ক্ষমা করলে ক্ষমা মেলে

মানুষ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ভুল করে। ভুলের চেয়েও বড় বিষয় হলো ভুলের পর মানুষের অবস্থান। অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসা যেমন মুমিনের সৌন্দর্য, তেমনি অন্যের ভুল ক্ষমা করে দেওয়াও মহৎ চরিত্রের পরিচয়। যে হৃদয় নিজের জন্য আল্লাহর ক্ষমা প্রত্যাশা করে, সে হৃদয় অন্যের অপরাধ ক্ষমা করতেও শেখে। ইসলাম প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা, কঠোরতার পরিবর্তে দয়া এবং বিদ্বেষের পরিবর্তে উদারতাকে উৎসাহিত করেছে। কারণ মানুষ যখন অন্যের ভুল ক্ষমা করে, তখন সে নিজের হৃদয়কে বিদ্বেষের ভার থেকে মুক্ত করে। আর যে বান্দা অন্যকে ক্ষমা করতে শেখে, আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার আশাও তার জন্য আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

মহান আল্লাহর ক্ষমা আমাদের ভাগ্যে রয়েছে, এমন আশা পোষণকারীর উচিত অন্যদের ভুলত্রুটি ও অন্যায় আচরণ ক্ষমা করে দেওয়া। পবিত্র কোরআনে ক্ষমাশীলতাকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। নিজেকে গাফুরুর রাহিম হিসেবে উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা উচ্চ মর্যাদা ও আর্থিক প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন কসম না খায় যে, তারা আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্ত এবং আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। তাদের ক্ষমা করা উচিত এবং দোষক্রটি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি কামনা করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।’ (সুরা নুর ২২)

হজরত ইউসুফ (আ.) তার প্রতি জুলুমকারী ও হিংসা পোষণকারী ভাইদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তার ভাইয়েরা যখন মিসরের গভর্নরে পরিণত হওয়া নবী ইউসুফের কাছে ক্ষমা চায়, তখন তিনি তাদের বলেন, ‘আজ তোমাদের জন্য কোনো তিরস্কার করব না, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি দয়ালুদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু।’

মহান আল্লাহ কেন ক্ষমা করেন? মানুষের দুর্বলতার কারণে ক্ষমা করেন। মহান আল্লাহ জানেন যে, মানুষ দুর্বল এবং ভুল করে। তাই তিনি বারবার ক্ষমা করার কথা বলেছেন। মহান আল্লাহ বান্দাদের প্রচণ্ড ভালোবাসেন এবং চান তারা জান্নাতে প্রবেশ করুক। এ জন্য তিনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। আমাদের করণীয় হলো, কখনো নিরাশ না হওয়া। পাপ যত বড়ই হোক, মহান আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বড়। তাই আমরা কখনো নিরাশ হব না। আমরা আন্তরিকভাবে তওবা করব এবং ভবিষ্যতে পাপ না করার দৃঢ়সংকল্প করব। নিয়মিত ইসতেগফার করব।

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিদিন ৭০ বার বা তারচেয়ে বেশি ইসতেগফার করতেন। আমাদেরও উচিত নিয়মিত ইসতেগফার করা। আমাদের ভালো কাজের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাপের পরিবর্তে নেক আমলের প্রতি মনোযোগী হতে হবে, যাতে অন্তর পবিত্র হয়। মহান আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি চান না, কেউ গুনাহ করে ধ্বংস হোক, বরং সবাই তওবা করে সরল সঠিক পথে ফিরে আসুক। কোরআন ও হাদিসের আলোকে আমরা দেখতে পাই, মহান আল্লাহর রহমতের কোনো সীমা নেই। আমাদের উচিত, সবসময় তওবার পথে থাকা এবং তার ক্ষমার আশা করা।

আর অপরকে ক্ষমা করা দুর্বলতার পরিচয় নয়, বরং এটি আত্মিক শক্তির প্রকাশ। প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যে মানুষ ক্ষমা করতে পারে, সে নিজের প্রবৃত্তির ওপর বিজয়ী হয়। মহান আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং তিনি বান্দাদের ক্ষমাশীল হতে ভালোবাসেন। তাই কেউ ভুল করলে তার অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে ন্যায়সংগত অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি সম্ভব হলে ক্ষমার পথ বেছে নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে নিজের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করতে হবে। মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং অপরকে ক্ষমা করে দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল হলে সমাজে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বাড়ে, আর আল্লাহর ক্ষমা লাভের প্রত্যাশায় অন্তর হয়ে ওঠে আরও নির্মল।

লেখক : ইসলামি গবেষক