পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় মাদক নিয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের জেরে গতকাল রবিবার (৩০ আগস্টদ) রাতে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে ও ভাঙচুর চালায়। এর আগে মাদক বিক্রির অভিযোগে তিন তরুণকে আটক করে স্থানীয় একটি বিএনপি কর্মীর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানা গেছে। পরে তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তরের সময়ই হামলা ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে তিনজন গুলিবিদ্ধ এবং বিএনপির এক স্থানীয় নেতাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রবিবার রাত পৌনে আটটার দিকে হঠাৎ ২০ থেকে ২৫ জন লোক আগ্নেয়াস্ত্রসহ এসে দোকানপাট বন্ধ করে দিতে বলে এবং এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। তারা আরও বলেছেন, গুলির শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে মানুষজন ছোটাছুটি করতে থাকে। দোকানদারেরা দোকান বন্ধ করা শুরু করেন। এ সময় গুলিতে কয়েকজন আহত হন।
গেন্ডারিয়ার রেললাইনসংলগ্ন স্বামীবাগ মুন্সিরটেক জামে মসজিদের পাশের গলিতে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় যারা গুলিবিদ্ধ হন তারা হলেন চা-দোকানি আলমগীর (৩৩) এবং আশা আক্তার (২০) ও সিয়াম (১৮)। আশা বাসার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন তার গায়ে গুলি লাগে। সিয়াম খাবার দোকানের কর্মী। দোকানের শাটার বন্ধ করার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। অন্যদিকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে ঢাকা মহানগর বিএনপির (দক্ষিণ) সদস্য ওমর নবী বাবুকে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন মুদিদোকানদার মো. ইদ্রিস (৪৮) গণমাধ্যমকে বলেন, আমি কাস্টমারকে সওদাপাতি দিচ্ছিলাম। হঠাৎ গুলির আওয়াজ শুনি। দ্রুত শাটার লাগিয়ে আমি বের হয়ে চলে যাই। তিনি বলেন, হামলাকারীদের বেশির ভাগের হাতেই অস্ত্র ছিল।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল আটটার দিকে স্বামীবাগ, করাতিটোলা ও মুন্সিরটেক এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। দোকানে বসে প্রবীণ ব্যক্তিরা আগের রাতের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। জানতে চাইলে তাদের বেশির ভাগই কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
কয়েকজন কথা বলতে রাজি হন। তারা বলেন, রবিবার বিকেলে গেন্ডারিয়ার রেললাইনসংলগ্ন করাতিটোলা এলাকা থেকে মো. রাকিব (২২), মো. বিল্লাল (২৫) ও মো. রিফাত (২১) নামের তিন তরুণকে ‘মাদক বিক্রির সময়’ আটক করেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি। পরে তাদের বিএনপির স্থানীয় কর্মী মো. মনির হোসেনের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পুলিশ ডেকে তাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, পুলিশ তিন তরুণকে নিয়ে থানায় যাওয়ার ক্ষেত্রে হামলার আশঙ্কা করছিল। উপস্থিত লোকজন পুলিশকে থানায় পৌঁছে দিতে যায়। এর কিছুক্ষণ পরই ২০ থেকে ২৫ জন তরুণের একটি দল এসে গুলি ছোঁড়া শুরু করে। এ সময় মনির হোসেনের কার্যালয় এবং আশপাশের আরও পাঁচটি দোকানে ভাঙচুর চালানো হয়। হামলার সময় কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে এলাকা অন্ধকার হয়ে পড়লে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন মো. রাজন নামের এক তরুণ। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা যখন মাদক কারবারিদের থানায় দিতে যাই, তখন খবর পাই কার্যালয়ে ভাঙচুর হচ্ছে ও এলাকায় গোলাগুলি হচ্ছে। তখন আমরা সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে এসে হামলাকারীদের ধাওয়া দিই। তারা স্বামীবাগ এলাকার একটি গলিতে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে গুলি চালায়।’
পুলিশ সূত্র জানায়, মাদক নিয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ৪০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য মো. মনির হোসেন ও তার ভাগনে রাসেল মাদক ব্যবসায়ী ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ‘অটো সজলের’ লোকজনকে মারধর করেন। মনির হোসেনও তার কাছে থাকা একটি অবৈধ পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েছেন, বলছে পুলিশ।
গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান খান বলেন, ঘটনাটিতে মামলা হয়নি। ঘটনাস্থল থেকে ২০টি কার্তুজের খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। সিসি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, অপরাধীদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে।
এদিকে সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি দল। তারা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা সিআইডির পরিদর্শক সাইফুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছি। কিছু আলামত সংগ্রহ করেছি। মেজর আলামত পুলিশ আগেই সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে।’
গেন্ডারিয়া এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, ওই এলাকায় মাদকের বিস্তার ঘটেছে ব্যাপকভাবে। মাদক নিয়ে প্রায় মারামারির ঘটনা ঘটে। মাদকসেবীরা ছিনতাইসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত।