বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, জিয়াউর রহমানের দর্শন এবং একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে জাতীয়তাবাদ একটি গভীর ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ধারণা। একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই স্বাধীনতার অর্থ কী, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রটি কীভাবে নিজের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে— এসব প্রশ্নের উত্তরও জাতীয়তাবাদী দর্শনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারিত হয় এমন একটি জাতীয়তাবাদী দর্শনের সঙ্গে, যার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, আত্মমর্যাদাশীল ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। তার রাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ একটি সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক রূপ লাভ করে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামো পায়। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটি তাই কেবল একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয় নয়; এটি রাষ্ট্রের পরিচয়, রাষ্ট্রের স্বার্থ এবং জনগণের আকাক্সক্ষাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, সেই বৃহত্তর বিতর্কের অংশ।

একটি দেশের জাতীয়তাবাদ তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেটি কেবল স্লোগান সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষানীতি, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সামাজিক ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক কাঠামো এবং জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। জাতীয়তাবাদ যদি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে না পারে, সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে না পারে এবং রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদার সঙ্গে দাঁড় করাতে না পারে, তাহলে সেই জাতীয়তাবাদ তার মৌলিক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়। এই কারণেই আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো— বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূল দর্শনকে কীভাবে একটি আধুনিক, কার্যকর ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের ভিত্তিতে রূপান্তর করা যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হয় জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক চিন্তার দিকে। একই সঙ্গে দেখতে হয়, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় সেই দর্শনকে কীভাবে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। জাতীয়তাবাদ মানে শুধু পরিচয় নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থ জাতীয়তাবাদকে অনেক সময় কেবল আবেগের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। পতাকা, ভূখণ্ড, ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ— এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জাতীয়তাবাদের কার্যকর অর্থ আরও বিস্তৃত।

জাতীয়তাবাদ মানে নিজের রাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এর অর্থ অন্য রাষ্ট্রের প্রতি বৈরিতা নয়; বরং নিজের জনগণের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য সার্বভৌমত্বের অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্র তার মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো নিজের জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করে নিজেই গ্রহণ করবে। কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র, কোনো বৈশ্বিক শক্তি, কোনো আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী কিংবা কোনো বহিরাগত চাপ যেন রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করতে না পারে। এই জায়গাতেই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নিহিত। বাংলাদেশ একটি ছোট রাষ্ট্র হলেও তার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত বড়। বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ এশিয়া, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ, আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ এবং সামুদ্রিক সম্পদের কারণে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাংলাদেশের জন্য স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার মৌলিক প্রয়োজন। জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রচিন্তার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশ যেন কারও বিরুদ্ধে নয়, বরং নিজের পক্ষে দাঁড়াতে পারে। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে বাংলাদেশ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই। কিন্তু তার রাজনৈতিক দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য অস্বীকার করা কঠিন— তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচয়কে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তিতে পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছিলেন।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা সেই প্রচেষ্টারই একটি অংশ। এই দর্শনে বাংলাদেশের মানুষকে কেবল একটি ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানে ভূখণ্ড, রাষ্ট্র, জনগণ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। সেই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মৌলিক অর্জন ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। অতএব স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব ছিল সেই স্বাধীনতাকে কার্যকর করা; রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে, সামরিকভাবে এবং কূটনৈতিকভাবে। জাতীয়তাবাদের এই ব্যাখ্যায় মুক্তিযুদ্ধ কোনো অতীতের স্মৃতি নয়; বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। স্বাধীনতার অর্থ শুধু একটি পতাকা পাওয়া নয়। স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতা। স্বাধীনতার অর্থ নিজের অর্থনীতি গড়ে তোলা। স্বাধীনতার অর্থ সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্বাধীনতার অর্থ নিজের সমুদ্রসীমা ও সম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। স্বাধীনতার অর্থ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মর্যাদার সঙ্গে নিজের স্বার্থ তুলে ধরা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে জনগণের রাষ্ট্রকে জনগণের কাছেই জবাবদিহি রাখা।

