবানি করে— এই রেওয়াজ আজও অমলিন, আজও অটুট।
আর আমি যেহেতু বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষা সবুজে ছাওয়া সাভারের ভাকুর্তা গাঁয়ের মানুষ, আমার বাইচের গল্পটা বুড়িগঙ্গা নদীর কালো জলেই লেখা। কালো জল বলছি বটে, কিন্তু এই ধুসর কালোর ভিতরেই আমার সবুজ লুকিয়ে আছে।
আমার ছোটবেলা কেটেছে এই তীরে— যেখানে একদিকে বুড়িগঙ্গার ঘোলা জলের স্রোত, অন্যদিকে সাভার ও কেরানীগঞ্জের বিস্তৃত খোলা মাঠ। দিগন্ত জোড়া ধানক্ষেত, কাশফুলের বন। ভোরবেলায় যখন কুয়াশা ভেদ করে সূর্য উঠতো, তখন মনে হতো নদীর কালো জলেও আকাশ নেমে এসেছে। আকাশের নীল, মাঠের সবুজ, জলের কালো— তিন রঙে মিশে তৈরি হতো আমার পৃথিবী।
এই প্রকৃতির মাঝেই আমি প্রথম দেখেছিলাম নৌকাবাইচ। তখন বর্ষা শেষ, শরতের আকাশ তুলোর মতো সাদা। বুড়িগঙ্গার দুই তীরে তখনও জল থই থই। খোলা মাঠগুলো জলে ডুবে ছোট ছোট দ্বীপের মতো জেগে আছে। সেই জলের বুকে হঠাৎ ঢাকের শব্দ। সবুজ মাঠের আল ধরে, আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছের সারি পেরিয়ে ছুটে আসছে মানুষ। কারো মাথায় লাল গামছা, কারো হাতে বাঁশের লাঠি।
আর নদীর বুকে? সেখানে তখন রঙের উৎসব। লম্বা ছিপ নৌকা, গায়ে রঙিন আলপনা, গলুইয়ে ময়ূরের মুখ। ৭০ জন মাঝি একসাথে বৈঠা ফেলে— হেইয়া হো... হেইয়া হো... তাদের চিৎকারে কেঁপে ওঠে আকাশ, কেঁপে বাতাস, দোলে ওঠে মাঠের সবুজ ঘাস, কম্পিত ডেউ ওঠে বুড়িগঙ্গার কালো জলে। জল কেটে যখন নৌকা ছোটে, পেছনে সাদা ফেনার আলপনা আঁকা হয়, যেনো সবুজ মাঠের বুকে কেউ সাদা চাদর বিছিয়ে দিচ্ছে।
আমি দেখেছি, বাইচের দিনে প্রকৃতিও সাজে নানান রঙে। আকাশ তার সব নীল ঢেলে দেয় নদীর বুকে। মাঠ তার সব সবুজ উজাড় করে দেয় তীরের মানুষের চোখে। বাতাসে তখন নতুন ধানের গন্ধ, পাট পচানোর গন্ধ, কাদামাটির সোঁদা গন্ধ। আর তার সাথে মিশে থাকে সরিষার তেল মাখা মাঝির ঘামের গন্ধ। এই গন্ধটাই আমার কাছে বাংলাদেশ।
আমার কাছে বুড়িগঙ্গা তাই শুধু কালো জল না। এ হলো আয়না। যে আয়নায় আমি আকাশ দেখি, মাঠ দেখি, সবুজ সমারোহ দেখি। যখন শহরের দালানকোঠা আমাকে দম বন্ধ করে দেয়, আমি এই তীরে এসে বসি। দেখি দূরে খোলা মাঠে গরু চরছে, আকাশে চিল উড়ছে, আর নদীর বুকে একটা ডিঙি নৌকা একা একা ভেসে যাচ্ছে। তখন মনে হয়, এই তো আমার শেকড়। এই মাঠ, এই আকাশ, এই জল— এর বাইরে আমি কিছু না।
