ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাচ্ছেন ফ্রেন্ডশিপের রুনা খান

এশিয়ার নোবেলখ্যাত ‘র‌্যামন ম্যাগসাইসাই’ পুরস্কার পাচ্ছেন বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান। প্রান্তিক ও জলবায়ুর ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি চলতি বছরের এ পুরস্কার পাচ্ছেন। গতকাল সোমবার ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলায় ২০২৬ সালের র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণা করে র‌্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন। রুনা খানের সঙ্গে এ বছর আরও দুজন এই পুরস্কার পাচ্ছেন। তারা হলেন সিঙ্গাপুরের কূটনীতিক ও আইনজ্ঞ টমি কোহ এবং মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী বো চি। আগামী ১৫ নভেম্বর ম্যানিলার মেট্রোপলিটন থিয়েটারে এক অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

র‌্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন বলেছে, ‘২০২৬ সালের বিজয়ীদের এমন কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে, যা র‌্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত চিরস্থায়ী মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়। এর মধ্যে রয়েছে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের সেবা করা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য সুযোগ তৈরি করা এবং মানুষকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়ে নিতে সক্ষম করে তোলা।’ ফ্রেন্ডশিপের মাধ্যমে রুনা খানের কাজের স্বীকৃতিতে এবার র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার যুক্ত হলো। ২০২৫ সালে জলবায়ু নিয়ে বাংলাদেশের কাজের জন্য ফ্রেন্ডশিপ ‘আর্থশট প্রাইজ’ও পেয়েছিল ফ্রেন্ডশিপ। চতুর্দশতম বাংলাদেশি হিসেবে রুনা খান র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন।

ফিলিপিন্সের সপ্তম প্রেসিডেন্ট র‌্যামন ম্যাগসাইসাই ১৯৫৭ সালের ১৭ মার্চ উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় মারা যান। তার নামেই এ পুরস্কারের প্রবর্তন হয়। ১৯৫৮ সালে প্রথমবার এ পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রতি বছর ৩১ আগস্ট র‌্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের জন্মদিনে ম্যানিলা থেকে পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।

যেভাবে রুনা খানের ‘ফ্রেন্ডশিপ’ : ১৯৯৭ সালে ব্রহ্মপুত্র নদের একটি চর পরিদর্শনে যান রুনা খান। সেখানকার পরিস্থিতি দেখে তিনি গভীরভাবে আলোড়িত হন। ২০০২ সালে তিনি তাদের জন্য একটি ভাসমান হাসপাতাল চালু করেন। আরও বড় পরিসরে কাজ করতে ওই বছরই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফ্রেন্ডশিপ বাংলাদেশ’, যা পরে চর অঞ্চলের মানুষের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে সাতটি ভাসমান হাসপাতাল ও ডাঙায় স্থাপিত দুটি হাসপাতাল, ৫৫০টি মোবাইল ক্লিনিক এবং ৭০০ জন প্রশিক্ষিত ‘ফ্রেন্ডশিপ কমিউনিটি মেডিক এইড’-এর মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে এ সংস্থা। গত দুই দশক ধরে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষা, জীবিকা, দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও কমিউনিটি ক্ষমতায়নের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে সংস্থাটি। ২০০ হেক্টরের বেশি ম্যানগ্রোভ বনায়ন তৈরিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ১০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবককে উদ্ধার ও ত্রাণকাজের প্রশিক্ষণ দিয়েছে ফ্রেন্ডশিপ। ১৩৭টি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন হাবের মাধ্যমে ২ লাখ ৫ হাজারের বেশি মানুষ নতুন কাজের সন্ধান পেয়েছেন। ‘জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য স্থানান্তরযোগ্য স্কুল’ এই নীতির ওপর ভিত্তি করে ফ্রেন্ডশিপ এমন স্কুল নির্মাণ করেছে, যেগুলো নদীভাঙনের মুখে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খুলে ফেলে অন্যত্র আবার তৈরি করা যায়। সংস্থাটির সাড়ে সাত হাজারের বেশি কর্মী রয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই উঠে এসেছেন বিভিন্ন দুর্গম এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে।

ফ্রেন্ডশিপের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এটি একটি আন্তর্জাতিক সামাজিক উদ্দেশ্যভিত্তিক সংস্থা। এমন একটি বিশ্ব গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য, যেখানে বিশেষ করে যাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন এবং যাদের প্রয়োজন প্রায়ই উপেক্ষিত হয়, তারা মর্যাদা ও আশা নিয়ে বেঁচে থাকার সমান সুযোগ পাবেন। সামাজিক সমস্যা মোকাবিলার পাশাপাশি যেসব জনগোষ্ঠীর জন্য সংস্থাটি কাজ করে, তাদের স্বার্থকে সব সময় অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে ফ্রেন্ডশিপ।

এবারের এই পুরস্কারের জন্য রুনা খানকে নির্বাচিত করার কারণ হিসেবে র‌্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন বলছে, ‘তিনি (রুনা খান) গভীর সহানুভূতি নিয়ে দেশের হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজের লক্ষ্য পূরণে ফ্রেন্ডশিপ গড়ে তোলা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সাহস, দূরদৃষ্টি ও একাগ্রতার পরিচয় দিয়েছেন।’