বিএনপি : একটি রাজনৈতিক দল থেকে একটি রাজনৈতিক দর্শনের বাহক

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠার পেছনে যে রাজনৈতিক দর্শন কাজ করেছে, তার কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়; তার একটি রাষ্ট্রচিন্তা, অর্থনৈতিক দর্শন, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান থাকা প্রয়োজন। বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাকে সামনে রেখে। এই দর্শনের অন্যতম মৌলিক বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থই সর্বাগ্রে। এই নীতির আলোকে রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক হওয়া উচিত অংশীদারত্বের। রাষ্ট্র জনগণের ওপর কর্র্তৃত্ব করার জন্য নয়; জনগণের নিরাপত্তা, অধিকার, মর্যাদা এবং কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য। একটি জাতীয়তাবাদী দল যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের দল হতে চায়, তাহলে তার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে সাধারণ মানুষ। কৃষক কী চান? তিনি চান ন্যায্যমূল্য। শ্রমিক কী চাস? তিনি চান নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য মজুরি। ব্যবসায়ী কী চান? তিনি চান স্থিতিশীল নীতি, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং নিরাপদ বিনিয়োগ। তরুণ কী চান? তিনি চান শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুযোগ। নারী কী চান? তিনি চান নিরাপত্তা, মর্যাদা, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সমান সুযোগ। প্রবাসী কী চান? তিনি চান রাষ্ট্রের সহযোগিতা, সম্মান এবং তার অর্জিত অর্থের নিরাপদ ব্যবহার। একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের সাফল্য তাই পরিমাপ করতে হবে জনগণের জীবনযাত্রার উন্নতি দিয়ে।

জনগণের কল্যাণই জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত পরীক্ষা

রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ। কূটনৈতিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবশেষে রাষ্ট্রের শক্তির মূল উৎস জনগণ। একটি ক্ষুধার্ত, বেকার, হতাশ ও নিরাপত্তাহীন জনগোষ্ঠীর ওপর শক্তিশালী রাষ্ট্র নির্মাণ করা যায় না। জাতীয় নিরাপত্তা এবং মানবিক নিরাপত্তা তাই পরস্পরের পরিপূরক। একজন নাগরিক যদি নিরাপদে তার ব্যবসা করতে না পারেন, তাহলে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দুর্বল। একজন তরুণ যদি যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাজ না পান, তাহলে সামাজিক নিরাপত্তা দুর্বল। একজন কৃষক যদি তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পান, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা দুর্বল। একজন শিক্ষার্থী যদি মানসম্মত শিক্ষা না পায়, তাহলে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের মানবসম্পদ দুর্বল। অতএব, জনগণের কল্যাণকে জাতীয়তাবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি শক্তির ভিত্তি। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে আধুনিক সময়ে কার্যকর করতে হলে তাই একটি নতুন সামাজিক চুক্তি প্রয়োজন যেখানে রাষ্ট্র জনগণের নিরাপত্তা ও সুযোগ নিশ্চিত করবে এবং জনগণ রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান শক্তিতে পরিণত হবে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’: একটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্লোগান এসেছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে স্থায়ী স্লোগান হওয়া উচিত— বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে। এর অর্থ কোনো জাতি, কোনো ধর্ম, কোনো প্রতিবেশী বা কোনো আন্তর্জাতিক শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ নেবে। বন্ধুত্ব থাকবে, সহযোগিতা থাকবে, কৌশলগত অংশীদারত্ব থাকবে, বাণিজ্য থাকবে, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থাকবে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থাকবে; কিন্তু সবকিছুর ভিত্তি হবে পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌম সমতা। একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কখনো আবেগের ওপর নির্ভর করতে পারে না। পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে স্বার্থভিত্তিক। আজ যে রাষ্ট্র বাংলাদেশের বাণিজ্যিক অংশীদার, আগামীকাল সে অন্য কোনো ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। আবার আজ যে রাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্য রয়েছে, আগামীকাল তার সঙ্গে অর্থনৈতিক বা কৌশলগত সহযোগিতা তৈরি হতে পারে। তাই স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে— স্থায়ী জাতীয় স্বার্থ। এই বাস্তববাদী কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই একটি আধুনিক বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত। ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা। বিশ্ব বদলে গেছে। শীতল যুদ্ধের দ্বিমেরু বিশ্ব নেই। এককেন্দ্রিক শক্তির আধিপত্যও আগের মতো নেই। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, ইউরোপ, রাশিয়া, জাপান, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলো সবাই নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করছে। ইন্দো-প্যাসিফিক এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। বঙ্গোপসাগরও আর কেবল একটি সমুদ্র নয়। এটি বাণিজ্য, জ্বালানি, সমুদ্রসম্পদ, যোগাযোগ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অপরিহার্য। বাংলাদেশকে এমন একটি অবস্থান নিতে হবে যেখানে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হবে না। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী এবং দুই দেশের মধ্যে ইতিহাস, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক বাস্তবতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চীন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক কূটনীতির কারণে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশের রপ্তানি ও অর্থনীতির জন্য।

জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অতএব, বাংলাদেশের কূটনীতির মূলনীতি হতে পারে— সবার সঙ্গে সম্পর্ক, কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থে। কূটনীতি ও সমরনীতি— একই জাতীয় নিরাপত্তার দুই স্তম্ভ। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শুধু সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করে না। আবার কেবল কূটনীতির ওপরও নির্ভর করে না। কূটনীতি এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পরস্পরের পরিপূরক। শক্তিশালী কূটনীতি প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চাপ কমাতে পারে। আবার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কূটনীতিকে শক্তিশালী করে। যে রাষ্ট্র নিজের ভূখণ্ড, আকাশসীমা ও জলসীমা রক্ষায় সক্ষম, তার কূটনৈতিক অবস্থানও শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশের জন্য এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের স্থলসীমা দীর্ঘ। বঙ্গোপসাগরে রয়েছে বিশাল সামুদ্রিক এলাকা। সমুদ্রসম্পদ, বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা ক্রমেই জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠছে। সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, তথ্যযুদ্ধ এবং সমুদ্র নিরাপত্তা— এসব এখন আধুনিক প্রতিরক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই বাংলাদেশের সমরনীতি কেবল প্রচলিত অস্ত্র সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।

প্রয়োজন: * আধুনিক গোয়েন্দা সক্ষমতা, *    সাইবার প্রতিরক্ষা, * সীমান্ত নজরদারি, *ড্রোন ও কাউন্টার-ড্রোন সক্ষমতা, * সামুদ্রিক নজরদারি, * আকাশ প্রতিরক্ষা, * স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য সক্ষমতা, *প্রযুক্তিনির্ভর কমান্ড ও কন্ট্রোল এবং সর্বোপরি দক্ষ মানবসম্পদ।

জাতীয় নিরাপত্তা এখন প্রযুক্তিনির্ভর। যে রাষ্ট্র প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকবে, সে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। প্রতিরক্ষা ব্যয় মানেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়। প্রতিরক্ষা নিয়ে একটি ভুল ধারণা আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়— সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি মানেই যুদ্ধের প্রস্তুতি। বাস্তবে এর বিপরীতও সত্য। বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অনেক সময় যুদ্ধ প্রতিরোধ করে। একটি রাষ্ট্র যদি জানে যে অন্য রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিলে বড় ধরনের মূল্য দিতে হবে, তাহলে সংঘাতের সম্ভাবনা কমে। এই ধারণাকে বলা যায় প্রতিরোধক্ষমতা বা deterrence। বাংলাদেশের জন্য প্রতিরোধক্ষমতা মানে কোনো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় যাওয়া নয়। বরং দেশের আকার, অর্থনীতি ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে কেউ সহজ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা না করে। সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে তাই কূটনৈতিক সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। একজন দক্ষ কূটনীতিক, একজন দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা, একজন প্রযুক্তিবিদ, একজন অর্থনীতিবিদ এবং একজন নীতিনির্ধারক— সবাই মিলে আধুনিক জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করেন।

সার্বভৌমত্বের নতুন সংজ্ঞা। একবিংশ শতাব্দীতে সার্বভৌমত্বের ধারণাও বদলেছে। এক সময় সার্বভৌমত্ব মানে ছিল সীমান্ত রক্ষা করা। আজ সার্বভৌমত্বের অর্থ আরও বিস্তৃত। ডেটা কার নিয়ন্ত্রণে? জ্বালানি সরবরাহ কতটা নিরাপদ? খাদ্য উৎপাদন কতটা স্থিতিশীল? বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কতটা শক্তিশালী? দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কোথায়? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার অবকাঠামো কে নিয়ন্ত্রণ করছে? ডিজিটাল তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে? একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি যদি অতিরিক্তভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়, তার রাজনৈতিক স্বাধীনতাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এখন জাতীয় সার্বভৌমত্বের অন্যতম স্তম্ভ। বাংলাদেশকে নিজের খাদ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। বিদেশি প্রযুক্তিও দরকার। কিন্তু বিদেশ নির্ভরতা আর বিদেশি সহযোগিতা এক জিনিস নয়। সহযোগিতা তখনই শক্তি, যখন রাষ্ট্র নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।

অর্থনীতি : জাতীয়তাবাদের বাস্তব ভিত্তি

রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থনৈতিক শক্তি ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রচিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি তাই অর্থনৈতিক সক্ষমতা। একটি দেশের জনগণ যদি কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যেতে বাধ্য হয়, তবে সেটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ব্যর্থতারও একটি লক্ষণ। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই তরুণদের দক্ষতা, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা সক্ষমতায় বিনিয়োগ করতে হবে। বিশ্বঅর্থনীতিতে আগামী দিনের প্রতিযোগিতা হবে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ওপর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজি, সবুজ জ্বালানি— এসব খাতে বাংলাদেশকে প্রস্তুতি নিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি শুধু পোশাকশিল্প বা প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে থাকলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি বাড়বে। প্রয়োজন অর্থনীতির বহুমুখীকরণ। প্রয়োজন উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প। প্রয়োজন সমুদ্র অর্থনীতি। প্রয়োজন কৃষির আধুনিকীকরণ। প্রয়োজন প্রতিরক্ষা শিল্পের নির্বাচিত ক্ষেত্রে দেশীয় সক্ষমতা। প্রয়োজন ডিজিটাল অর্থনীতি। প্রয়োজন গবেষণা ও উন্নয়ন। এগুলো কেবল অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়; এগুলো জাতীয় সার্বভৌমত্বের কর্মসূচি।

তরুণ প্রজন্ম এবং নতুন বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন আজকের তরুণরা। তরুণদের কাছে শুধু রাজনৈতিক সেøাগান যথেষ্ট নয়। তারা জানতে চান, তাদের চাকরি কোথায়? তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ কোথায়? তাদের গবেষণার সুযোগ কোথায়? তাদের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা কোথায়? তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ কোথায়? তাদের মেধা কেন দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাবে?একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে একজন তরুণ বলতে পারেন, ‘আমি এই দেশে আমার ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি।’ এটি অর্জন করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করতে হবে। শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষতা দরকার। শুধু পরীক্ষার ফল নয়, সৃজনশীলতা দরকার। শুধু মুখস্থ শিক্ষা নয়, গবেষণা দরকার। শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। একটি আধুনিক বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে পারে তার তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর বিনিয়োগ।

সবার বাংলাদেশ— অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ

‘বাংলাদেশ সবার’— এই ধারণাটি জাতীয়তাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক রূপ হতে পারে। রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য নয়। রাষ্ট্রের নাগরিকত্বই হবে রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মূল ভিত্তি। ধর্ম, অঞ্চল, পেশা, ভাষাগত বৈচিত্র্য, রাজনৈতিক মত বা সামাজিক অবস্থান— এসবের ঊর্ধ্বে একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রের কাছে সমান হওয়া উচিত। জাতীয় ঐক্য তৈরি হয় জোর করে নয়; ন্যায়বিচার দিয়ে। রাষ্ট্র যখন নাগরিককে নিরাপত্তা দেয়, তখন নাগরিক রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রাখে। রাষ্ট্র যখন আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করে, তখন জনগণ রাষ্ট্রকে নিজের মনে করে। রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকারও রক্ষা করে, তখন গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। এখানেই একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের বড় পরীক্ষা। কারণ জাতীয়তাবাদ যদি বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে তা নিজের শক্তি হারায়। কিন্তু জাতীয়তাবাদ যদি নাগরিকদের একটি অভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অধীনে একত্র করতে পারে, তবে সেটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ঐক্যের ভিত্তি হতে পারে।

গণতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদ

বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং একটি সুস্থ গণতন্ত্র জাতীয়তাবাদকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। কারণ গণতন্ত্র জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানার অনুভূতি দেয়। ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন সম্ভব— এই বিশ্বাস রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রাষ্ট্রকে নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ দেয়। স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে পারে। একটি শক্তিশালী সংসদ নির্বাহী বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। অতএব, জনগণের ক্ষমতায়নই জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের শক্তি। কোনো দল যদি জনগণের নামে রাজনীতি করে কিন্তু জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে, তাহলে সেই রাজনীতি তার নৈতিক ভিত্তি হারায়। জাতীয়তাবাদের প্রকৃত শক্তি জনগণের সম্মতিতে।

