এইচআইভিকে প্রচলিত স্বাস্থ্যসেবায় আনার প্রস্তাব

এইচআইভি-সেবা বা হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (এইচআইভি) বিষয়ক স্বাস্থ্যসেবা আলাদাভাবে দেওয়ার বদলে বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবায় অন্তর্ভুক্ত করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। তাই এইচআইভিকে আলাদা রোগ হিসেবে না দেখে অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে দেখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্রাজিলের রিওডি হেনেইরোতে অনুষ্ঠিত ২৩তম আন্তর্জাতিক এইডস সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে।

গত ২৬ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সম্মেলনে এইচআইভি-মোকাবিলায় নতুন আশার বার্তা, অর্থ সংকটে সেবা বন্ধ, বছরে দুবার ইনজেকশন, সপ্তাহে একবার ওষুধ, এআই ও ভ্যাকসিন গবেষণায় অগ্রগতিসহ এইচআইভিকে প্রতিরোধ ও এইচআইভির চিকিৎসায় বৈজ্ঞানিক সাফল্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল এইডস সোসাইটির (আইএএস) আয়োজনে এবারের সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন দেশের গবেষক, চিকিৎসক, নীতিনির্ধারক, কর্মী ও কমিউনিটি প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে ১৫০টির বেশি সেশন ছিল এবং ২৪০০ পোস্টার ও গ্লোবাল ভিলেজে ২২০টি কার্যক্রমের তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এবারের সম্মেলনের মূল বার্তা ছিল ‘রিথিংক, রিবিল্ড, রাইজ বা পুনর্বিবেচনা, পুনর্গঠন ও ঘুরে দাঁড়ানো।’

সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে একাধিক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয় এইচআইভি-চিকিৎসাকে অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সমন্বিত করায় রোগীদের চিকিৎসার ফল ভালো হচ্ছে।  দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার মানুষের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসায় বিরতি ও ভাইরাসনিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা টিবির ঝুঁকি বাড়ায়। মোজাম্বিকে জরায়ুমুখের ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের সঙ্গে এইচআইভি পরীক্ষা যুক্ত করায় ২০২৫ সালে নতুন এআরটি গ্রহণকারীদের ৭ দশমিক ৩ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে। বতসোয়ানায় এইচআইভি ক্লিনিকের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা যুক্ত করেও রোগীদের আস্থা ও সেবার মান বাড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এইচআইভি, যৌনতাজনিত সংক্রমণ, জরায়ুমুখের ক্যানসার ও হেপাটাইটিসের সমন্বিত পরীক্ষাও রোগী শনাক্তকরণ ও সেবাগ্রহণ বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ‘এইডস ২০২৬’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এইচআইভিকে আলাদা রোগ হিসেবে না দেখে অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করা।

সম্মেলনে জানানো হয়, এইডস ২০২৬-এর গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় নানা প্রভাব দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক অর্থসহায়তায় বড় ধরনের বিঘœ ঘটনানোয় এইচআইভি-সেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সম্মেলনে উপস্থাপিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট’স ইমারজেন্সি প্লান ফর এইসি রিলিফ (পিইপিএফএআর) পালস স্টাডিজ ৪৬টি দেশের ১৬৬টি বাস্তবায়নকারী অংশীদারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন ও নীতির পরিবর্তনের কারণে ১ হাজার ৭০০টির বেশি ক্লিনিক ও অন্যান্য সেবাকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। এসবের বড় অংশ পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব পড়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় পিইপিএফএআরের সহায়তাপ্রাপ্ত ৮ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী চাকরি হারিয়েছেন। জিম্বাবুয়েতে প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ পদ ঝুঁকিতে পড়েছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পিআরইপিগ্রহণের হার ৩১ থেকে ৬৪ শতাংশ কমেছে। পুরুষের স্বেচ্ছা-খৎনা কমেছে ৬৫ থেকে ৮৮ শতাংশ এবং কনডম বিতরণ কমেছে ৫০ শতাংশের বেশি। নাইজেরিয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সেবাগ্রাহক মানুষের সংখ্যা কমেছে ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ। এইচআইভির জন্য স্বপরীক্ষণ কমেছে ৭০ দশমিক ২ শতাংশ এবং ওই জনগোষ্ঠীর পিআরইপি গ্রহণ করার হার কমেছে ৮৩ শতাংশ।