তাই আমার বাইচের গল্পটা আসলে প্রকৃতির গল্প। সবুজ মাঠ থেকে শুরু হয়ে, নীল আকাশ ছুঁয়ে, কালো জলে এসে মেশে। যেখানে বৈঠার প্রতিটা টানে জেগে ওঠে মাটি, জেগে ওঠে ফসল, জেগে ওঠে আকাশের বিশালতা। এই জন্যই আমি বুড়িগঙ্গার তীর ছাড়তে পারি না। কারণ এখানেই আমার সবুজ আছে, আমার আকাশ আছে, আমার বাইচ আছে, আমার বাংলাদেশ আছে।
এই বুড়িগঙ্গা তো নদী না, এই হলো ঢাকার প্রাণ। মোগলদের যুগেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল সে। এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বাংলার জীবিকা, চলাচল, কৃষ্টি, সভ্যতা। ১৬৪৪ সালে সুবেদার শাহ সুজার প্রধান স্থপতি আবুল কাসিম মধ্য এশিয়ার ক্যারাভান সরাইয়ের আদলে বুড়িগঙ্গার তীরে গড়েছিলেন বড় কাটরা। সেখানেই দরবার বসাতেন শায়েস্তা খাঁ, মীর জুমলারা।
আর বুড়িগঙ্গার সবচেয়ে সুহৃদ ছিলেন সুবেদার মুকাররম খাঁ— তাঁর আমলে নদীর তীরে প্রায় প্রতিদিন বসতো আলোকসজ্জা, নৌকার বুকে জ্বলতো ফানুস বাতি। আরেক সুবেদার ইসলাম খাঁর নিজস্ব বজরা ছিল— নাম ‘চাঁদনী’, যে ঘাটে তা বাঁধা থাকতো তার নামই চাঁদনীঘাট। ১৮৪০ সালে জেমস টেইলর লিখেছিলেন— বর্ষায় বুড়িগঙ্গা ভরে গেলে ঢাকাকে মনে হতো ভেনিস।
এখন আর আমার শৈশবে দেখা সাভারের ভাকুর্তা আর কেরানীগঞ্জের বাহেরচরের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা সেই বুড়িগঙ্গা নদী নেই। যেখানে সাঁতার কাটতাম, খেলা করতাম। গত চারদশকে মাটির ভরাট করে তৈরী করা হয়েছে জনপদ।
তবে এখনো বুড়িগঙ্গার খোলামোড়া ঘাট থেকে ওয়াইজ ঘাট পর্যন্ত অল্প পরিসরে নৌকা বাইচ হয়। যা দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানোর মতোই। এবছরও কয়েকটি বাইচের নৌকা আবারও ‘হেইয়া হো’ ধ্বনি তুললো। দুই তীরে হাজার হাজার মানুষ আনন্দে আত্মহারা হয়ে উপভোগ করছে বুড়িগঙ্গার নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতা। বুড়িগঙ্গা আবারও প্রমাণ করলো, এখনো মরেনি।
বুকের গহীনে হাজার বছরের পুরনো যে ঢোলটা সুপ্ত হয়ে আছে, বৈঠার প্রতিটি ছলাতে সেই ঢোলটাই বেজে ওঠে এখনো।
যে দেশে নদী নেই, সে দেশের গান নেই। যে জাতির নৌকাবাইচ নেই, তার শেকড় নেই। যতদিন পদ্মা বইবে, মেঘনা ডাকবে, যমুনা বইবে বুড়িগঙ্গার মতো মরবে না—যতদিন একজন মাঝি “হেইয়া হো” বলে বৈঠা ফেলবে, ততদিন বাংলায় বেঁচে থাকবে নৌকা বাইচ।
প্রজন্মের হাত ধরে জয় হোক সেই সংস্কৃতির, যে সংস্কৃতি জলের বুকে লিখে রাখে বাংলার নাম—
জয় হোক আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের। আরও জয় হোক নৌকাবাইচের।
সুনাই নদীতে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি ‘তৌহিদী জনতা’র