তারেক রহমানের নেতৃত্ব এবং ধারাবাহিকতার প্রশ্ন

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বকে যদি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারাবাহিকতার আলোকে দেখা হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত— কীভাবে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দর্শনকে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়। কারণ জিয়াউর রহমানের সময়ের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। তখন ডিজিটাল অর্থনীতি ছিল না। সাইবার যুদ্ধ ছিল না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছিল না। বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বর্তমান মাত্রায় ছিল না। বিশ্বঅর্থনীতি আজকের মতো এত আত্মনির্ভরশীল ছিল না। অতএব অতীতের দর্শনকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করলে চলবে না। প্রয়োজন দর্শনের মূলনীতি ধরে রেখে তার আধুনিক প্রয়োগ। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূলনীতি যদি হয়—বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জনগণের কল্যাণ এবং জাতীয় স্বার্থ— তাহলে একবিংশ শতাব্দীতে তার প্রয়োগ হতে পারে আধুনিক কূটনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে। এখানেই নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা। শুধু অতীতের উত্তরাধিকার বহন করা যথেষ্ট নয়; সেই উত্তরাধিকারকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তুলতে হয়। নতুন কূটনীতির প্রয়োজন। বাংলাদেশের কূটনীতিকে আরও সক্রিয়, বাস্তববাদী এবং অর্থনৈতিকভাবে কেন্দ্রীভূত করতে হবে। রাষ্ট্রদূতাবাসগুলোকে শুধু রাজনৈতিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের হতে হবে— বাণিজ্য সম্প্রসারণের কেন্দ্র, বিনিয়োগ আকর্ষণের কেন্দ্র, প্রযুক্তি সহযোগিতার কেন্দ্র, প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থরক্ষার কেন্দ্র এবং কৌশলগত তথ্য সংগ্রহের কেন্দ্র। বাংলাদেশের প্রতিটি বৈদেশিক সম্পর্কের একটি অর্থনৈতিক মাত্রা থাকা উচিত। কোথা থেকে প্রযুক্তি আসবে? কোথায় বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশ করবে? কোথা থেকে বিনিয়োগ আসবে? কীভাবে দক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিকের বাজার বাড়ানো যাবে? কীভাবে নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়ানো যাবে? কীভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে? কীভাবে সমুদ্র অর্থনীতি কাজে লাগানো যাবে? এই প্রশ্নগুলোকে কূটনীতির কেন্দ্রে আনতে হবে।

ভারত : প্রতিবেশী, কিন্তু সমতার ভিত্তিতে

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সম্পর্ক আবেগ, ইতিহাস এবং ভূগোলের কারণে গভীর। কিন্তু একটি সুস্থ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান ও সমতা। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইবে— এটি স্বাভাবিক। কিন্তু বন্ধুত্ব মানে নিজের জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া নয়। সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ, জ্বালানি এবং জনগণের চলাচল— প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে ভারতের বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগকেও বোঝা দরকার। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিণত নীতি হলো— অন্যের স্বার্থ বোঝা, কিন্তু নিজের স্বার্থ ভুলে না যাওয়া। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক হওয়া উচিত এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে উভয় রাষ্ট্রই নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক স্বার্থকে সম্মান করবে।

চীন : অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কৌশলগত ভারসাম্য

চীন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। অবকাঠামো, শিল্প, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু এখানেও নীতি হওয়া উচিত ভারসাম্য। চীন থেকে বিনিয়োগ আসবে, প্রযুক্তি আসবে, অবকাঠামো সহযোগিতা হবে; কিন্তু বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় থাকবে। বাংলাদেশ কোনো বৃহৎ শক্তির ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঠে পরিণত হতে পারে না। বাংলাদেশের ভূখণ্ড, বন্দর কিংবা অর্থনৈতিক অবকাঠামো কোনো শক্তির বিরুদ্ধে অন্য শক্তির কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হবে— সবার কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়া, কিন্তু নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা।

পশ্চিমা বিশ্ব ও বৈশ্বিক অর্থনীতি

বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি পশ্চিমা বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। বাণিজ্য, শ্রমমান, মানবসম্পদ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, গবেষণা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং বিনিয়োগ— এসব ক্ষেত্রকে কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট রাখতে হবে। কোনো বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক চাপকে অন্ধভাবে গ্রহণ করা যেমন বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তেমনি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। জাতীয়তাবাদী কূটনীতি আবেগপ্রবণ নয়; বাস্তববাদী।

সামরিক আধুনিকায়ন : ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে প্রযুক্তি। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি যৌথ কমান্ড, তথ্য বিনিময় এবং আন্তঃবাহিনী সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের নৌবাহিনীর জন্য সামুদ্রিক নজরদারি ও সমুদ্র নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। বিমানবাহিনীর জন্য আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা, রাডার এবং আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনীর জন্য দ্রুত মোতায়েন, সীমান্ত নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ এবং সাইবার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবচেয়ে বড় সম্পদ থাকবে মানুষ। সেরা প্রযুক্তিও দক্ষ মানুষ ছাড়া কার্যকর নয়। সুতরাং প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের পাশাপাশি সামরিক শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা

আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই অনেক যুদ্ধের ফল নির্ধারিত হয়ে যায় তথ্যের মাধ্যমে। গোয়েন্দা তথ্য তাই জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। সীমান্তে কী ঘটছে? সাইবার জগতে কী হচ্ছে? আঞ্চলিক শক্তিগুলো কী পরিকল্পনা করছে? অর্থনৈতিক ঝুঁকি কোথায়? দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কতটা নিরাপদ? বিদেশি প্রভাবের প্রকৃতি কী? এসব বিষয়ে সময়মতো নির্ভুল তথ্য রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। তবে গোয়েন্দা সংস্থার শক্তি অবশ্যই আইনের মধ্যে থাকতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার নামে নাগরিক অধিকার ধ্বংস করা যায় না। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নিরাপত্তার উদ্দেশ্যই হচ্ছে নাগরিকের নিরাপত্তা।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের অর্থনৈতিক সংস্করণ

একটি আধুনিক জাতীয়তাবাদী অর্থনীতি এমন হবে যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হবে, কিন্তু দেশীয় উদ্যোক্তাকে পিছিয়ে রাখা হবে না। দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে হবে। বন্দর ও লজিস্টিকস আধুনিক করতে হবে। কর ব্যবস্থা সহজ করতে হবে। দুর্নীতি কমাতে হবে। প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে। বিচারব্যবস্থার গতি বাড়াতে হবে। কারণ একজন বিনিয়োগকারী যখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন, তখন তিনি শুধু অর্থনৈতিক লাভ দেখেন না। তিনি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা দেখেন। আইনের শাসন শক্তিশালী না হলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আসে না। আর বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান তৈরি হয় না।

দুর্নীতি : জাতীয় শক্তির সবচেয়ে বড় শত্রু

জাতীয়তাবাদের সবচেয়ে বড় শত্রু বিদেশি শক্তি নয়; দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা। যে রাষ্ট্রে যোগ্যতার পরিবর্তে পরিচয় কাজ করে, সেখানে দক্ষতা ধ্বংস হয়। যে রাষ্ট্রে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, সেখানে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। যে রাষ্ট্রে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়, সেখানে নাগরিকের আস্থা কমে। যে রাষ্ট্রে আইন সবার জন্য সমান নয়, সেখানে জাতীয় ঐক্য দুর্বল হয়। তাই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বাস্তব প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই। এটি কেবল কয়েকজন দুর্নীতিবাজকে গ্রেপ্তারের বিষয় নয়। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে দুর্নীতি করা কঠিন হয়ে যায়। ডিজিটাল সরকারি সেবা, স্বচ্ছ ক্রয়ব্যবস্থা, সম্পদের স্বচ্ছ ঘোষণা, স্বাধীন অডিট, কার্যকর দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার— এ সবের মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ কমাতে হবে। রাষ্ট্রের শক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে আসে। একজন নেতা যত শক্তিশালীই হোন, একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে পারে না। রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। সংসদকে কার্যকর করতে হবে। বিচারব্যবস্থাকে স্বাধীন ও দক্ষ করতে হবে। প্রশাসনকে পেশাদার করতে হবে। নির্বাচনব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা তৈরি করতে হবে। গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে হবে। এটাই দীর্ঘমেয়াদি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রচিন্তার পরিণত রূপ। কারণ আজ যে দল ক্ষমতায়, আগামীকাল অন্য দল ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যায়। জাতীয় প্রতিষ্ঠান থেকে যায়। তাই দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রের স্বার্থকে স্থান দিতে হবে।

একটি নতুন সামাজিক চুক্তি

বাংলাদেশের সামনে এখন প্রয়োজন একটি নতুন সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তির ভিত্তি হতে পারে পাঁচটি স্তম্ভ—

প্রথমত, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়। চতুর্থত, জাতীয় নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রতিরক্ষা। পঞ্চমত, জনগণের মর্যাদা ও কল্যাণ। এই পাঁচটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে না পারলে কোনো রাজনৈতিক দর্শনই পূর্ণতা পাবে না। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। শুধু সামরিক শক্তিও যথেষ্ট নয়। শুধু গণতন্ত্রের কথাও যথেষ্ট নয়। সবগুলোকে একত্রে রাষ্ট্রচিন্তার অংশ করতে হবে।

