সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্য আর্থিক সুবিধা পুনর্নির্ধারণ করে নবম জাতীয় বেতন-স্কেল (পে-স্কেল) ২০২৬ অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন বেতন-স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। বর্ধিত এ বেতন পরিশোধ করতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। বর্তমান ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গতকাল মন্ত্রিসভা বৈঠকে জাতীয় বেতন-স্কেল ২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন বেতন-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। এ দুই (সামরিক ও সিভিল প্রশাসন) নতুন বেতন কাঠামোয় সরাসরি ৩৩ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরিবার সুবিধাভোগী হবে। নতুন বেতন-স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে ধরা হবে। তবে এটি বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে দুই অর্থবছরে।
তথ্য অধিদপ্তরের সভাকক্ষে গতকাল সন্ধ্যায় মন্ত্রিসভার বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি। মূলত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নবম জাতীয় পে-স্কেলের সুপারিশ করা হয়। ওই সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গত ২১ জুলাই বর্তমান সরকার একটি সচিব কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির সুপারিশেই গতকাল অনুমোদন দিল মন্ত্রিসভা। এর আগে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫ নিজ নিজ প্রতিবেদনে বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকশেষে মন্ত্রিপরিষদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় বেতন-স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার থেকে শতভাগ বাড়িয়ে সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। একজন সচিব প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা।
ব্রিফিংয়ে নাসিমুল গনি বলেন, ‘ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত সুপারিশের তুলনায় কমানো হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এ সম্পর্কিত গেজেট প্রকাশ হবে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহারে সরকার সামরিক ও বেসামরিক ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এ পদ্ধতি একসঙ্গে বাস্তবায়নে বিপুল আর্থিক ব্যয়ের সক্ষমতা এবং ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া অসামরিক কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় সব তথ্য না থাকায় তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত লাগতে পারে।’
এর আগে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অবসরভোগী পেনশনধারীদের নিট পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৬৫ শতাংশ। ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৬০ শতাংশ। ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৫৫ শতাংশ। এর ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ বেশি হবে।
দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন : নতুন বেতন-স্কেল একসঙ্গে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর কারণ হিসেবে বেতন-স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ এবং আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বেতন-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
মূল বেতন চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। আর বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর হবে।
প্রথমবার প্রতিবন্ধী সন্তান হলে ভাতা : নতুন বেতন-স্কেলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসিক তিন হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে।
মোবাইল ফোন ভাতা পাবেন সবাই : ডিজিটাল যোগাযোগ ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ফোন ভাতার আওতা বাড়ানো হয়েছে। এতদিন কেবল পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা এই ভাতা পেতেন। নতুন বেতন-স্কেলে সব গ্রেডের কর্মচারী ভাতা পাবেন। পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও একইভাবে ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে।
জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য আলাদা কমিটি গঠন : জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতন-স্কেল অনুমোদন করা হবে। সেটিও চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে জাতীয় বেতন-স্কেলের মতো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। সরকার মনে করছে, পর্যায়ক্রমে বেতন-স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা প্রশমিত করা সম্ভব হবে।
উপকৃত হবে ৩৩ লাখ পরিবার : নতুন বেতন-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সরকারের দাবি, মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে। সরকার মনে করছে, নতুন বেতন-স্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জাতীয় বেতন-স্কেল ২০২৬ বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। এসব নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিস্তারিত বিধান থাকবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে অনুমোদিত বেতন-স্কেল যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
নাসিমুল গনি বলেন, ‘গত ১২ বছর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়নি। তাদের মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার এই পে-স্কেল দিয়ে গেছে। এটা আমরা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারব না। সরকারের সেই আর্থিক সক্ষমতা নেই।’
ব্লক সুপারভাইজারদের কর্মস্থল : মন্ত্রিসভা এদিন কৃষি বিভাগে কর্মরত ব্লক সুপারভাইজারদের কর্মস্থল নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন থেকে ব্লক সুপারভাইজাররা নিজ নিজ জেলায় বদলি হতে পারবেন। তারা নিজ বাসস্থানের এলাকাতেই পোস্টিং নিতে পারবেন।