কাইজার ফ্যামেলি ফাউন্ডেশন (কেএফএফ) এবং ইউএনএইডসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এইচআইভি-মোকাবিলায় দাতা সরকারের অর্থায়ন ২৫ শতাংশ কমেছে।

অন্যদিকে, দেশীয় অর্থায়ন বেড়েছে ৪ শতাংশ এবং মোট এইচআইভি-অর্থায়নের প্রায় ৬০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে আসছে। ইউএনএইডসের নির্বাহী পরিচালক উইনি বিয়ানিমা সম্মেলনে বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করার যুগ শেষ হয়ে গেছে। সরকারগুলোকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিনিয়োগ করার সুযোগ দিতে ঋণ পুনর্গঠন করতে হবে।’

সম্মেলনে জানানো হয়, এইচআইভি-প্রতিরোধে এইডস ২০২৬-এর সবচেয়ে আলোচিত অগ্রগতিগুলোর একটি লেনাক্যাপাভির। বছরে দুবার ইনজেকশন গ্রহণের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ পদ্ধতি বিষয়ক গবেষণায় কার্যকরী ফল পাওয়া গেছে। পারপাস-১ এবং পারপাস-২ ট্রায়ালে আটটি দেশের ৯৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী লেনাক্যাপাভিরের ব্যবহার অব্যাহত রাখতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতির প্রতি মানুষের আগ্রহের প্রধান কারণ প্রতিদিন ওষুধ খাওয়ার চাপ না থাকা। সাশ্রয়ী মূল্যে মানুষের কাছে এটি পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৮ সালের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের কাছে লেনাক্যাপাভির পৌঁছানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়। তবে এ সংখ্যা এখনো খুব কম।  ব্রাজিলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলেক্সান্দ্রে পাদিলহা বলেছেন, ‘বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন সত্তেও তা মানুষের নাগালের বাইরে থাকলে উদ্ভাবনের কোনো অর্থ থাকে না।’

শিশুদের চিকিৎসায় বিপরীত চিত্র : শিশুদের ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগ রয়েছে। আট সপ্তাহ পরপর দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি ইনজেকশন ৪৭৬ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর প্রতিদিনের ওষুধের চেয়ে ভালো ফল দিয়েছে এবং তারা এটিকে বেশি পছন্দ করেছে। কিন্তু পিইপিএফএআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ অর্থবছরে চিকিৎসাধীন এইচআইভির শিশু ৭৭ হাজার ১৬৩ জন কমেছে, অর্থাৎ ১৪ শতাংশ কমেছে। বিজ্ঞানের নতুন চিকিৎসা সামনে এলেও অর্থায়নের ঘাটতি শিশুদের মতো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেই সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে।

সপ্তাহে একবারের চিকিৎসাও আসছে : এইচআইভি-চিকিৎসায় প্রতিদিন ওষুধ খাওয়ার চাপ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। এইডস ২০২৬-এর আইসল্যান্ড-১ ও আইসল্যান্ড-২ ট্রায়ালের বিস্তারিত ফল প্রকাশ করা হয় প্রথমবারের মতো। ইসøাট্রাভির এবং লেনাক্যাপাভিরের সমন্বিত এই ওভার ট্রিটমেন্ট সপ্তাহে মাত্র একবার গ্রহণ সুযোগ তৈরি করেছে। ফেইজ-৩ গবেষণায় এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকার ১২০০-এর বেশি এইচআইভি-আক্রান্ত মানুষ অংশ নেন। দেখা গেছে, ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে থাকা মানুষের ক্ষেত্রে সপ্তাহে একবারের এ চিকিৎসা কার্যকরী ও সহনীয়। অর্থাৎ এইচআইভি চিকিৎসা প্রতিদিনের বড়ি থেকে ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি ও গ্রহণযোগ্য চিকিৎসার দিকে এগোচ্ছে।

নিরাময়ের আশাও বাড়ছে : এইচআইভির দীর্ঘস্থায়ী রিমিশনের (রোগের সক্রিয়তা কমে যাওয়া বা নিয়ন্ত্রণে থাকা) নতুন ঘটনাও গবেষকদের আশাবাদী করছে। এইডস ২০২৬-এর রিমিশনে থাকা দুজন ব্যক্তির তথ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জানানো হয়েছে, একজন ব্যক্তি সিসিআরফাইভ ডেল্টা৩২/ডেল্টা-৩২ স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের পর ১৪ মাস ধরে চিকিৎসা ছাড়াই রিমিশিনে রয়েছেন। জার্মানির এসেন শহরের আরেক ব্যক্তির স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের পর রিমিশনের ফলও উপস্থাপন করা হয় সম্মেলনে।

ব্রডলি নিউট্রাইলাইজিং অ্যান্টিবডিস (বিএনঅ্যাবস) বা নিষ্ক্রিয়কারী এন্টিবডি নিয়ে গবেষণাও চলছে। এগুলো প্রচলিত এন্টিরেট্রোভাইরাল বা রেট্রোভাইরাসবিরোধী ওষুধের মতো শুধু ভাইরাসকে দমন না করে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সরাসরি কাজে লাগানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে।

ভ্যাকসিন গবেষণায় নতুন পথ : এইচআইভির কার্যকরী ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চলছে। এইডস ২০২৬-এ সেই গবেষণার বিষয়েও অগ্রগতির খবর এসেছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সঠিক ক্রমে ভ্যাকসিনের ডোজ প্রয়োগের মাধ্যমে এমন অ্যান্টিবডি তৈরিকারী কোষকে প্রকৃত সুরক্ষামূলক লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করা সম্ভব হতে পারে।

অন্য এক গবেষণায় এইচআইভির বাইরের প্রোটিনের ছোট একটি অংশ ভ্যাকসিন থেকে বাদ দেওয়ার পর বানরের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি ৮০ শতাংশের বেশি কমেছে। আরেক গবেষণায় এআরএনএ-প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইঁদুরের মধ্যে শক্তিশালী অ্যান্টিবডি ও টি-সেল প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এসব গবেষণা মানবদেহে ভবিষ্যৎ পরীক্ষার পথ তৈরি করছে।

এইচআইভি মোকাবিলায় আসছে এআই : এইচআইভি শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। চীনে এইআই চালিত সেল্ফ টেস্টিং ডিভাইস পরীক্ষার ফল পড়ে তা ক্লাইডে পাঠাতে পারে। ১৭টি প্রদেশে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো এ পদ্ধতিতে নতুন সংক্রমণ আরও দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। নাইজেরিয়ার নদীবেষ্টিত নাইজার ডেল্টা অঞ্চলে আবার ড্রোনের মাধ্যমে এআরটি ওষুধ, পরীক্ষার যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ৩০ জন শিশু ও কিশোর-কিশোরীর ক্ষেত্রে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার সাফল্যের হার ছিল ১০০ শতাংশ। প্রযুক্তি নতুন দরজা খুলছে।

এইচআইভি-মোকাবিলায় কমিউনিটির নেতৃত্বাধীন কার্যক্রমের কার্যকারিতাও সম্মেলনে গুরুত্ব পেয়েছে। ব্রাজিল, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও লেসোথোর কমিউনিটিগুলো এখন শুধু সেবাগ্রহণকারী নয়। বরং পেটেন্ট-বাধা মোকাবিলা, সেবার মান পর্যবেক্ষণ এবং অধিকার লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এইডস ২০২৬-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো এইচআইভি মোকাবিলায় বিজ্ঞান এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী, কিন্তু অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা দুর্বল হলে বিজ্ঞান মানুষের জীবন বদলাতে পারবে না।

এখন একদিকে বছরে দুবারের প্রতিরোধী ইনজেকশন, সপ্তাহে একবারের চিকিৎসা, এআই, নতুন ভ্যাকসিন কৌশল এবং এইচআইভি রিমিশনের সম্ভাবনা। অন্যদিকে ক্লিনিক বন্ধ, স্বাস্থ্যকর্মীর চাকরি হারানো, শিশুদের চিকিৎসা কমে যাওয়া এবং প্রতিরোধমূলক সেবা সংকুচিত হওয়ার পরিস্থিতি। নতুন ওষুধ বা নতুন প্রযুক্তি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অর্থ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, মানবাধিকার, কমিউনিটির অংশগ্রহণ এবং টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে সম্মেলনে।