সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়ার সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। দুই দেশই একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে চাপ সৃষ্টির কৌশল বেছে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশ একাধিকবার আলোচনার টেবিলে বসলেও, শান্তিচুক্তির বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ সমাপ্তির লক্ষ্যেÑ রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তাব দেন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস, সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চুক্তি বা সমঝোতার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় র্যাটক্লিফ এবারই প্রথম ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত হলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করতে পুতিনকে রাজি করাতে রাশিয়ার গোয়েন্দা প্রধানরা সাহায্য করতে পারেন কি নাÑতা যাচাই করাও র্যাটক্লিফের এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। গত মঙ্গলবার মস্কোতে এক গোপন সফরে যান র্যাটক্লিফ এবং সেখানে তার রুশ সমকক্ষÑ এসভিআর বৈদেশিক গোয়েন্দাপ্রধান সের্গেই নারিশকিন এবং এফএসবি পরিচালক আলেকজান্ডার বোর্তনিকভের সঙ্গে বৈঠক করেন। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলা হয়েছে, র্যাটক্লিফ বোর্তনিকভকে যুদ্ধ পরিস্থিতির ‘একটি হতাশাজনক মূল্যায়ন’ দিয়েছেন এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগে রাশিয়াকে একটি চুক্তিতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। র্যাটক্লিফ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, বোর্তনিকভ একজন গঠনমূলক ব্যক্তি যিনি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুনরায় চালু করতে সাহায্য করতে পারেন। তবে সিআইএ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসন আগেও এ ধরনের উদ্যোগের কথা ভেবেছে। জেলেনস্কি এতে সম্মতি জানালেও পুতিন প্রত্যাখ্যান করেছেন। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মস্কোতে র্যাটক্লিফের আলোচনা এবং ত্রিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকের এই প্রস্তাব সম্পর্কে জেলেনস্কিকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন কী করা দরকার এবং কী অর্জন করা আবশ্যকÑসে বিষয়ে একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা পুতিনের উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং জানিয়েছেন, তাদের কাছে এমন গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যা নির্দেশ করে পুতিন যুদ্ধের বিস্তৃতি ঘটানোর পরিকল্পনা করছেন। জেলেনস্কির উপ-চিফ অব স্টাফ পাভলো পালিসা সাংবাদিকদের বলেছেন যে, পুতিন তার সামরিক বাহিনীকে উত্তর ইউক্রেনে অভিযানের জন্য বেশ কয়েকটি কৌশলগত রূপরেখা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে কিয়েভ ও চেরনিহিভকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলতে থাকা আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। গত কয়েক মাসে হোয়াইট হাউজের দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার রুশ ও ইউক্রেনীয় আলোচনাকারীদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন। কিন্তু তাতে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। জেলেনস্কির চিফ অব স্টাফ কিরিলো বুদানভ সম্প্রতি স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার সঙ্গে স্থগিত আলোচনা আগামী সেপ্টেম্বরে আবার শুরু হতে পারে।
বড় হামলার প্রস্তুতি রাশিয়ার : গতকাল রবিবার রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিশাল হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাশিয়ার বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এদিকে, কিয়েভের উপকণ্ঠে শনিবার গভীর রাতে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ জনে। আহত হয়েছে আরও ৪২ জন। কিয়েভ অঞ্চলের গভর্নর তিমুর তাকাচেঙ্কো টেলিগ্রামে বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বুচা জেলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৭ হয়েছে। ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারী ও সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থা কাজ করছে বলে জানান তিনি। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দিমিত্রিভস্কা গ্রামের মেয়র তারাস দিদিচও রয়েছেন।
কিয়েভের পশ্চিম উপকণ্ঠের কাছে মিলা শহরের একটি গুদামে রুশ ড্রোন আঘাত হানে। সেখানে গোলাবারুদ রাখা ছিল। হামলার পর ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটে। এতে বড় ধরনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সামরিক প্রশাসনের প্রধান তাকাচেঙ্কো বলেন, হামলায় অন্তত ৫০টি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুনে বেশ কয়েকটি বাড়ি ও রেস্তোরাঁয় ছড়িয়ে পড়ে। ইউক্রেনের কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন, গুদামটিতে ‘বিস্ফোরক সামগ্রী’ রাখা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় ফৌজদারি তদন্ত শুরু করা হচ্ছে।