ইমাম বুখারি : হাদিসশাস্ত্রের মহীরুহ

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ এএম

হাদিসশাস্ত্রে ইমাম বুখারি (রহ.)-এর অবদান অতুলনীয়। জ্ঞান, স্মৃতিশক্তি, সততা, তাকওয়া ও সাধনায় তিনি ছিলেন তার সময়ের অনন্য ব্যক্তিত্ব। হাদিস সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তার অবদান মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

ইমাম বুখারির পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারি। ৮১০ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুলাই তিনি বুখারা (উজবেকিস্তান) নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইসমাঈল (রহ.) ছিলেন একজন মুহাদ্দিস ও বুজুুর্গ ব্যক্তি।

শৈশবেই ইমাম বুখারি পিতাকে হারান। এরপর মা তাকে লালন-পালন করেন। ছোটবেলা থেকেই তার মেধা ও স্মৃতিশক্তির প্রকাশ ঘটতে থাকে। মাত্র ৬ বছর বয়সে তিনি কোরআন মাজিদ হিফজ করেন। ১০ বছর বয়সে তিনি হাদিসশাস্ত্র অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন। অল্প বয়সেই হাদিস মুখস্থ করা ও সংরক্ষণের প্রতি তার অন্তরে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হয়।

শৈশবে একবার তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। চিকিৎসা করেও যখন তার চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসছিল না, তখন তার মা আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে দোয়া করতে থাকেন। এক রাতে স্বপ্নে তাকে জানানো হয়, তার দোয়া ও কান্নার কারণে আল্লাহ তার সন্তানের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখতে পান, সত্যিই তার সন্তানের চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে এসেছে। আনন্দে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন।

ইমাম বুখারির স্মৃতিশক্তি ছিল বিস্ময়কর। তার সহপাঠীরা ওস্তাদের কাছ থেকে হাদিস শুনে খাতা-কলমে লিখে রাখতেন। কিন্তু তিনি সাধারণত খাতা-কলম নিয়ে বসতেন না। বরং গভীর মনোযোগ দিয়ে হাদিস শুনতেন এবং তা নিজের স্মৃতিতে ধারণ করতেন। এ কারণে সহপাঠীরা তাকে প্রায়ই প্রশ্ন করতেন, তিনি কেন হাদিস লিখছেন না।

একদিন তাদের অনুরোধে তিনি সহপাঠীদের লেখা খাতা নিয়ে আসতে বললেন। ইমাম বুখারি সেগুলো ধারাবাহিকভাবে মুখস্থ শুনিয়ে দিলেন। শুধু তাই নয়, তাদের লেখায় থাকা ভুলত্রুটিও ধরিয়ে দিলেন। এতে সহপাঠীরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। এই ঘটনার পর তার অসাধারণ স্মৃতিশক্তির কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

তার বাল্যকালের আরেকটি ঘটনা হাদিসশাস্ত্রে তার অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় বহন করে। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি ইমাম দাখিলি (রহ.)-এর কাছে হাদিস অধ্যয়ন করছিলেন। একদিন ইমাম দাখিলি একটি হাদিসের সনদ বর্ণনা করার সময় ভুল করেন। বালক বুখারি বিনয়ের সঙ্গে সেই ভুলের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রথমে তার কথা গুরুত্ব না পেলেও পরে মূল কিতাব দেখে শিক্ষক বুঝতে পারেন, বালকটি সঠিকই বলেছে। তখন তিনি তার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করেন।

১৬ বছর বয়সে ইমাম বুখারি বুখারা ও আশপাশের অঞ্চলের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে বর্ণিত বিপুলসংখ্যক হাদিস মুখস্থ করে ফেলেন। একই সঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক ও ওয়াকি ইবনুল জাররাহ (রহ.)-এর সংকলিত হাদিসগ্রন্থও তিনি মুখস্থ করেন। এরপর মা ও বড় ভাই আহমদের সঙ্গে হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যান। হজ শেষে মা ও ভাই ফিরে গেলেও তিনি মক্কা ও মদিনায় থেকে হাদিসের জ্ঞান অর্জনে আত্মনিয়োগ করেন।

জ্ঞানার্জনের জন্য তার সফরের কোনো শেষ ছিল না। কুফা, বসরা, বাগদাদ, সিরিয়া, মিসর ও খোরাসানসহ তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্রে তিনি বারবার সফর করেন। এক হাজারেরও বেশি মুহাদ্দিসের কাছ থেকে তিনি হাদিস শিক্ষা লাভ করেন। কখনো দিনের পর দিন, কখনো রাত জেগে তিনি জ্ঞানচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। জ্ঞান অর্জনের এই অসাধারণ তৃষ্ণাই তাকে হাদিসশাস্ত্রের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

তার স্মৃতিশক্তির খ্যাতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, বিভিন্ন শহরের মুহাদ্দিসরা নানা উপায়ে তার স্মৃতির পরীক্ষা নিতেন। কিন্তু প্রতিবারই তার অসাধারণ জ্ঞান ও স্মৃতিশক্তি তাদের বিস্মিত করত। মুহাদ্দিস ইবন খুযায়মা (রহ.) তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাদিসবিশারদদের একজন হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ইমাম বুখারির সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি সহিহ বুখারি শরিফ। মক্কা মুকাররমার মসজিদে হারামে তিনি এই গ্রন্থ সংকলনের কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর পর তার এই মহৎ কর্ম সম্পন্ন হয়। হাদিস সংগ্রহ, যাচাই ও সংকলনের ক্ষেত্রে তিনি যে শ্রম ও সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন, তা ছিল অসাধারণ। তার সংকলিত গ্রন্থ পরবর্তী যুগের আলেমদের কাছে হাদিসের অন্যতম প্রধান নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে মর্যাদা লাভ করে।

ইমাম বুখারি ছিলেন মহৎ চরিত্রের অধিকারী। দান খয়রাত করা তার স্বভাবে পরিণত হয়েছিল। পিতার কাছ থেকে পাওয়া বিপুল সম্পদ তিনি দরিদ্র মানুষ ও হাদিসের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। নিজের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে। কখনো কখনো সামান্য কিছু বাদাম খেয়েই তিনি সারা দিন কাটিয়ে দিতেন। জ্ঞানের সাধনায় তিনি নিজের আরাম আয়েশের কথা খুব কমই ভাবতেন।

ইবাদত ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে তার জীবন ছিল অনুসরণীয়। তিনি জীবনে কখনো কারও গিবত করেননি। রমজান মাসে নিরবচ্ছিনভাবে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। নফল নামাজ আদায়ের সময় একবার তাকে একটি বিচ্ছু বারবার দংশন করলেও তিনি যে সুরা পড়ছিলেন, তা শেষ না করে নামাজ শেষ করেননি। তার জীবনজুড়ে ইবাদত, পরহেজগারি, দানশীলতা ও আত্মসংযমের অসংখ্য ঘটনা রয়েছে।

জীবনের শেষভাগে তাকে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। বুখারার গভর্নর তার দুই সন্তানকে প্রাসাদে গিয়ে হাদিস শিক্ষা দেওয়ার জন্য ইমাম বুখারিকে অনুরোধ করেন। ইমাম বুখারি এটাকে হাদিসের জন্য অবমাননাকর মনে করেন। তাই এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তী সময়ে কিছু মানুষের ষড়যন্ত্রের কারণে তাকে জন্মভূমি বুখারা ত্যাগ করতে হয়। তিনি সমরকন্দের উদ্দেশে রওনা হন। পথে খারতাংগ নামক পল্লীতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করেন। সেখানেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

৮৭০ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর ঈদের রাতে খারতাংগ পল্লীতে ইমাম বুখারি (রহ.) ইন্তেকাল করেন। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত