প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় পর পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক ঘাঁটি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। গত রবিবার রাতে লারাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র কমান্ডার টিম হকিন্স সিবিএস নিউজকে বলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে রকেটের সাহায্যে মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় লারাক দ্বীপে এ হামলা চালানো হয়েছে। তিনি জানান, তাদের বাহিনী দ্বীপটিতে থাকা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) দুটি লঞ্চারকে (উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা) লক্ষ্যবস্তু করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিক আহত ও নিহত হয়েছেন। তবে আইআরজিসি হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যার কথা জানায়নি।
লারাক দ্বীপটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আব্বাস উপকূলের কাছেই এবং এটি হরমুজ প্রণালির মুখে অবস্থিত। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান বর্তমানে তেলবাহী জাহাজগুলোকে লারাক দ্বীপের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পরীক্ষা করছে। একই সঙ্গে জাহাজগুলোকে পার হওয়ার জন্য ২০ লাখ ডলার করে দিতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি এ হামলাকে ‘ট্রাম্প সরকারের কৌশলগত ও প্রাণঘাতী ভুল’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, শত্রুকে এই ভুল হিসাবের পরিণতি অর্থনৈতিক ও সামরিকÑ দুই ক্ষেত্রেই ভোগ করতে হবে। দ্বীপটিতে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের সংবাদমাধ্যমে আইআরজিসির একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, লারাক দ্বীপে হামলার জবাবে জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের কিং হুসেইন ও আল-আজরাক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি। হামলায় ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে দাবি করে আইআরজিসি বলেছে, ‘কারিগরি অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ স্থাপনা এবং শত্রুর যুদ্ধবিমানের অবস্থান’কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। আইআরজিসি আরও বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার চেষ্টায় শত্রুদের যে হতাশা তৈরি হয়েছে, আগ্রাসন ও অপরাধ চালিয়ে তা সমাধান হবে না। প্রতিটি হামলার বিপরীতে আরও বেশি বিধ্বংসী জবাব দেওয়া হবে।
পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি জানিয়েছে আইআরজিসি। ইরানের ফার্স ও মেহর বার্তা সংস্থা আইআরজিসির এক বিবৃতির বরাতে জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হরমুজ প্রণালির ওপর ‘যুক্তরাষ্ট্রের একটি দূরপাল্লার এমকিউ-৯ ড্রোন’ শনাক্ত করে ভূপাতিত করেছে। পরে ড্রোনটি পারস্য উপসাগরে বিধ্বস্ত হয়।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। অঞ্চলটির আরেক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের জলসীমায় একটি ড্রোন শনাক্ত করা হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, ইরান থেকে এই ড্রোন পাঠানো হয়েছে। ড্রোনটি প্রতিহত করা হয়েছে। গতকাল মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমায় একটি চালকবিহীন আকাশযান (ইউএভি) শনাক্ত করা হয়। সেটি ইরান থেকে এসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমার দিকে এগিয়ে আসছিল। দেশটির বিমানবাহিনী ওই ড্রোন ধ্বংস করেছে।
নতুন করে সংঘাত শুরুর প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতেও। এমনিতেই যুদ্ধের প্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে তেল ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি স্থবির হয়ে পড়েছে। গতকাল সোমবার প্রকাশিত জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী দৃশ্যমান পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা কমে দিনে মাত্র পাঁচটিতে নেমে এসেছে। হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় জাহাজ কোম্পানিগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পণ্য বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এ সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো ছিল ছোট আকারের। এগুলোর মধ্যে দুটি ছিল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) পরিবহনকারী জাহাজ। এর আগে শুক্রবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মোট ১৪টি জাহাজ চলাচল করেছে।