‘সবার জন্য বাংলাদেশ’— স্লোগান নয়, রাষ্ট্রদর্শন

‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ কথাটি তখনই অর্থবহ হবে, যখন রাষ্ট্রের সুযোগ ও অধিকার নাগরিকের কাছে বাস্তবে পৌঁছাবে। একজন প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক এবং রাজধানীর একজন ব্যবসায়ী— দুজনের রাষ্ট্রের প্রতি প্রত্যাশা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দুজনের নাগরিক অধিকার সমান হওয়া উচিত। একজন পাহাড়ি অঞ্চলের নাগরিক এবং একজন উপকূলীয় এলাকার নাগরিক— তাদের জীবনযাত্রা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও মর্যাদা পাওয়ার অধিকার সমান। একজন প্রবাসী এবং একজন দেশের ভেতরে থাকা নাগরিক— দুজনই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। রাষ্ট্রকে তাই নাগরিককে শ্রেণিবিন্যাস করে নয়, নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণাই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করতে পারে। নতুন প্রজন্মের কাছে জাতীয়তাবাদকে অর্থবহ করা। আজকের তরুণ প্রজন্ম অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাস জানে, কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন আরও বড়। তারা জানতে চায় বাংলাদেশ কোথায় যাবে। তারা বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় চায়। তারা আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার চায়। তারা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা চায়। তারা নিরাপদ শহর চায়। তারা দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান চায়। তারা এমন বাংলাদেশ চায় যেখানে মেধা মূল্য পাবে। অতএব, নতুন প্রজন্মের কাছে জাতীয়তাবাদকে শুধু ঐতিহাসিক আবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। তাদের দেখাতে হবে বাংলাদেশকে ভালোবাসার অর্থ বাংলাদেশকে উন্নত করা।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ মানে হতে পারে—

বাংলাদেশে প্রযুক্তি তৈরি করা। বাংলাদেশে গবেষণা করা। বাংলাদেশের কোম্পানিকে বিশ্ববাজারে নেওয়া। বাংলাদেশের কৃষিকে আধুনিক করা। বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ কাজে লাগানো। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নত করা।বাংলাদেশের তরুণদের বিশ্বমানের দক্ষতা দেওয়া। এভাবেই জাতীয়তাবাদ ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত হবে। স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় শিখিয়েছে— স্বাধীনতা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু স্বাধীনতা রক্ষা করা আরও কঠিন। একটি রাষ্ট্রকে প্রতিদিন তার স্বাধীনতা রক্ষা করতে হয়। কখনো সীমান্তে। কখনো অর্থনীতিতে। কখনো কূটনীতিতে। কখনো প্রযুক্তিতে। কখনো তথ্যের যুদ্ধে। কখনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে। একটি দেশের সার্বভৌমত্ব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ষা হয় না। সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয় যখন রাষ্ট্র তার নিজস্ব অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয় যখন রাষ্ট্র তার জনগণের খাদ্য নিশ্চিত করতে পারে। সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয় যখন রাষ্ট্র তার সীমান্ত রক্ষা করতে পারে। সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয় যখন রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি নিজের স্বার্থ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে পারে। সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয় যখন রাষ্ট্র নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার : ইতিহাস থেকে ভবিষ্যতের পথে

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে যদি শুধু অতীতের স্মৃতি হিসেবে রাখা হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক দর্শনের সম্ভাবনা সীমিত হয়ে যাবে। বরং সেই দর্শনের মূল প্রশ্নগুলোকে নতুন যুগের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তিনি যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা বলেছিলেন, আজ তার সামনে প্রশ্ন— কীভাবে বাংলাদেশ প্রযুক্তিগতভাবে স্বাধীন হবে? কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে? কীভাবে নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে? কীভাবে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পরিচালনা করবে? কীভাবে তরুণদের দেশে ধরে রাখবে? কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করবে? কীভাবে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করবে? কীভাবে রাষ্ট্রকে দুর্নীতিমুক্ত করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে জাতীয়তাবাদের ভবিষ্যৎ। তারেক রহমানের সামনে ঐতিহাসিক দায়িত্ব— তারেক রহমানের নেতৃত্বে যদি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারাবাহিকতা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য থাকে, তাহলে সেই নেতৃত্বের সামনে দায়িত্বও কম নয়। কারণ উত্তরাধিকার দাবি করা সহজ; উত্তরাধিকারকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন। জিয়াউর রহমানের সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল একরকম। আজকের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ বাংলাদেশের অর্থনীতি বৃহত্তর। জনসংখ্যা আরও বেশি শিক্ষিত। তরুণদের প্রত্যাশা বেশি। বিশ্বঅর্থনীতি আরও প্রতিযোগিতামূলক। আঞ্চলিক ভূরাজনীতি আরও জটিল। প্রযুক্তি রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে এসেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে হতে হবে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, অর্থনৈতিকভাবে বাস্তববাদী এবং কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— এটি হতে হবে জনগণকেন্দ্রিক।

বাংলাদেশ কারও প্রতিপক্ষ নয়। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদকে কখনো এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয় যেন বাংলাদেশকে শক্তিশালী হতে হলে অন্য কোনো রাষ্ট্রকে দুর্বল হতে হবে। বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষার অর্থ ভারতের বিরুদ্ধে যাওয়া নয়। চীনের পক্ষে যাওয়া নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাওয়া নয়। পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে যাওয়া নয়। বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষার অর্থ হলো— সব রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের অধীন না হওয়া। এটি একটি পরিণত রাষ্ট্রের নীতি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, যে রাষ্ট্র আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার অংশ নয়; বরং আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বন্দর, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ— এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক সংযোগস্থলে পরিণত হতে পারে।

শক্তিশালী বাংলাদেশ মানে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ

বাংলাদেশকে এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য থাকা উচিত, যেখানে নাগরিক নিজের দেশের পরিচয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। যেখানে একজন তরুণ বিদেশে গিয়ে গর্ব করে বলতে পারেন— আমি বাংলাদেশি। যেখানে একজন প্রবাসী বিনিয়োগের জন্য দেশে ফিরে আসতে আগ্রহী হন। যেখানে একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান ও আইনের ওপর আস্থা রাখেন। যেখানে একজন কৃষক মনে করেন রাষ্ট্র তার পাশে আছে। যেখানে একজন সৈনিক জানেন যে তার রাষ্ট্র তাকে সম্মান করে। যেখানে একজন শিক্ষক জানেন যে তার পেশাকে মূল্য দেওয়া হয়। যেখানে একজন উদ্যোক্তা জানেন যে তার সফলতা রাষ্ট্রেরও সফলতা। এই বাংলাদেশই হতে পারে বাস্তব অর্থে ‘সবার বাংলাদেশ’।

শেষ কথা : বাংলাদেশই হোক রাজনীতির চূড়ান্ত অগ্রাধিকার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু মত, বহু দল, বহু নেতা এসেছে এবং যাবে। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যাবে। বাংলাদেশ থাকবে। এই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণই হওয়া উচিত সব রাজনৈতিক মতের ঊর্ধ্বে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শন সামনে এনেছিলেন, তার মূল শক্তি নিহিত ছিল বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় পরিচয় এবং জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্যে। আজ সেই দর্শনকে নতুন শতাব্দীর বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা দরকার। বাংলাদেশকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু অতীতের গৌরব স্মরণ করলেই হবে না; ভবিষ্যতের জন্য প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। শুধু রাজনৈতিক সেøাগান দিলেই হবে না; অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। শুধু প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ালেই হবে না; প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখলেই হবে না; প্রতিটি সম্পর্ককে বাংলাদেশের স্বার্থে ব্যবহার করতে হবে। শুধু তরুণদের প্রশংসা করলেই হবে না; তাদের হাতে ভবিষ্যৎ তুলে দিতে হবে। শুধু গণতন্ত্রের কথা বললেই হবে না; গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য যদি সত্যিই জনগণের কল্যাণ হয়, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি নীতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার— বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে। বাংলাদেশ কারও উপনিবেশ নয়। বাংলাদেশ কারও কৌশলগত প্রক্সি নয়। বাংলাদেশ কোনো বৃহৎ শক্তির প্রভাব বলয়ের স্থায়ী অংশ নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের মালিক তার জনগণ। এই রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের মালিক তার জনগণ। এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের মালিকও তার জনগণ। সুতরাং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’— এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি হতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদর্শনের ভিত্তি। এমন একটি রাষ্ট্রদর্শন, যেখানে স্বাধীনতা মানে আত্মমর্যাদা; সার্বভৌমত্ব মানে নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা; জাতীয়তাবাদ মানে জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া; কূটনীতি মানে জাতীয় স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা; সমরনীতি মানে যুদ্ধ নয়, নিরাপত্তা ও প্রতিরোধক্ষমতা; অর্থনীতি মানে জনগণের সমৃদ্ধি এবং গণতন্ত্র মানে জনগণের হাতে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিকানা।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে যদি ভবিষ্যতের বাংলাদেশে অর্থবহ করতে হয়, তাহলে সেটিকে অতীতের স্মৃতির মধ্যে আটকে রাখা যাবে না। সেটিকে রূপান্তর করতে হবে একটি আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের কর্মসূচিতে। আর সেই রাষ্ট্রের মূল দর্শন হতে পারে, সবার রাগে বাংলাদেশ নয়, সবার আগে বাংলাদেশ। সবার জন্য বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য বাংলাদেশ। সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য বাংলাদেশ। জনগণের কল্যাণের জন্য বাংলাদেশ। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো দল, কোনো নেতা কিংবা কোনো সরকারই রাষ্ট্রের চেয়ে বড় নয়। রাষ্ট্রই সর্বাগ্রে। আর সেই রাষ্ট্রের নাম— বাংলাদেশ।

লেখক : প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা।