সচেতন মানুষ মাত্রই জানা আছে, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরÑ যেখানে দেশ-জাতির কল্যাণে হিতকর মানুষ গড়ার নিরন্তর প্রয়াস অব্যাহত রাখাই মূল লক্ষ্য। সামগ্রিকভাবে তো বটেই, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আলো-স্বাধীনতা-শিক্ষার পথ সার্বিক স্বার্থ ও প্রয়োজনেই মসৃণ রাখা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ থেকে কত দূরে? এর উত্তর যে প্রীতিকর নয় এর সাক্ষ্য দিচ্ছে ৩০ আগস্ট দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতির কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বাস্তবে। বরং দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের ঘটনা ঘটছে আগের মতোই। অভিজ্ঞতার পরিবর্তে প্রাধান্য পাচ্ছে রাজনৈতিক আনুগত্য। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্কিত শিক্ষকদেরও উপাচার্য পদে আসীন হতে দেখা গেছে ’। প্রতিবেদনের মুখবন্ধটুকুই বলে দিচ্ছে হীনস্বার্থের স্রোতে কীভাবে ক্ষয়ের স্পর্শ লেগেছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে! এটা একটি মাত্র দিক। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, পদাবনতি, ছাত্ররাজনীতির নামে শক্তির মহড়াসহ আরও অনেক বিষয়েই কদাচার-অনাচার-অনিয়মের বহুমুখী অভিযোগ ফিরে ফিরে উঠছে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরেই। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের শীর্ষজন অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগেই যদি নীতিমালা লঙ্ঘিত হয় তাহলে এর বৈরী ছায়া পরিবেশসহ কাক্সিক্ষত অনেক কিছুই গ্রাস করবে এটাই স্বাভাবিক। এমন নজির আমাদের সামনে আছেও। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগসহ যেসব নেতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে তা শুধু অনুতাপেরই নয়, একই সঙ্গে প্রশ্নবোধকও। অব্যাহতিপ্রাপ্তদের ফের নিয়োগ, আর্থিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাহীনদের উপাচার্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করে ব্যক্তি কিংবা মহল বিশেষের লাভালাভের পাল্লা ভারী বা হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণের পথ সুগম করে দেশ-জাতি-প্রজন্মের যে ক্ষতি করা হচ্ছে এর পরিণাম ভয়াবহ হতে বাধ্য। প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার তো বটেই, কোনো কোনো অরাজনৈতিক সরকারের শাসনামলেও উপাচার্য নিয়োগে তাদের ‘ইচ্ছা’-‘অনিচ্ছা’ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। আমরা মনে করি, উপাচার্য শুধু একটি পদই নয়; একজন উপাচার্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তম্ভও। আমরা জানি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গাগুলোর অন্যতম ক্ষেত্র হচ্ছে অর্থ ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের প্রশাসনিক কাঠামো কতটা জটিল তাও সচেতন মহলের অজানা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন অ্যাকাডেমিক দায়িত্ব পালন করলেও প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে বসার জন্য আলাদা দক্ষতা প্রয়োজন, এই সত্যও অনস্বীকার্য। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ভালো হলেই যে ভালো প্রশাসক হবেন এরও কোনো নিশ্চয়তা নেই। একজন উপাচার্যকে প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার প্রয়োজনেই সর্বগুণে গুণান্বিত হতে হবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় দেশ-জাতির আশা-আকাক্সক্ষার নাভিকেন্দ্র হলেও দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিফলনের চারণভূমি। এর ফলে একেকটি উর্বর কেন্দ্র অনুর্বর তো বটেই, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনর্থক হয়েও দাঁড়াচ্ছে। আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শেখার জায়গা নয়; এটি আত্মার অভয়ারণ্যও। ভান্ডারের মতো, যা আবিষ্কারের অপেক্ষায় জ্ঞানে ভরা থাকার কথা সেখানে নীতিহীনতার এত স্বেচ্ছাচারিতা কেনÑ এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষেরই এড়ানোর অবকাশ নেই। নীতিমালাহীনতা কিংবা স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সলিল সমাধি’ কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্ষয়ের স্পর্শমুক্ত করা সরকারের দায়। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদয়ে জীবন পরিবর্তন করার এবং ভবিষ্যৎ গঠনের শক্তি নিহিত। তা যাতে অক্ষয় থাকে এটি নিশ্চিত করতেই হবে। আমাদের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ক্যানভাস অমলিন রাখার সর্বত প্রয়াস জোরদারে মনোযোগ গভীর করা হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের স্বপ্ন আঁকতে পারবে পুষ্টচিত্তে। উপাচার্য থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগে অগ্রাধিকার দিতে হবে স্বচ্ছতা-যোগ্যতা ও দক্ষতার। স্বজনপ্রীতি ও ‘কাগুজে নীতি’ নয়, প্রকৃত অর্থেই বিশ্ববিদ্যালয় যাতে কোনোভাবেই অনাচার-কদাচার-দুরাচারের তৃণক্ষেত্রে পরিণত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক গৃহীত প্রতিটি পদক্ষেপ আত্ম-আবিষ্কারের প্রান্তর উন্মুক্ত করুক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদের স্বপ্নকে বাস্তবের সঙ্গে সংযুক্ত এবং অর্জনযোগ্য করার লক্ষ্য নিয়ে যাতে এগোতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে এবং এ জন্য সবার আগে জরুরি শীর্ষপদটি বিতর্কমুক্ত করা।